২১ নভেম্বর ২০১৮

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এই সময়ে

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এই সময়ে - সংগৃহীত

সাইক্লোন, সাইমুম, টর্নেডো, তাইফুনসহ এমন কোনো দুর্যোগ নেই যা বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে না। আমার পুরনো কর্মস্থল হিসেবে এবং বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ওপর জাপানিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ডক্টরেট ডিগ্রিধারী হওয়ার সুবাদে আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য আগ্রহী পাঠক আমাকে বারবার প্রশ্ন করে যাচ্ছেন যে, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ক্রান্তিকালে আপনি কেন চুপ করে বসে আছেন?

কয়লাখনির প্রযুক্তিগত দিকসংক্রান্ত সঠিক বার্তা দেশবাসীকে অবহিত করছেন না কেন?

আমার প্রতি অনেকের অভিব্যক্তি হলো বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রিতে উচ্চতর গবেষণা করা আপনিই বাংলাদেশের প্রথম ব্যক্তি যিনি জাপানের রিউকিউজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অতি বিরল সম্মানের President's Honorary Award-2009 অর্জন করেছেন। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি ওপর International Journal of Coal Geology প্রকাশিত ৪টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের জন্য ইতালি-ভিত্তিক The World Academy of Sciences (TWAS) এবং বাংলাদেশের Bangladesh Academy of Sciences (BAS) আপনাকে Young Scientist Prize (Gold Medal-2013)প্রদান দিয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু খ্যাতিমান অধ্যাপক, বিভিন্ন মননশীল পাঠক, আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীসহ অসংখ্য আগ্রহী পাঠক আমাকে বারবার ফোন দিয়ে শুধু এ কথাই বলছেন, বাংলাদেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ কয়লাখনি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে আপনার রয়েছে সরাসরি ৩ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা, জাপানে ৫ বছরের গবেষণার অভিজ্ঞতা ও পিএইচডি ডিগ্রির থিসিস এবং শাবিপ্রবির পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রায় ৮ বছরের শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা।

শাবিপ্রবির মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন গবেষক শিক্ষক হিসেবে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিসংক্রান্ত প্রযুক্তিগত সঠিক বার্তা তুলে ধরা তো আপনার একান্ত দায়িত্ব নয় কি, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। আরো বলা হচ্ছে যে, যাদের কয়লাখনি বিষয়ে বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা নেই তারা বিভিন্ন টকশোতে গিয়ে এক্সপার্ট হওয়ার ভান করছে, আর আপনি মুখ খুলছেন না।

আরো প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, কয়লাখনির বর্তমান ক্রান্তিকালে আপনি নীরব কেন? আগ্রহী পাঠকের মনের প্রশ্নগুলো সামনে রেখে এ প্রবন্ধটি লেখার অবতারণা।
মিডিয়াতে খবর প্রকাশের পরের দিন ক্লাসে আসার পর পরই আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের প্রথম প্রশ্ন ছিল, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে হরিলুট হয়েছে এবং ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানে এক লাখ ৪৪ হাজার টন (প্রায়) কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে আপনার প্রযুক্তিগত মতামত কী?

তাদের বললাম, আমি আজ তোমাদের সামনে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন গবেষক শিক্ষক হয়ে না এসে যদি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে কর্মরত থাকতাম তাহলে মিডিয়া জগতের অনেকেই কিছু বুঝে, না বুঝে এবং সাধারণ জনগণের অনেকেই আমাকেও নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করত। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীসহ দেশবাসী সবার সামনে আজীবন হেয়প্রতিপন্ন হয়ে চলতে হতো।

আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে বললাম যে, ভূগর্ভস্থ কয়লা-বেসিনের অনুসন্ধান, কয়লা-বেসিনে কয়লার গভীরতা নিরূপণ, কয়লা স্তরের পুরুত্ব ও কাঠামো নিরূপণ করা, কয়লার রাসায়নিক উপাদান নিরূপণের পাশাপাশি কয়লার আর্দ্রতা নির্ণয় করা, spontaneous combustion in coa/অক্সিডেশন, মাইনিং পদ্ধতি নির্ধারণ, খনি এলাকায় উত্তোলিত কয়লার পরিমাপ ও পরিবহন পদ্ধতি, স্টক-ইয়ার্ডে কয়লা সংরক্ষণ পদ্ধতি ও ঘাটতির বিভিন্ন দিক ইত্যাদি বিষয়গুলো মূলত ভূতত্ত্ববিদ, ভূপদার্থবিদ, মাইনিং ভূতত্ত্ববিদ ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারদের একান্ত বিষয়। কিস্তু বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে এগুলোর কোনো ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না।

২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের ২৯ জুন পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানে এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা গায়েব বা চুরি হওয়াসংক্রান্ত যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য তিনটি বিষয় অবশ্য অবশ্যই সামনে রাখা দরকার। এগুলো হলো ১. কয়লাখনির ফেইস থেকে কয়লা উত্তোলন এবং পরিবহন (haulage and hoisting systems) সংক্রান্ত কয়লা ঘাটতির প্রযুক্তিগত দিক। ২. উত্তোলিত কয়লা ভূপৃষ্ঠে আসার পর পুনরায় তা স্কিপ শ্যাফটের কাছে বেল্ট কনভয়ে লোড করার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে স্টক ইয়ার্ডে ফেলে রাখার কারণে ওয়াশ আউট, অক্সিডেশন/স্পনটেনিয়াম কমবাশ্চন জনিত কয়লা ঘাটতির প্রযুক্তিগত দিক এবং ৩. অসৎ পন্থায় কয়লা বিক্রি করে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার দিক।

প্রথম ও দ্বিতীয়- এ দুটি প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে আমি এ প্রবন্ধে উদাহরণসহ তুলে ধরার চেষ্টা করব। আর তৃতীয় বিষয়টি আমার জ্ঞানের পরিধির বাইরে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, দুদক এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো তৃতীয় বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এর সত্যতা উদঘাটন করতে পারে।
এবার মূল আলোচনায় আসি।

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির স্টক ইয়ার্ডে কয়লা ঘাটতির বিষয়টা ধরা পড়ে ১২১০ নং (ডাউন) প্যানেল/ফেস থেকে কয়লা উত্তোলন শেষ হওয়ার পরে এবং ১৩১৪ নং প্যানেল/ফেস থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু করার আগ মুহূর্তে। ১২১০ নং প্যানেল/ফেস থেকে কয়লা উত্তোলন শেষ হয় ২৯ জনু ২০১৮। মাঝখানে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় ‘ডাউন-টাইম’ রেখে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি থেকে ১৩১৪ নং প্যানেল/ফেস থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু করার কথা ছিল। এর মধ্যেই ঘটে গেল যতসব কাণ্ড।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে, বিশ্বব্যাপী ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে দু’টি পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়, যেমন ১. পানিস্তরের নিচ থেকে খনি করে কয়লা উত্তোলন করা এবং ২. পানিস্তরের উপরে খনি করে কয়লা উত্তোলন করা। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়াতে প্রায় ১০০ মিটার থেকে ১৩০ মিটার পুরু ভূগর্ভস্থ আঞ্চলিক পানিস্তরের নিচ থেকে খনি করে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে।

আঞ্চলিক পানিস্তরের নিচে অবস্থিত বেলে-পাথর, সিল্ক-পাথর এবং কয়লার স্তরগুলো আবার বহুমুখী জয়েন্ট ও নরমাল-ফল্ট দিয়ে সংযুক্ত এবং পানি প্রবাহের উপযোগী। আর এসব কারণে বড়পুকুরিয়া কয়লা বেসিনের কয়লা স্তর পুরোটাই যেমন শুষ্ক নয়, তেমনি পুরোটা ভেজাও নয়। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির প্রতিটি প্যানেল/ফেস থেকে কয়লা আহরণের সময় তিনটি প্রধান উপকরণ ব্যবহার করতে হয়, যেমন ১. ফেস থেকে কয়লা কাটার জন্য শেয়ারার মেশিন;

২. কয়লা উত্তোলনের নিরাপত্তার জন্য শেয়ারার মেশিনের ওপর কয়লা স্তর ও পাথরের স্তর ধরে রাখার জন্য হাইড্রোলিক সাপোর্ট ব্যবহার করা এবং ৩. শেয়ারার মেশিন দিয়ে ফেস থেকে কয়লা কাটার পর তা সরানোর জন্য এবং বেল্ট কনভেয়র পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এএফসি (Armored Face Conveyor) ব্যবহার করা, ইত্যাদি।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, শুধু বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতেই নয় বিশ্বের বেশির ভাগ কয়লাখনির ফেস থেকে কয়লা কাটার প্রক্রিয়াগুলো চলাকালে প্রচুর কোল-ডাস্ট উৎপন্ন হয়, যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সার্বক্ষণিক পানি স্প্রে করতে হয়। পানি স্প্রে করে কোল-ডাস্ট নিয়ন্ত্রণ না করলে কয়লাখনি শ্রমিকদের নিউমোকোনিওসিস ও সিলিকোসিস নামের জটিল রোগ হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কয়লা ফেস থেকে কয়লা কাটার সময় ব্যবহৃত পানির একটি অংশ কয়লার সাথে মিশে যাচ্ছে। সেই সাথে কয়লাকে অধিকতর পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় পরিবহনের জন্য বেল্ট কনভেয়রে অনেক সময় হালকা পানির স্প্রে করতে হয়।
গবেষণার ফলাফল থেকে এটাও জানা গেছে যে, বড়পুকুরিয়া বেসিনের কয়লার মধ্যে ইনহারেন্ট ময়েশ্চার হিসেবে প্রায় শতকরা ৫.১০ ভাগ পানির উপস্থিতি রয়েছে। সুতরাং এটা স্পষ্ট, ভূগর্ভস্থ কয়লাখনির উত্তোলন ফেস থেকে বেল্ট কনভেয়র হয়ে ভূগর্ভস্থ কোল বাংকার পর্যন্ত কয়লা পরিবহন এবং কোল বাংকার হয়ে স্কিপ শ্যাফটের তলদেশ থেকে ভূপৃষ্ঠে কয়লা উত্তোলন করা পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানে কয়লার আর্দ্রতা কমতে শুরু করবে এবং ওজন হ্রাস কমতে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

স্কিপ শ্যাফ্টের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে ভূপৃষ্ঠে কয়লা উত্তোলন করার পর যদি তা আবার বেল্ট কনভেয়রের মাধ্যমে পুনরায় পরিবহন করে দূরবর্তী কোনো স্টক-ইয়ার্ডে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উত্তোলিত কয়লা ভূপৃষ্ঠের উন্মুক্ত বাতাসে ফেলে রাখা হয় তাহলে কয়লার মধ্যে বিদ্যমান inherent moisture শুকিয়ে যাবে এবং ওজনের তারতম্য ঘটবে। এ ছাড়া দিনে সূর্যের প্রচণ্ড তাপদাহে কয়লার স্টক-ইয়ার্ডে হঠাৎ আগুন লেগে যাওয়ার ঘটনা তথা স্পনটেনিয়াম কমবাশনে বিশ^ব্যাপী একটি সাধারণ ঘটনা, যা কয়লার ওজন কমে যাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত।


পাঠকের সুবিধার্থে নিচে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো। ‘ওয়ার্ল্ড কোল সোর্স’-এর ২০১৬ সালের মার্চ মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী কয়লার স্টক-ইয়ার্ডে ফিজিক্যাল ইনভেন্টরি ৫ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। স্টক-ইয়ার্ডে spontaneous combustion জনিত কারণে কয়লার ওজন ২ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে (IEA Clean Coal Center, 2012)। স্টক-ইয়ার্ডে কয়লা যদি যথাযথভাবে কম্প্যাক্ট করে না রাখা হয় তাহলে স্পনটেনিয়াম কমবাসনের কারণে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত ওজনের ঘাটতি হতে পারে (Fuel Processing Technology, 59(1999), 23-24), ৫৯(১৯৯৯), ২৩-২৪)। এমনকি স্টক-ইয়ার্ডে সংরক্ষিত কয়লার ওজনের সাথে অফিসিয়াল রেকর্ড বইয়ে সংরক্ষিত কয়লার ওজনের পার্থক্য ৫ শতাংশ হতে পারে (AGM Report 2015-2016, Bharat Coking Coal, Section 6: Inventories 6.1)| OIML (The Organization Internationale de Metrlogic Legale) এর মতে, বেল্ট ওয়েইং স্কেলের কারণে কয়লার ওজনে ০.৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে। বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলন করা কয়লার ওজন দুটি ধাপে বেল্ট ওয়েইং স্কেলের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়।

প্রথম ধাপে কয়লার ওজন নিরূপণ সম্পন্ন করা হয় স্কিপ শ্যাফটের অতি কাছে সারফেসে স্থাপিত বেল্ট ওয়েইং স্কেলের মাধ্যমে। প্রথম ধাপে বেল্ট ওয়েইং স্কেলে পরিমাপ করার পর ওই কয়লা বেল্ট কনভেয়রের মাধ্যমে পুনরায় পরিবহন করে সারফেস সাইলো হয়ে স্টক-ইয়ার্ডে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জমা রাখা হয়। এমতাবস্থায় মজুদ করা কয়লা দীর্ঘদিন ধরে স্টক-ইয়ার্ডে পড়ে থাকার ফলে কয়লা থেকে পানির অংশ ইনহারেন্ট ময়েশ্চার শুকিয়ে গিয়ে ওজন কমে যায়।

এ ছাড়া বর্ষাকালে ভারী বর্ষণের ফলে স্টক-ইয়ার্ডের কয়লার মধ্যে বিদ্যমান কোল-ডাস্ট বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়ে চলে যায় এবং একাংশ স্টক-ইয়ার্ডের ফ্লোরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। এ ক্ষেত্রেও স্টক-ইয়ার্ডের কয়লার ওজন কমে। দ্বিতীয় ধাপে কয়লার ওজন নিরূপণ সম্পন্ন করা হয় কয়লাখনির স্টক-ইয়ার্ডে স্থাপিত বেল্ট ওয়েইং স্কেলের মাধ্যমে। দ্বিতীয় ধাপে বেল্ট ওয়েইং স্কেলে পরিমাপ করার পর ওই কয়লা বেল্ট কনভেয়রের মাধ্যমে পুনরায় পরিবহন করে কয়লাখনির স্টক-ইয়ার্ড থেকে বড়পুকুরিয়ার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। উপরে উল্লেখিত রিভিউর আলোকে এটা পরিষ্কার যে, দুটি ধাপে বেল্ট ওয়েইং স্কেলের কারণে বড়পুকুরিয়ায় কয়লার ওজনে ০.৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে।

সুতরাং উপরে উল্লেখিত তথ্যভিত্তিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে এটা সুস্পষ্ট যে, ১. ভূগর্ভস্থ কয়লার ফেস থেকে কয়লা কাটার পর তা ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত উত্তোলনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে পুনরায় কয়লার স্টক-ইয়ার্ডে জমা রাখা পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানে মজুদ কয়লা থেকে ক্রমান্বয়ে ইনহারেট ময়েশ্চার শুকিয়ে কয়লার ওজন হ্রাস পাওয়া; ২. স্টক-ইয়ার্ডে spontaneous combustion জনিত কারণে কয়লার ওজন ২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়া এবং ৩. বেল্ট ওয়েইং স্কেলের কারণে কয়লার ওজনে ০.৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হওয়া ইত্যাদি এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।

এগুলোকে অস্বীকার করা বা এড়িয়ে চলার কোনো উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে আবেগতাড়িত হয়ে যাচ্ছেতাই বলার সুযোগ নেই। আবার ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর সময়ের ব্যবধানে এক লাখ ৪৪ হাজার টন (প্রায়) কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করারও কোনো উপায় নেই। স্টক-ইয়ার্ডে কয়লা মজুদের হিসাবের গরমিলের সমন্বয় করতে হলে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতার পাশাপাশি কয়লা গায়েব হওয়ার অভিযোগ এ দু’টি বিষয়কে তদন্ত কমিটির মাথায় রাখতে হবে।


বিষয়টা যেন এমন যে, উৎপাদন ও বিতরণ সম্পৃক্ত শিল্প-কারখানায় ‘সিস্টেম লস’ যেমন অস্বীকার করা বা এড়িয়ে চলার কোনো উপায় নেই, ঠিক তেমনি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লার ওজনের ক্ষেত্রেও ‘সিস্টেম লস’ অস্বীকার করার উপায় নেই। মনে করুন বড়পুকুরিয়ার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে জাতীয় গ্রিড লাইনে সরবরাহ করা হলো। কিন্তু বিউবো কি গ্রাহকের কাছ থেকে শতভাগ (৫০০ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ বিল আদায় করতে পারবে?

আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে, বিউবো সেটা পারবে না এবং ‘সিস্টেম লস’ দেখিয়ে সমন্বয় করবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের পর তা বিভিন্ন জায়গায় পাইপ-লাইনের মাধ্যমে পরিবহন ও বিতরণের পর উত্তোলিত গ্যাসের শতভাগ বিল কি কখনো কোনো কোম্পানি আদায় করতে পেরেছে? এ ক্ষেত্রেও উত্তর আসবে ‘না’ এবং ‘সিস্টেম লস’ দেখিয়ে গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো সমন্বয় করবে।

এখানেই আমার জোরালো প্রশ্ন হলো, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কর্তৃপক্ষ কেন ‘সিস্টেম লস’-এর বিষয়টা মাথায় রাখল না? এরকম বোকামির ফাঁদে তারা কিভাবে পা দিলো? ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত যদি ১.৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ ‘সিস্টেম লস’-এর বিষয়টা যদি বোর্ড মিটিংয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে রেকর্ড রাখত তাহলে প্রায় তেরো বছরের ব্যবধানে এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লার কিউমুলেটিভ লসের বিষয়টা ধরা পড়ত এবং আজকের মতো এরকম জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
বর্তমান পরিস্থিতি এমন জটিল আকার ধারণ করেছে যে, বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ক্ষেত্রে শতভাগ ‘সিস্টেম লস’ যেমন মেনে নেয়া যাচ্ছে না, তেমনি মেনে নেয়া যাচ্ছে না শতভাগ কয়লা উধাও হওয়ার যুক্তি। এ যেন শাঁখের করাত। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির সাবেক চার এমডিসহ কোম্পানি বোর্ডের সব সদস্য এর দায় এড়াতে পারেন না। আর সেই সাথে চরম শাস্তি এড়াতে পারেন না কোম্পানির সদ্য সাবেক সচিব আবুল কাশেম।

আবুল কাশেম সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, একজন আমলার লেখা চিরকুট হাতে করে নিয়ে এসে একজন কর্মচারীর পদের পরিবর্তে জুনিয়র অফিসার হিসাবে কয়লাখনি প্রকল্পে যোগদানের পর হতে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে জিএম পদবি পর্যন্ত পদোন্নতির পাশাপািশ কোম্পানি সচিব হয়েছে এবং সেই সাথে নামে-বেনামে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। এ যেন আলাদিনের প্রদীপের কল্প-কাহিনীকেও হার মানায়। মারাত্মক অনিয়মের মাধ্যমে নিজের প্রমোশন নেয়ার পাশাপাশি প্রমোশন বাণিজ্য ও কয়লাবাণিজ্য তার অন্যতম কাজ ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে।

ওই ব্যক্তির পদোন্নতির প্রফাইল অতি সূক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও দুদক বহু অজানা তথ্য বের করতে পারবে বলে জনশ্রুতি আছে। অভিযুক্ত সাবেক চার এমডির মধ্যে প্রথম দু’জনের (কামরুজ্জামান ও আমিনুজ্জামান) নামে-বেনামে ক্রয় করা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব নেয়ার পাশাপাশি আমিনুজ্জামানের সর্বশেষ স্নাতকোত্তর শিক্ষা সনদের বিষয়টা তদন্তে নেয়া প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করেন।

এ ছাড়া যেসব অভিজ্ঞতার সনদপত্র ব্যবহার করে চাকরিতে প্রবেশ ও পদোন্নতি নিয়ে সদ্য বিদায়ী এমডি হাবিবুদ্দিন দায়িত্ব পালন করছিলেন সেগুলোর সত্যতা যাচাই-বাছাই করার পাশাপাশি পেট্র্রোবাংলার বিধি মোতাবেক প্রমোশন প্রফাইল তদন্ত করে দেখা উচিত। হিসাব বিভাগের সাবেক জিএম ও বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির এমডি আবদুল মান্নান পাটোয়ারীর ফুলবাড়ীর আশপাশে নামে-বেনামে ক্রয় করা জমিজমা ও নগদ সম্পদের হিসাব এবং ভিন্ন/নিকটজনের নামে বড়পুকুরিয়া থেকে কয়লা ক্রয়-বিক্রয়ের লাইসেন্স, ইত্যাদি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি পেট্র্রোবাংলার বিধি মোতাবেক পদোন্নতির প্রফাইল অতি সূ²ভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত।

উল্লেখ্য অভিযুক্ত ২১ জন ব্যক্তির তালিকায় আবদুল মান্নান পাটোয়ারীর নাম থাকায় অতীতে এবং বর্তমানে নির্যাতিত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মনে আনন্দ ফিরে এসেছে।
পরিশেষে বলতে হয়, আমার সাবেক কর্মস্থলের কেলেঙ্কারির সংবাদে দুঃখিত ও মর্মাহত। ইতোমধ্যেই পেট্রোবাংলা গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। মাইনিং বিষয়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞানহীন আমলাকেন্দ্রিক আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।

বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানহীন ওই কমিটির ভুল তদন্ত রিপোর্ট যদি একবার মাইনিং সেক্টরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তাহলে অদূরভবিষ্যতে বাংলাদেশে নতুন নতুন কয়লাখনির উন্নয়ন, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা একেবারে ভেঙে পড়বে। কাজেই সময় থাকতে সাধু সাবধান।

এ ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনিং ভূতত্ত্ব ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বা বিজ্ঞানসম্পন্ন গবেষক শিক্ষকদের নিয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি যদি সরকার গঠন করেন তাহলে অনেক ভালো এবং গ্রহণযোগ্য ফলাফল বেরিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি।

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে অর্জিত অভিজ্ঞতা, গবেষণা, বৈজ্ঞানিক মডেলিং এবং শাবিপ্রবির পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতার সুবাদে বাংলাদেশ সরকার চাইলে কয়লাখনির চলমান ক্রান্তিকালে এ লেখকের কাছ থেকে তদন্ত কাজে সহায়তা নিতে পারেন।

তবে তা হতে হবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনিং ভূতত্ত্ব ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন গবেষক শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটির ফ্রেমে, আমলাকেন্দ্রিক তদন্ত কমিটির ফ্রেমে নয়।


লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


আরো সংবাদ