২১ আগস্ট ২০১৮

আস্থা, আস্থাহীনতা ও বিশ্বাসভঙ্গ

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন - ছবি : সংগ্রহ

এবার রাজধানীতে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে শিক্ষার্থীরা ৯ দফা দাবিতে আন্দোলনে নামে এবং অনেক বাধা-প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সে আন্দোলন অব্যাহত রাখে প্রায় এক সপ্তাহ। অবশ্য অনেকটা তড়িঘড়ি করে সরকার শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু আন্দোলনকারীরা এতে আশ^স্ত হয়নি। বরং সরকারের বারবার দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা সত্ত্বেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাজপথেই অবস্থান নেয়। তারা তাদের দাবির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন চেয়েছিল। যদিও রাতারাতি তাদের সব দাবির সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আর মধ্যস্বত্বভোগীরা তা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা। তাই সরকার দাবি মানার ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়ন বেশ সহজসাধ্য হবে না বলেই মনে হচ্ছে। যেমনটি হয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ক্ষেত্রে। উভয় ক্ষেত্রে একটা নেপথ্যশক্তি ক্রিয়াশীল আছে বলেই মনে হচ্ছে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের এমন জেদকে কেউ কেউ বাড়াবাড়ি হিসেবেই দেখেছে। সরকার শিক্ষার্থীদের অনড় অবস্থান ও একগুঁয়েমিকে বিরোধীদলীয় ভূতের আছর হিসেবে দেখেছে। অবশ্য সব কিছুতেই বিরোধী দলকে জড়ানো সরকারের মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কারো ওপর দোষ চাপিয়ে তো বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। তবে আত্মসচেতন মানুষ বলছেন ভিন্ন কথা। তারা দাবি করছেন, অতীতে বিশ্বাসভঙ্গের কারণেই শিক্ষার্থীরা সরকারের কথায় আস্থা রাখতে পারেনি। তাদের পরিণতি তাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের ভাগ্যই বরণ করে অবশেষে।

মাত্র কয়েক দিন আগেই কোটা সংস্কার নিয়ে সরকার রীতিমতো ডিগবাজি দিয়েছে এ কথা কারো অজানা নয়। ছাত্ররা সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা সংস্কারের দাবি করলেও সরকারের সর্বোচ্চপর্যায় থেকে কোটাপদ্ধতি পুরোপুরি বাতিলের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু তারা তাদের সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারীরা বিষয়টিকে বারবার সামনে এনে তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে অনড় অবস্থান নেয়। কিন্তু এ জন্য সরকারকেই দায়ী করা হয়েছে। কারণ, ওয়াদা ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে সরকারের পক্ষ থেকেই। ফলে সরকারের প্রতি আস্থার জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে গেছে।

সরকারের এমন ওয়াদা ভঙ্গের মহড়াকে অনেকেই রাষ্ট্রীয় অনাচার হিসেবেই দেখছেন। কারণ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নয়, বরং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে সম্প্রতি দুঃখজনক ঘটনারই অবতারণা হয়েছে। ফলে এবারের আন্দোলনে সব দাবি মেনে নেয়ার সরকারি ঘোষণায় শিক্ষার্থীরা মোটেই আশ্বস্ত হয়নি। কারণ, কোটা আন্দোলন বিষয়ে সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি। এমনকি দাবি মানার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের ওপর সরকার দলন-পীড়ন চালিয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অহেতুক মামলা দিয়ে রিমান্ডের নামে নির্যাতনের অভিযোগও আছে সরকারের বিরুদ্ধে। আর রাষ্ট্রই যদি জনগণের কাছে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারে তাহলে তারা নাগরিকদের কিভাবে প্রতিশ্রুতি পালনে বাধ্য বা অনুপ্রাণিত করবে, এ প্রশ্নের উত্তর মোটেই সহজসাধ্য নয়। আর এই মওকাটা শিক্ষার্থীরাও কাজে লাগিয়েছে বেশ সফলতা ও স্বার্থকতার সাথেই।

শিক্ষার্থীদের অতি সম্প্রতি আন্দোলনে দেশে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, সে জন্য সাধারণ মানুষ সরকারকেই দায়ী করে। সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে যেমন আন্দোলনের যৌক্তিকতা স্বীকার করেছে, তেমনি এবারের ছাত্র আন্দোলন প্রায় সব শ্রেণীর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পেয়েছে। দাবি মানার ঘোষণার পরও শিক্ষার্থীদের অনড় অবস্থানকে কেউই বাঁকা চোখে দেখেনি, বরং সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনকে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকেই নিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। আত্মসচেতন মানুষ আন্দোলনকারীদের আস্থাহীনতার জন্য সরকারকেই দায়ী করে। রাষ্ট্রের পক্ষে এমন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে একেবারেই নজিরবিহীন। ফলে আস্থা-অনাস্থার যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, তা সমাধানের দায়িত্ব সরকারেরই। এ দায় সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

আইনের শাসন, শান্তি-শৃঙ্খলা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কোনো অজুহাতেই রাষ্ট্র এই দায়িত্ব এড়াতে পারে না। নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌম ক্ষমতা- এই চারটি উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত। সরকার হলো রাষ্ট্রের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রাষ্ট্রে শাসনকাজ পরিচালনার জন্য যারা নিয়োজিত থাকেন, তাদের সমষ্টি হচ্ছে সরকার। রাষ্ট্রকে জাহাজের সাথে তুলনা করলে সরকারকে তার ক্যাপ্টেন বা চালকের সাথে তুলনা করা যায়। সরকারের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। মূলত সরকারের সফলতা-ব্যর্থতার ওপর রাষ্ট্রের সফলতা-ব্যর্থতা পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাই সরকার যদি সফল হয়, তাহলে জনজীবনে স্বস্তি থাকে; অন্যথায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সরকার দেশের ক্যাপ্টেন বা চালক হিসেবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেনি, বরং সরকারের নির্লিপ্ততা, দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলেই মনে হচ্ছে। ফলে গণ-অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠছে।

অধ্যাপক গার্নারের মতে, ‘রাষ্ট্র হলো বহুসংখ্যক ব্যক্তি নিয়ে গঠিত এমন এক জনসমাজ, যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, যা বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত এবং যাদের একটি সুসংগঠিত সরকার আছে, যার প্রতি ওই জনসমাজ স্বভাবতই অনুগত’। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অনেক দুর্বলতার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো- আমাদের সরকার অসংগঠিত। এমনকি সরকারের নিয়মতান্ত্রিকতা নিয়ে প্রশ্নও বেশ জোরালো। তাই একটি প্রশ্নবিদ্ধ পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত কোনো সরকারের প্রতি জনসমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুগত হয় না। আনুগত্যহীন জনসমাজ নিয়ে কোনো জাতি সামনের দিকে এগোতে পারে না। জনগণের আনুগত্য ছাড়া রাষ্ট্র বা সরকার কোনোটাই সফল হয় না। আর এ ধরনের সরকারের ভিত্তি সবসময়ই দুর্বল। সঙ্গত কারণেই তাদের সবসময় আত্মরক্ষার চিন্তায় তটস্থ থাকতে হয়। যেহেতু সরকারের ওপর জনসমাজের আনুগত্যের বিষয়টি নিরঙ্কুশ নয়, তাই সরকার কোনোভাবেই সুসংগঠিত নয় বলেই ধরে নেয়া যায়। কোনো অসংগঠিত সরকার হয়তো ক্ষমতায় চর্চা করতে পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই গণমুখী হতে পারে না। আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট তার বাস্তব প্রমাণ।

এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কমবেশি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তাই যত কথাই বলা হোক না কেন, দেশের যাতায়াতব্যবস্থা দুর্ঘটনামুক্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের দেশে দুর্ঘটনার প্রবণতা অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ, আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সুশৃঙ্খল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই এর নেতিবাচক প্রভাব রাষ্ট্রের সব পর্যায়ের সাথেই ক্রিয়াশীল। খুব সঙ্গত কারণেই দেশের পরিবহন সেক্টরও এ থেকে মোটেই আলাদা নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনবহুল আমাদের এই দেশে পরিবহন সেক্টরে সীমাহীন নৈরাজ্যের কারণেই আমাদের দেশে এখন সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। আমাদের দেশের পরিবহন সেক্টর যে খুবই নৈরাজ্যপ্রবণ তা একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে খুবই স্পষ্ট। ফলে আত্মসচেতন মানুষের মধ্যে এ ধারণাও বদ্ধমূল হয়েছে যে, শুধু পরিবহন সেক্টর নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার ছাড়া কোনোভাবেই দেশকে দুর্ঘটনামুক্ত করা সম্ভব নয়। আইন ও সাংবিধানিক শাসনও নিশ্চিত করা যাবে না। মূলকে ত্রুটিমুক্ত করা না গেলে শাখা-প্রশাখা নিয়ে টানাটানি খুব একটা সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।

সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েই বেশ আত্মতুষ্টিতে ভোগে। মনে হয় তারা এবার অসাধ্য সাধন করেই ফেলেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবি রাজপথে নেমে আসায় প্রমাণ হয়, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় মোটেই সফলতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। যদি তারা সফলই হতেন, তাহলে দাবি আদায়ের জন্য শিশুদের রাজপথে নেমে আসতে হতো না। কারণ, শিশু-কিশোরদের এসব বোঝার কথা নয়। এদের এখন খেলাধুলা করার বয়স। কিন্তু সরকারের উপর্যুপরি ব্যর্থতায় শিশুদের আত্মসচেতন করে তুলেছে। দেশের পরিবহন সেক্টরে যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা চলছে, তা তো শিক্ষার্থীরাই সরকারকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। রাস্তায় অনুমোদনবিহীন ও মানহীন যানবাহন, লাইসেন্সহীন ড্রাইভারেরা পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে জিম্মি করে রেখেছে। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, আমলারা যে আইন মানেন না তাও এ আন্দোলনরত শিশুদের মাধ্যমেই আমরা জানতে পেরেছি।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে দেশের পরিবহন সেক্টরের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। বলা হয়েছে, দেশের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা যথাক্রমে ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ও ২০ লাখ। কিন্তু বিআরটিএ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে মাত্র ২৬ লাখ ৩৯ হাজার। এতে প্রমাণ হয়, ৯ লাখ নিবন্ধিত যানবাহনের ড্রাইভারই লাইসেন্সবিহীন। আর অনিবন্ধিত যানবাহনের ড্রাইভারদের লাইসেন্স থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। ফলে আমাদের দেশের পরিবহন সেক্টরে অনিবন্ধিত যানবাহন ও লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারদের দৌরাত্ম্য রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। আবার ড্রাইভারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে টিনএজার। এদের বেশির ভাগের বয়স ১৪ থেকে ১৫ বছর। ফলে পেশাগত ক্ষেত্রে তাদের অদক্ষতার বিষয় খুবই স্পষ্ট। এদের মধ্যেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মাদকাসক্ত। মূলত এসব কারণেই প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। ফলে পুরো পরিবহন সেক্টর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।

দেশের পরিবহন সেক্টরের যে এমন বেহাল অবস্থা তা আমরা জেনেছি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরুর পর। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা রাস্তায় নামলে যে ভূতের পিঠে সওয়ার হই, এ অনুভূতি ছাত্ররাই আমাদের মধ্যে জাগ্রত করেছে। ২৯ জুলাইয়ের ঘটনার পর পরিবহন সেক্টরের আরো ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এমনকি সেদিনের দুর্ঘটনাকবলিত বাসের রুট পারমিট ছিল না এবং ড্রাইভারও লাইসেন্সবিহীন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর দুর্ঘটনায় তিন হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। কিন্তু যাত্রীকল্যাণ সংস্থার মতে, গত বছর দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার। দুর্ঘটনা প্রায় পাঁচ হাজার। বিআরটিএর সূত্র মতে, দেশে ভারী যানবাহনের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। সংস্থাটি ড্রাইভারদের জন্য লাইসেন্স ইস্যু করেছে এক লাখ ৩৮ হাজার। এতে প্রমাণিত হয়, প্রায় ৭০ হাজার ভারী যানবাহন লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারেরাই চালিয়ে থাকেন। ফলে দেশের পরিবহন সেক্টর মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই বাড়ছে। এদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামীতে এদের দৌরাত্ম্য যে আরো বৃদ্ধি পাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

দেশে একটি প্রতিষ্ঠিত সরকার ও পরিবহনের জন্য একাধিক মন্ত্রণালয় থাকার পরও গণপরিবহনের এই দৈন্যদশা ও সীমাহীন নৈরাজ্য সরকারের উপর্যুপরি ব্যর্থতার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। সরকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। অবশ্য এই উদ্যোগ সরকারকে আগেই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে গ্রহণ করা উচিত ছিল। এটি সরকারের ব্যর্থতার একটি দলিল। যা-ই হোক, সরকারের এই বিলম্বিত ও দায়ে পড়া উপলব্ধি প্রশংসা করার আগে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার, সুশাসনের জন্য আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং এ জন্য সরকারকে ন্যায়বান হওয়াও জরুরি। দার্শনিক প্লেটোর ভাষায়, 'When the prince is virtuous, laws are unnecessary; when prince is not virtuous useless.' অর্থাৎ যখন শাসক হবেন ন্যায়বান, তখন আইন নিষ্প্রয়োজন। আবার যখন শাসক দুর্নীতিপরায়ণ হন, আইন তখন হবে নিরর্থক।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। তাদের ৯ দফা সরকারও মেনে নেয়। কিন্তু বিষয়টির সমাধান হচ্ছে না। এক দিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, অন্য দিকে অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট ও সরকারের বলদর্পিতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। কিন্তু এ সমস্যার সমাধান একেবারেই অসাধ্য ছিল না। এখানে শুধুই আস্থা-অনাস্থার সঙ্কটই সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। আর এ সঙ্কট সৃষ্টি হয় অতীতে অঙ্গীকার পূরণের ব্যর্থতা থেকে। তাই ছাত্র আন্দোলনসহ সব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারেরই। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। অন্যথায় আমাদের মুক্তি সহজসাধ্য হবে না। মনীষী থমাস পেইনের ভাষায়, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। জনগণ সরকারের কাছে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণই আশা করে।
smmjoy@gmail.com


আরো সংবাদ