২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইমরান খান ‘ইয়েস ম্যান’ নন

ইমরান খান - সংগৃহীত

‘তুমি ওই সময় দায়িত্ব পাবে, যখন তুমি দায়িত্ব পালনের যোগ্য হবে।’ এ বাক্যটি মিয়া বশির সাহেবের, যা তিনি ২০০২ সালের নির্বাচনে তেহরিকে ইনসাফের পরাজয়ের কিছুদিন পর ইমরান খানকে বলেছিলেন। ওই নির্বাচনে বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানে ছিলেন না, তা সত্ত্বেও এই দল মাত্র একটি আসন পেয়েছিল, সে আসনটি ছিল ইমরান খানের, যা তিনি মিয়ানওয়ালী থেকে জয়লাভ করেছিলেন।

নির্বাচনের আগে তেহরিকে ইনসাফের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী ইমরান খানকে ত্যাগ করে মুসলিম লিগে (কিউ) চলে গিয়েছিলেন। কেননা তারা বুঝে গিয়েছিলেন, জেনারেল পারভেজ মোশাররফ তাদের দলের বিরোধী। নির্বাচনে ব্যর্থ হওয়ার পর তেহরিকে ইনসাফের কিছু নেতা নিরাশ হয়ে রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছিলেন। নির্বাচনী কার্যক্রমের খরচ জোগাতে ইমরান খান কিছু ঋণও করেছিলেন, যার কারণে দল মারাত্মক অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে।

ইমরান খান বেশ পেরেশান ছিলেন। আর ওই সময়ই একদিন তিনি তার পুরনো বন্ধু গোল্ডি উমর ফারুককে সাথে নিয়ে বশিরের কাছে গেলেন। ইমরান খান মিয়া বশিরের কাছ থেকে ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি ইহলৌকিক বিষয়েও পথনির্দেশনা নিতেন। গোল্ডি নিরাশ ও পরাজিত ভঙ্গিতে মিয়া বশিরকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের দল কবে ক্ষমতায় আসবে? মিয়া বশির চোখ বন্ধ করলেন। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে ইমরান খানকে বললেন, তুমি সরকারের দায়িত্ব ওই সময় পাবে, যখন তুমি ওই দায়িত্বের বোঝা ওঠানোর যোগ্য হবে।

এ কথা শুনে অকস্মাৎ ইমরান খান তার ভেতর থেকে আওয়াজ শুনতে পেলেন, তিনি তো সরকারের দায়িত্বের বোঝা ওঠানোর যোগ্যই নন। একজন সুফি ইমরান খানের কাছে এ গোমর প্রকাশ করেছিলেন, তিনি ওই সময় পর্যন্ত ক্ষমতা পাবেন না, যতক্ষণ তিনি তার উপযুক্ত হবেন না।

এটা সেই সময়কার কথা, যখন জেমিমা খানও ইমরান খানকে বলা শুরু করেছিলেন, তিনি যেন রাজনীতির বদলে শওকত খানম ক্যান্সার হাসপাতালের প্রতি বেশি মনোযোগ দেন। তবে মিয়া বশির জেমিমাকে এ কথা বোঝালেন, যদি ইমরান খানের মতো ব্যক্তি রাজনীতিতে না আসেন, তাহলে পাকিস্তানে পরিবর্তন কিভাবে আসবে? শওকত খানম হাসপাতালের বোর্ড সদস্য রাজ্জাক দাউদ ও ডা: পারভেজ হাসানও ইমরান খানকে বললেন, রাজনীতি ছেড়ে দিন। তা না হলে হাসপাতালের জন্য ফান্ড সংগ্রহ কঠিন হয়ে যাবে।

ইমরান খানের বিশ্বাস ছিল, যেদিন তিনি সরকারের দায়িত্বের বোঝা তোলার যোগ্য হবেন, সেদিন এ দায়িত্ব অবশ্যই পেয়ে যাবেন। অক্টোবর, ২০১১ সাল থেকে ইমরান খান এ কথা বলা শুরু করেন, তিনি সরকারের দায়িত্বের বোঝা তোলার যোগ্য হয়েছেন।

২০১১ সাল ছিল তেহরিকে ইনসাফের উত্থানের বছর। পরবর্তী সাত বছরে এমন অনেক রাজনীতিবিদ এই দলে যোগদান করেন, যারা ইমরান খানকে একজন পাগল ক্যাপ্টেন বলতেন। ২৫ জুলাই, ২০১৮ সালের নির্বাচনের হাঙ্গামা শেষ হওয়ার ১০ দিন পর ইমরান খানের সাথে বনি গালাতে দেখা হলে, তাকে বেশ নিশ্চিন্ত, শান্ত তবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেখাচ্ছিল।

সাক্ষাতের সময় তার দফতরে আমরা দু’জন ছাড়া শিরুও (পোষা কুকুর) উপস্থিত ছিল। তবে শিরু একদিকে মাটিতে পড়ে নিশ্চিন্ত ঘুমাচ্ছিল। সম্ভবত তার জানা ছিল না, কিছুদিন পরে তাকে বনি গালার খোলামেলা স্থান থেকে ইসলামাবাদের মিনিস্টার কলোনির এমন এক ঘরে স্থানান্তরিত করা হবে, যা নামে প্রাইম মিনিস্টার হাউজ হবে, কিন্তু সেখানে দৌড়াদৌড়ির জন্য সে খোলা ময়দান পাবে না। ইমরান খানের সাথে অনেক কথা হলো, কিন্তু তা ছিল অফ দ্য রেকর্ড।

তিনি আমার সাথে ওই সময়ের কথা বলতে লাগলেন, যে সময় তিনি জাতীয় পরিষদে তার দলের একমাত্র সদস্য ছিলেন এবং পারভেজ মোশাররফ টিভি চ্যানেলে তার চেহারা দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়তেন। আমাদের কথাবার্তায় রাজনীতি ও সংবাদ জগতের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রসঙ্গ এলো। তবে ইমরান খান নওয়াজ শরিফ ও আসিফ জারদারিসহ কারো বিরুদ্ধেই কিছু বললেন না। তিনি ইতিবাচক কথা বলতে থাকে। আমি তাকে বললাম, নির্বাচনে সফলতার পর তার বক্তৃতায় কাশ্মির সমস্যা উল্লেখের পর শ্রীনগর থেকে অভিনন্দন বার্তা এসেছে। ওখানকার জনগণ বেশ খুশি। কিন্তু নতুন দিল্লি খুশি নয়।

নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের ফোন আসার কিছু দিন পর দিয়ামিরে সন্ত্রাসী ঘটনা গভীর ষড়যন্ত্রের ফল। দিয়ামিরের চিলাস এলাকায় স্কুলগুলোতে হামলার ঘটনায় ইমরান খানও বেশ পেরেশান ছিলেন। তিনি এ কথাও বলেন, উত্তরাঞ্চলে ড্যাম ও কিছু উন্নয়নমূলক কর্মপরিকল্পনার ঘোষণার পর ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। ক্ষমতায় বসার পর তাকে ওই ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে হবে। পানি স্বল্পতার সঙ্কটও সমাধান করতে হবে।

নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার কারণে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে গঠন করা ড্যাম ফান্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ইমরান খানের জানা ছিল না। যখন কিছু তথ্য দিলাম, তখন ইমরান খান বললেন, জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য জাতিকে এক হতে হবে।

বিদায়ের আগে আমি বললাম, নিজের কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিশোধের নিশানা বানাবেন না এবং কারো বিরুদ্ধে কোনো মামলাও ঠুকবেন না। হিসাব-নিকাশের বিষয়টি জাতীয় নিরীক্ষা দফতর (ন্যাব) ও আদালতের ওপর ছেড়ে দিন। খান সাহেব আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই হ্যাঁ সূচক মাথা দোলালেন।

আর আমি মনে মনে তার দৃঢ়তার জন্য দোয়া করলাম। কেননা এ অধম অতীতে বহু প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে এমন কথা শুনেছে, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারা নিজেদের কথার ওপর অটল থাকতে পারেননি, অথবা অটল থাকতে দেয়া হয়নি। আশা করি, আমাদের দেশের শক্তিধর রাষ্ট্রীয় দফতরগুলো ইমরান খানকে নিজেদের ‘ইয়েস ম্যান’ বানিয়ে ব্যর্থ করবে না। বরং তার মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো নিয়ে ঐকমত্য গঠনের চেষ্টা করবে এবং এ দেশ থেকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি খতম হবে।

ইমরান খানও কাউকে নিজের ‘ইয়েস ম্যান’ বানানোর চেষ্টা করবেন না।) চলতে চলতে ইমরান দলের একজন নেতার নাম নিয়ে জানতে চাইলেন, তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানাতে চাই, আর তিনি স্পিকার হতে চান। এর কী সমাধান?’ ইমরান খান এই একটা পেরেশানি আমার সামনে প্রকাশ করলেন। আমি এর যে উত্তর দিয়েছি, তা আপনারা কয়েক দিনের মধ্যে জানতে পারবেন।

ইমরান খানের দফতর থেকে বের হতেই জাহাঙ্গীর তারিন এগিয়ে এলেন। তার ডানে-বামে পাঞ্জাব অ্যাসেম্বলির কিছু স্বতন্ত্র সদস্যও ছিলেন। তারিন আমার কাছে কিছু অভিযোগ পেশ করলেন। এরপর স্বতন্ত্র সদস্যদের দিকে ইশারা করে বললেন, তাদের জিজ্ঞেস করো, এরা কোটি কোটি রুপিয়ার প্রস্তাব ফেলে দিয়ে আমার সাথে এসেছেন এবং ইমরান খানকে শর্ত ছাড়াই সমর্থন দেবেন। অথচ মিডিয়ায় আমার ওপর হর্স ট্রেডিংয়ের অপবাদ চাপানো হচ্ছে।

একজন এমপিএ আমার কানে বললেন- জনাব, আপনার এ খাদেম তাদের কাছ থেকে কিছু পয়সাও নিয়েছে। দেশ ও জাতির স্বার্থে তাদের থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বনি গালাও এসে গেছি। এমনটাও শুনেছি, এখানে নাকি কেউ কাউকে চা-ও সাধে না। আমি ওই কুচক্রী এমপিএকে বললাম, ভেতর থেকে বেশ উন্নতমানের কফি পান করে এলাম। তোমাকেও কফি বা চা অবশ্য দেয়া হবে, তবে উন্নয়নমূলক ফান্ডের নামে ঘুষ মিলবে না। এমপিএ হাত সিনায় রেখে বললেন, কোনো পরোয়া নেই।

বনি গালা থেকে ফিরে আসার সময় আমার মিয়া বশিরের বাক্য মনে পড়ছিল। ইমরান খান তো দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন, কিন্তু সফলতা ওই সময় সম্ভব, যখন তিনি তার ওয়াদামাফিক কাজ করবেন। ওয়াদার খেলাফ কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু ‘জনগণের ইয়েস ম্যান’ হতে হবে, অন্য কারো নয়।

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ৬ আগস্ট, ২০১৮ থেকে
ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক


আরো সংবাদ