২০ নভেম্বর ২০১৮

প্লেটো দর্শনের থার্টি টাইরেন্টস এবং আমরা

প্লেটো দর্শনের থার্টি টাইরেন্টস এবং আমরা - সংগৃহীত

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে জন্ম নেয়া গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর দর্শনের প্রভাব আজ পর্যন্ত বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতির সপক্ষে এক চমৎকার ইতিবাচক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে চলছে। তার লেখা গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’-এ উল্লিখিত পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও রাষ্ট্রনায়কদের আড়াই হাজার বছর ধরে এক অনন্যসাধারণ পথনির্দেশক হিসেবে প্রেরণা দিয়ে আসছে। পুরো গ্রন্থটির মূল উপজীব্য হলো- সমাজ একটি বিশেষ শ্রেণী দিয়ে শাসিত হওয়া উচিত। এই বিশেষ শ্রেণীকে তিনি গার্ডিয়ানস নামে অভিহিত ও চিহ্নিত করেছেন। যারা হবে মূলত সৈনিক শ্রেণিভুক্ত, তারাই দেশের শাসনের দায়িত্ব নেবে এবং দেশ শাসন করবে। বিশেষ এ শ্রেণীকেই তিনি তাদের শাসনকার্য সুগম ও নিষ্কণ্টক করার জন্য আইন রচনা, প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষমতা দিয়েছেন।

সামগ্রিক বিচারে মানবতার জন্য এটা অত্যন্ত লজ্জাকর, অপমানজনক ও ঘৃণিত একটা বিষয়। প্লেটো তার নিজস্ব উদ্ভাবিত এই গার্ডিয়ানস বা সমাজ ও রাষ্ট্রশাসক শ্রেণীর লোকের যেন কোনো কালেই ঘাটতি না হয় কিংবা দুষ্প্রাপ্য না হয়, সে জন্য রেসের ঘোড়া উৎপাদনের মতো বৈজ্ঞানিক পন্থায় একটি বিশেষ শ্রেণীর মানুষ উৎপাদন ও তাদের সেভাবে গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন; যেন তারা ভবিষ্যতে সমাজে শাসক শ্রেণীর দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত ও যোগ্যতাসম্পন্ন হতে পারে।

গত শতাব্দীতে জার্মানিতে জন্ম নেয়া হিটলার দেশ শাসনের দায়িত্ব হাতে নিয়ে নিজেকে ‘হের’ হিটলার হিসেবে জার্মানবাসীর কাছে ঘোষণা করেন। জার্মান ভাষায় এই ‘হের’ শব্দের অর্থ হলো সর্বেসর্বা বা সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। ১০০ ভাগ খাঁটি প্লেটো দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে হিটলার তার শাসন কর্তৃত্ব বিশ্বময় প্রতিষ্ঠিত করার মানসে প্লেটোর ফর্মুলা অনুযায়ী এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষ উৎপাদন করার পরিকল্পনা হাতে নেন, যাদের ধমনীতে প্রবাহিত হবে শতভাগ বিশুদ্ধ জার্মান রক্ত। বিশেষ এই বাহিনী জার্মানি শাসন করবে, বিশ্ব জয় করবে এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যে একপর্যায়ে গোটা বিশ্বই শাসন করবে এরা। এরাই সেই কুখ্যাত নাৎসি বাহিনী। এ কাজে প্রথমেই তিনি বাধা হিসেবে বিবেচনা করেন তৎকালীন জার্মানিসহ ইউরোপে বসবাসরত ইহুদি জাতিগোষ্ঠীকে। কারণ, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে ইহুদিরা তার কাছে কোনোভাবেই জার্মান পরিচয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। নানা নৃশংস কায়দায় এমনকি গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি নিধন করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর এই অনন্যসাধারণ ধ্বংসাত্মক রণনৈপুণ্যে প্রায় গোটা ইউরোপ তাদের করতলগত হয়ে পড়ে। প্লেটো গত হওয়ার আড়াই হাজার বছর পর তার প্রদর্শিত ফর্মুলার বাস্তব প্রয়োগে পৃথিবী নিপতিত হলো মানবসৃষ্ট সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ে। অন্য দিকে, এই বিপর্যয়ের যারা ছিল সবচেয়ে বড় ভিকটিম, তারা তাদের কূটকৌশল ও প্রাযুক্তিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে চতুর্দিকে মুসলিম জনপদ অধ্যুষিত ফিলিস্তিন দখল করল। মক্কা শরিফের পর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় তীর্থভূমি বাইতুল মুকাদ্দাসকে বুকে ধারণ করা জেরুসালেমকে রাজধানী ঘোষণা করল ১৯৮০ সালেই। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই নীতিগত কারণে জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী মেনে নিয়ে সেখানে তাদের কূটনৈতিক মিশন স্থাপনে উদ্যোগ নেয়নি, ২০১৬ সালের নভেম্বরে রিপাবলিকান পার্টি থেকে ইউএস প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত। তখন থেকেই ইহুদিদের দুঃস্বপ্ন বাস্তবায়নের সোনাঝরা দিনগুলো একেবারে তাদের হাতের নাগালে এসে যায়।


খ্রিষ্টপূর্ব ৪০৪ সালে স্পার্টা নগরবাসী অ্যাথেন্স দখল করে নেয়। বিজয়ী বাহিনী অ্যাথেন্সকে শাসন করার জন্য ৩০ সদস্যের কমিশন গঠন করে। অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য এই ৩০ জন ব্যক্তিই অ্যাথেন্স শাসনে প্রজাপীড়ন, স্বেচ্ছাচারসহ নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধীদের নির্মমতার সাথে উচ্ছেদ করেন। ইতিহাসের পাতায় আজো এই ৩০ সদস্যবিশিষ্ট কমিশন কুখ্যাত হয়ে আছে থার্টি টাইরেন্ট নামে।

ট্রাম্পের সাথে উল্লিখিত থার্টি টাইরেন্টের মতো সাথে পেয়ে যান নিকারাওয়া, গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, পাপুয়া নিউগিনির মতো ৯টি বাফার স্টেট। আর সেই সাথে গোটা পৃথিবী থেকে ফিলিস্তিনে জড়ো হওয়া বিক্ষিপ্ত যাযাবর, উদ্ধৃত ইহুদি জাতিগোষ্ঠী। ইসরাইল রাষ্ট্র ইহুদি ধর্ম ও ইহুদি জাতিগোষ্ঠীকে পুনরুজ্জীবিত করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শাসন ও কর্তৃত্বকে পাকাপোক্ত করতে তারা কতগুলো ঘৃণ্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে, যেগুলোর কয়েকটি হলো- জেরুসালেম থেকে সব মুসলমানকে বহিষ্কার, সমগ্র ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের আবাসভূমি ঘোষণা এবং একটি প্রাচীন ডেড ল্যাঙ্গুয়েজ হিব্রুকে আরবির বদলে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান।

১৯৪৭ সাল থেকে নিজ ভূমিকে স্বাধীন করতে দীর্ঘ ইন্তিফাদা পরিচালনা করে আসছে যে সিংহশার্দুল দুর্বার সাহসী স্বাধীনচেতা আরব ফিলিস্তিনিরা, তারা যে এই কুখ্যাত টাইরেন্টদের উৎপীড়ন ও মনোবাসনা কোনোভাবেই মেনে নেবে না; এটিও দিবালোকের মতো প্রতীয়মান সত্য। প্লেটো প্রজা উৎপীড়ন, প্রজা শাসন ও ক্ষমতা পাকাপোক্তকরণের সব পথই বাতলে দিয়েছেন তার উত্তরসূরিদের জন্য সত্য, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে সেই শাসককুলকে কিনা শোষিতের বিচারিক কাঠগড়ায় একসময় দাঁড়াতেই হয় অত্যন্ত নির্মমভাবে। প্লেটো দর্শনের সবচেয়ে নির্মম ব্যর্থতা এখানেই। এ সত্যের নির্মম শিকার হলেন ১৯৯০ সালে রোমানিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাই চসেস্কু, এক বিপ্লবে পরাজিত হয়ে হত্যার শিকার হয়। সাবেক যুগোশ্লাভ একনায়ক জেনারেল স্লোভেদান মিলোশেভিচকে কসোভোতে গণহত্যা চালানোর দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। একইভাবে ১৯৮৬ সাথে ফিলিপিনোরা একনায়ক ফার্ডিনান্ড মার্কোসকে অসম্ভব ধরনের বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসের পাঁচ হাজার জোড়া জুতার হিসাবসহ সে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

দুই.
আমাদের দেশের একজন শ্রেষ্ঠতম শিক্ষাবিদ মুসলিম গণজাগরণের পথিকৃৎ সাহিত্যিক প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ তার নিজ আসন টাঙ্গাইল থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৩২ সালে সংরক্ষিত মুসলিম আসন থেকে ফরিদপুর জেলার সদর আসনে তৎকালীন সময়ে আইন পরিষদ সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। অবশ্য পরবর্তীকালে তিনি তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। গণতন্ত্র নিয়ে বিশ্বময় সবচেয়ে প্রচলিত বক্তব্য হচ্ছে- Of the people, by the people, for the people. উক্তিটির মাধ্যমে নেতৃত্বের খেয়ালখুশি কিংবা স্বেচ্ছাচারিতায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। এর মাধ্যমে জনগণের প্রতি নেতৃত্বের সহমর্মিতা, দায়িত্বশীল আচরণ ও দায়িত্ববোধ প্রকাশ পায়। প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে নেতৃত্বকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্রতী হতে হবে। অন্য দিকে, এ ব্যবস্থায় সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিরোধী দলের ভূমিকাও অনেক। বিরোধী দল সরকারি দলের ভুলভ্রান্তিগুলো দেখিয়ে দেবে এবং তা শুধরে নিয়ে দেশের সর্বাত্মক কল্যাণ ও উন্নয়নে সরকারকে সাহায্য করবে। এভাবেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারি দল, বিরোধী দল ও রাষ্ট্রের সব সচেতন নাগরিকের সার্বিক সহযোগিতা, পারস্পরিক সমঝোতা ও প্রচেষ্টায় রাষ্ট্র এগিয়ে চলে; গণতন্ত্র যুক্ত হয়।

অন্য দিকে, এই রাজনীতি শব্দটির ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে। খ্যাতিমান ক্রোয়েশিয়ান সামরিক তাত্ত্বিক ও ফিলোসফার ‘ক্লসেউইজ’ তার একটি সামরিক নিবন্ধে লিখেছেন- ‘War is merely the constitution of politics by other means.’ অর্থাৎ ‘রাজনীতি যুদ্ধ হচ্ছে অন্য উপায়ে নিছক রাজনীতির সংবিধান।’ অপর এক দার্শনিক রাজনীতিকে দেখেছেন যুদ্ধের সংবিধান হিসেবে। এখানেও পশ্চিমা দর্শনের আরেক বাহক যুদ্ধকে রাজনীতি হিসেবেই দেখেছেন। অর্থাৎ রাজনীতির নামে উদ্ভূত ধরনের গরমিল, চরম বৈসাদৃশ্য। গণমুখী রাজনীতিতে নেতাকর্মীরা হয় নিস্ব, জাতি হয় সমৃদ্ধ। ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি ঠিক তার উল্টো। এখানে নেতার সমৃদ্ধির বিনিময়ে জাতি নিস্ব হয়।
দুই বছর আগে একেবারে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুট, আবার ক’দিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত খাঁটি সোনায় এমন অবাক করা খাদ, যার প্রকাশ জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম লজ্জাজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। সমকালীন এমন আরো বহু অজাচারের মধ্যে অন্যটি হলো বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে দুই লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা গায়েব, যার আনুমানিক মূল্য সোয়া দুই শ’ কোটি টাকা। এটা পকেটে চুরির মতো জিনিসও নয়। আমাদের নিজস্ব কয়লা দিয়ে সেখানে ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রয়েছে। বিদ্যুৎ প্লান্টটি এখন প্রায় বন্ধ থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিপর্যয়। অবাক করা ব্যাপার হলো- এমনটি জাতীয় বিপর্যয়কেও অভিযুক্তরা ইতোমধ্যে সিস্টেম লস বলেছেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের একজন ঢাবি ছাত্র রাশেদ পুলিশি রিমান্ডে মার খেতে খেতে আজ প্রাণ হারানোর অবস্থা। পেশায় কাঠমিস্ত্রি, কিডনি রোগাক্রান্ত দরিদ্র পিতার সন্তান রাশেদ হাজারো মেধাবী ছাত্রের মতো নিজের জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্ন দেখত তার পরিবার তাকে নিয়ে। রাশেদের মা এক গোলটেবিল আলোচনায় পুলিশি রিমান্ডে আটক ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। এ পরিবারের স্বপ্ন আজ শতহস্ত মৃত্তিকা চলে সমাধিস্থ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার মায়ের একটাই দাবি- ‘আমার ছেলেটি ফিরিয়ে দিন দয়া করে। প্রাণ ভিক্ষা দিন, চাকরির দরকার নেই। ওকে নিয়ে আমরা গ্রামে ফিরে যাবো।’ তবে সাধারণ মানুষের দাবিটা অনেকটা এমন-
‘এ ধরার মাঝে তুলিয়া নিনাদ
চাহি নে করিতে বাদ প্রতিবাদ,
যে ক’দিন আছি মানসের সাধ
মিটাব আপন-মনে-
যার যাহা আছে তার থাক তাই,
কারো অধিকারে যেতে নাহি চাই
শান্তিতে যদি থাকিবারে পাই
একটি নিভৃত কোণে।’


আরো সংবাদ