২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নজিরবিহীন এ আন্দোলন বালখিল্য নয়

নজিরবিহীন এ আন্দোলন বালখিল্য নয় - সংগৃহীত

একটি দেশ পরিচালনা করা সহজ কথা নয়; ছেলেখেলা তো নয়-ই। তাই রাষ্ট্রক্ষমতা উপভোগের বিষয়ও নয়। স্বাধীনতার পর রাজনীতিক-আমলারা, করেছেন দর্শন দেশ পরিচালনা ছেলেখেলা এবং রাষ্ট্রক্ষমতা উপভোগের আর মজার বিষয়। আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি মাহাথির মোহাম্মদ দুর্নীতি নির্মূল করার প্রতিশ্র“তি দিয়ে এবার ৯৩ বছর বয়সে আবার ক্ষমতায় এসেছেন।

এর আগে ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এক টানা ২২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য তিনি প্রকাশ্যে চোখের পানি ফেলেছিলেন। ক্ষমতার ভার এতটাই দুর্বহ। তিনি দীর্ঘ বছর ক্ষমতায় থেকেও মাহাথির কোনো পারিবারিক উত্তরাধিকারীর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে যাননি। আবার পরিচ্ছন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে জাতির স্বার্থে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন সম্প্রতি। আমাদের দেশের রাজনীতিকেরা দারাপুত্র পরিবারসমেত রাজনীতি করেন এবং বংশপরম্পরায় তারাই ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে চান। এক কথায় দেশে রাজতন্ত্রতুল্য পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

শত ব্যর্থতার গ্লানি নিয়েও ক্ষমতা কিভাবে দখলে রাখা যায়, নিরন্তর তারই ফন্দি আঁটেন। জনগণের স্বাধীন মত প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে হলেও এটা করে থাকেন।

ভৌগোলিকভাবে ক্ষুদ্র ও সীমিত সম্পদের এই জনবহুল দেশটির সমস্যার অন্ত নেই। তবে সব সমস্যার ওপরে মাথা উঁচিয়ে আছেন আমাদের রাজনীতিকেরা। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় একটি শব্দ পরিবর্তন করে তাদের সম্পর্কে বলতে হয়- ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-দেশে আজ,/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;/যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই/ ‘দেশ’ অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া/যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি/এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়/ মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা,/শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়’। এটাই সত্য এ বাংলাদেশে।

এ সত্য অনুধাবন করে স্বাধীন দেশের স্কুল-কলেজের নিরুপায় শিক্ষার্থীরা তাদের দুই সহপাঠীকে ঘাতক বাসের চাকার নিচে পিষ্ট হতে দেখে রাস্তায় নেমে পড়ল। ওদের কণ্ঠে যেন শোনা গেল হৃদয়মথিত ক্রন্দন যা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘তুমি শুয়ে র’বে তে-তালার ’পরে, আমরা রহিব নিচে,/অথচ তোমারে দেবতা বলিব,/সে ভরসা আজ মিছে!’ তাই গাড়ির লাইসেন্সবিহীন মন্ত্রীকে গাড়ি থেকে তারা রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। দেখে মনে হলো দশকের পর দশক ধরে ঘাতক গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে আসা দেশবাশীর স্বজনদের ব্যর্থ আহাজারির দিন এবার শেষ হলো বোধ হয়। এই বালক-বালিকারা জনগণকে আশ্বস্ত করছে, আর এ ব্যথা সইতে হবে না; দিন আসছে যে দিন জনগণ জোরগলায় নজরুলের ভাষায় বলতে পারবে দেশে কায়েম হবে তাদের শাসন ‘সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে’ এবং অনন্তকাল ‘এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে’।

বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে লন্ডনের রাজপথে ব্রিটেনের পক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ী স্যার উইনস্টন চার্চিলের মেয়ে সারাহ চার্চিল মাতাল অবস্থায় ড্রাইভিং করার দায়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে হলোওয়ে কারাগারে জেল খেটেছেন। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা সড়কে আইন ভঙ্গকারীদের জন্য সে পথই দেখিয়ে দিয়েছে।

এসব দেখে ভীতসন্ত্রস্ত সরকার টানা এক দশক ক্ষমতায় থাকার পর বলতে বাধ্য হয়েছে আমরা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ‘যথাযথ’ আইন করে দেব। মন্ত্রিসভার বৈঠকে পুরনো আইনের কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে খসড়া সংশোধনও করা হলো। সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে দৈনিক কমপক্ষে ১৫-২০ জনের প্রাণহানি নতুন নয়। এত দিন মন্ত্রীরা কোথায় ছিলেন? আইন তো আছেই। সেই আইন প্রয়োগ করা হলো না কেন? সেই আইন কারা ‘বিক্রি’ করে খাচ্ছে? আলøাহ-ভীতি মানুষের মনে যে নৈতিক সাহস ও দায়িত্ববোধের জন্ম দেয়, তা মানুষের তৈরি করা আইন বা সে আইন রক্ষাকারী বাহিনীর ভয় জাগ্রত করে না।

আল্লাহ-ভীত মানুষ আত্মসংযমী এবং এর মূল মানবাত্মার গভীরে প্রোথিত। এ প্রকৃতির প্রতিটি মানুষ ইহজাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণ কামনা করে নৈতিকবলে ঋদ্ধ। আল্লাহর ভয়ে তারা সবধরনের অপকর্ম থেকে বিরত থাকেন। তখন আর সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ইংরেজ আস্তিক কবি টি এস এলিয়টের ‘দ্য হলোম্যান’ কবিতার ভাষায় আক্ষেপ করতে হয় না: ‘আমরা সব ফাঁপা মানুষ/ আমরা সব ঠাসা মানুষ/ ঠেস দিয়ে এ ওর গায়ে/ মাথার খুলি খড়ে ঠেসে! হায়রে!’ (বিষ্ণু দে অনূদিত)। মানুষের সৃষ্ট আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমাজের অনাচার রোধ করতে পারছে না এবং পারবেও না। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য রেখেই সরল মনে আমরা তা রোধ করতে পারি।

কোটা সংস্কার আন্দোলন মোকাবেলা করতে গিয়ে অকার্যকর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারপ্রধান ঠকেছেন। স্কুল-কলেজের বালক-বালিকারা দিনের পর দিন রাস্তা অবরোধ করে সরকারের পুলিশকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ শিখিয়ে দিয়েছে। ওদের ট্রাফিক তদারকি থেকে মন্ত্রী, এমপি, সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের গাড়িও রেহাই পায়নি। প্রধানমন্ত্রী নিহত দুই ছাত্র-ছাত্রীর পরিবারকে সরকারি তহবিল থেকে জনগণের অর্থে সাহায্য দিয়েছেন। ঘাতক বাস বেসরকারি, আর সাহায্য দিলেন জনগণের টাকায়! সরকার যদি মনে করে, টাকা দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় তাহলে ভুল হবে।

এ দিকে দেশ আজ অবাধ লুটপাটের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। মেধা-মননশীলতা ও নীতিনৈতিকতার ঘাটতি জনগণের অর্থ ঢেলে পুষিয়ে নিতে সরকার প্রাণান্ত ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনজীবনে নিরাপত্তা বিধান করার কথা, তারা আজ জনগণকে অকারণেও ঠেঙ্গায়। ব্যালটের বলে নয়, নির্বাচনী বুথে কারসাজি করে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। সে লক্ষ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রকে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়। এদের ক্ষমতার উৎস দেশের জনগণ হলে এমন হওয়ার কথা নয়। সরকারের মানসিকতা ও দেশের জনগণের প্রতি আচরণ স্বাধীন দেশের সরকারের মতো নয়।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনের পেছনে কোনো ‘অপশক্তির’ হাত আছে কি না তা খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন এক মন্ত্রী। বিগত এক দশকে বছরে কমপক্ষে ১২ হাজার লোক ঘাতক বাস-ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলের কারণে রাস্তায় এক রকম খুন হয়েছেন। তা খতিয়ে দেখে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা তিনি কেন উচ্চারণ করেননি? উল্লেখ্য, এ বাস-ট্রাক মালিক-শ্রমিক সমিতির কর্তা এমন একজন মন্ত্রী যিনি এই দু’জন কলেজশিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার খবর শুনে হেসেছেন। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘বি’ অ্যাওয়্যার অব এ লাফিং ম্যান অ্যান্ড এ উয়িপিং ওম্যান’।

বালক-বালিকারা তার এই ক্রুর হাসির জন্য ক্ষমা চাইতে বলেছে এবং তিনি তা চাইতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেরই মনে থাকার কথা, এক টেলিভিশন টকশো বিতর্কে তিনি তার চেয়েও প্রবীণ এবং উচ্চশিক্ষিত সাবেক এক মন্ত্রীর ‘চোখ তুলে নেয়া’র হুমকি দিয়েছিলেন। এটা দেখে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, তিনি মন্ত্রী হওয়ার মতো ভদ্র কিংবা সদাচারী কি না।

এজাতীয় নেতাদের ওপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে কি না তা আমাদের জানা নেই। এমন অনেক মন্ত্রণালয় আছে যেগুলোর সততা ও দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু তাদের কারো কোনো জবাবদিহিতা আছে বলে মনে হয় না। সড়কপথে দৈনিক হাজার কোটি টাকার ঘুষ-চাঁদাবাজি হচ্ছে। সবাই বলে, এ টাকার ভাগ নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত অনেকেই পেয়ে থাকেন। যা হোক, জনগণ অনেক সহ্য করেছেন, ধৈর্য ধরেছেন। এবার নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মধ্যে তারা আশার আলো দেখেছেন। তাই শত ভোগান্তির মাধ্যেও জনগণ আন্দোলনকারীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সবারই প্রত্যাশা, এ আন্দোলন যেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের মতো নস্যাৎ হয়ে না যায়। কিন্তু হায়! সরকার শেষ পর্যন্ত এ শিশুকিশোরদের বিরুদ্ধেও পেটোয়া বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে!

সব সভ্য দেশেই মন্ত্রীরা নিজেদের ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে সে উপলব্ধি নেই। ব্যর্থ মন্ত্রীরা কথায় চিঁড়ে ভিজিয়ে মন্ত্রিত্ব আঁকড়ে বসে থাকেন। সরকার প্রধান বিষয়টার প্রতি নজর দেন বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। যেকোনো দফতরে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের যোগ্য পর্যাপ্ত লোক এ দলে আছেন। ব্যর্থ বা অযোগ্য মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে নতুন মন্ত্রী নেয়া তাই এখন সহজ। কিন্তু দেখা যায় আদালত কর্তৃক ঘোষিত অপরাধী মন্ত্রীরাও বহাল তবিয়তে থাকেন। এতে করে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থায় চিড় ধরে। সেটা সরকার বুঝলেও তোয়াক্কা করে না। কারণ তারা জনগণের সুষ্ঠু ভোটে নির্বাচিত নন। তাই জনগণ কী বলল আর কী বলল না, তার পরোয়া নেই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাহিনী ও কতিপয় বুদ্ধিজীবীকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দল বহাল তবিয়তে রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করতে চান অনেকেই। নিজেদের তৈরি সঙ্কটকে প্রতিপক্ষের ঘাড়ে চাপিয়ে সরকার পুরনো রেকর্ড বাজাতে থাকে। আমাদের দেশে একেই বলে ‘রাজনীতি’ আর এটা যারা করতে পারেন তারাই হন ‘রাজনীতিক’ ও মন্ত্রী-মিনিস্টার।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মূলে কারণ কেবল এটা নয় যে, বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে তাদের দুই সতীর্থ নিহত হয়েছেন। এর পেছনে আছে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা, শিক্ষা ক্ষেত্রে নানাবিধ অনিয়ম অব্যবস্থাপনা, সমাজের সর্বস্তরে অরাজকতা, নৈরাজ্য, নিরাপত্তাহীনতা, দুর্নীতি, অবিচার, বঞ্চনা, বৈষম্য এবং সরকারিপর্যায়ে অদক্ষতা, লুটপাট ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি। এ ক্ষুব্ধ বালক-বালিকারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, পরীক্ষায় কেবল তারাই পাস-ফেল করে না, সরকারও ফেল মেরেছে। দেশের অবস্থা এমন করুণ হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দলীয় গলাবাজ নির্বিকার মন্ত্রী ও নেতাদের টেলিভিশনে প্রতিদিন পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে দেখা যায়- যেন দেশে কোনো সঙ্কট কিছুই নেই। অথচ সঙ্কটের কারণে হতাশ শিক্ষার্থীদের ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলন এবং ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলন। বয়স্করা সরকার থেকে সুবিধা নেন, উপদেশ খয়রাত করেন আর রক্তাক্ত নিষ্পাপ শিশুরা রাস্তায় কেঁদে গড়াগড়ি যায়। এতেও দুর্নীতিবাজ বয়স্কদের টনক নড়ে না। হায়রে বাংলাদেশ! 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক


আরো সংবাদ