১৫ নভেম্বর ২০১৮

নয়া প্রধানমন্ত্রীর পরিণাম

নয়া প্রধানমন্ত্রীর পরিণাম - ছবি : সংগৃহীত

কথা তো সত্য, কিন্তু কথাটি অসম্মানের, কলঙ্কের। করাচি ও কাচরা (আবর্জনা) একে অপরের সমার্থক হয়ে গেছে। করাচির কাচরা অর্থাৎ আবর্জনা নিছক দুর্গন্ধের স্তূপ নয় বরং এ দুর্গন্ধ থেকে কখনো কখনো এমন জিনিসও ছড়িয়ে পড়ে, যাকে এ জাতি অনেক পবিত্র মনে করে। ২৫ জুলাইয়ের নির্বাচনের আগে পাকিস্তানের জনগণকে এ কথা বলা হচ্ছিল, ভোট একটি পবিত্র আমানত, বেশ ভেবে চিন্তে ব্যালটবাক্সে তা প্রদান করুন।

কিন্তু ২৫ জুলাইয়ের পর অনেক ভোট করাচিতে আবর্জনার স্তূপে জ্বলতে দেখা গেছে। করাচির নাগরিকরা আবর্জনার স্তূপে জ্বলতে থাকা জাতির কিছু পবিত্র আমানতকে আগুন থেকে উদ্ধার করলে জানা যায়, এগুলো এমন ব্যালট পেপার ছিল, যেগুলোতে পিপলস পার্টির নির্বাচনী প্রতীক তীর ও এমকিউএম পাকিস্তানের নির্বাচনী প্রতীক ঘুড়িরতে সিল মারা ছিল। পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন ব্যালট পেপার সংরক্ষণের জন্য পূর্ণমাত্রা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি করেছিল, কিন্তু যখন এ ব্যালট পেপারগুলো আবর্জনার স্তূপে জ্বলতে দেখা গেল, তখন এ কথা বলা ভুল হবে না, নির্বাচন কমিশন ফুলপ্র“ফ বা পূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থা কায়েম না করে বরং পুরো জাতিকে ফুল বা বোকা বানানোর ব্যবস্থা করেছে। ২৫ জুলাই রাতে আমি করাচিতে জিও নিউজের ইলেকশন ট্রান্সমিশনে উপস্থিত ছিলাম। রাত ৯টার পর পিপলস পার্টি, এমকিউএম, মুসলিম লিগ (এন), মুত্তাহিদা মজলিসে আমল, পিএসপি, তেহরিকে লাব্বাইক ও এএনপিসহ কয়েকটি দল অনিয়মের বিরুদ্ধে হইচই শুরু করে। ২০১৮-এর নির্বাচনের রাতে আমার ২০১৩-এর নির্বাচনের কথা মনে পড়ে যায়। ২০১৩ সালে তেহরিকে ইনসাফ অনিয়ম নিয়ে হইচই করেছিল। ২০১৩ সালের নির্বাচনের রাতে লাহোর থেকে তেহরিকে ইনসাফের প্রার্থী শাফকাত মাহমুদ আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, তার ফলাফল আটকে দেয়া হয়েছে। আমি ইলেকশন ট্রান্সমিশনে জোরালো প্রতিবাদ জানাই, শাফকাত মাহমুদের ফলাফল কেন আটকানো হলো? করাচিতে ড. আরেফ আলাভি এ রকমই ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। যাদের কথা মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারা বেঁচে গেছেন, বাকিরা সব হেরে গেছেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনের রাতে তেহরিকে ইনসাফ নয়, বরং পিপলস পার্টি, এমকিউএম, মুসলিম লিগ (এন) ও এমএমএ চিৎকার করছিল। রাত সাড়ে ১১টার সময় মুসলিম লিগের (এন) এক সাবেক মন্ত্রী হোয়াটস অ্যাপ কলে বলেন, আমরা লুণ্ঠিত হয়েছি, আমরা শেষ হয়ে গেছি। কেউ আমাদের কথা শুনছে না। দয়া করে আমাদের জন্য আওয়াজ তুলুন। মনে চাইল, তাকে জবাবে বলি, বাধা দিতে পারলে বাধা দিন। কিন্তু পরক্ষণে মনে হলো, বেচারা কঠিন সময় পার করছেন। অবশ্য আমি তাকে এতটুকু বললাম, ২০১৩ সালের নির্বাচনের রাতে তেহরিকে ইনসাফের লোকজনও এমনই চিৎকার করেছিলেন। আর আমি যখন তাদের অভিযোগ জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছিলাম, তখন আপনি আমার বিরুদ্ধে ইমরান খানের সাথে বন্ধুত্বের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছিলেন।

আর ইসহাক ডার তো নির্বাচন কমিশনের কাছে আমার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছিল। আমি এ মুসলিম লিগ নেতার আরো কিছু বক্তব্য শুনে তার অভিযোগও প্রচার করে দিই। ২৫ জুলাই রাতে অনিয়মের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছিল বেলুচিস্তান থেকে। ২০১৩ সালেও সবচেয়ে বেশি অভিযোগ বেলুচিস্তান থেকে এসেছিল এবং কোয়েটায় আবর্জনার স্তূপ থেকে ব্যালট পেপার পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৩ সালে নির্বাচনের আগেই সবাই জানত, নওয়াজ শরিফ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে বেশির ভাগ মানুষেরই জানা ছিল, ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হবেন। আমাদের দেশে নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ হয়ে যায়। নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতামাত্র। যেখানে কোটি কোটি রুপি খরচ করা হয়। যে পন্থায় ২০১৩ সালে নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল, ঠিক ওই পন্থাতেই ২০১৮ সালে ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হচ্ছে।

২০১৩ সালেও নওয়াজ শরিফের স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রয়োজন পড়েছিল। ২০১৮ সালে ইমরান খানেরও স্বতন্ত্র প্রার্থীর পেছনে ছুটতে হচ্ছে। পাঞ্জাবে সরকার গঠনের জন্য তেহরিকে ইনসাফ মাওলানা আজম তারেকের ছেলে মুয়াবিয়া আজম তারেকের দরোজায় পৌঁছে গেছে। মুসলিম লিগের (এন) চৌধুরী পারভেজ ইলাহির কথা মনে পড়ছে। স্মরণ করুন, ২৫ জুলাইয়ের আগে মুসলিম লিগের (এন) লোকেরা কী না বলেনি।

কেউ বলেছে, নির্বাচনের পর পিপলস পার্টি আমাদের খুঁজবে, কিন্তু আমরা যাব না। কেউ বলেছে, ২৫ জুলাই নওয়াজ শরিফের বিবৃতি পাকিস্তানে বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে। কিন্তু ২৫ জুলাইয়ের পর মুসলিম লিগ (এন) এক দিকে পিপলস পার্টির দিকে ঝুঁকে মিলে যাচ্ছে, অপর দিকে চৌধুরী পারভেজ ইলাহিকে স্যালুট মারছে। কোথায় গেল আপনাদের বিপ্লব আর আপনাদের দর্শন? যখন এ অধম পানামা কেলেঙ্কারির পর এ কথা বলা শুরু করে, রাষ্ট্রীয় দফতরগুলোর সাথে লড়াইয়ের পরিবর্তে কিছু প্রশ্নের স্পষ্ট ও সোজা উত্তর দেয়া হোক, তখন মারইয়াম নওয়াজের রূপই বদলে যায়। এরপর তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সোস্যাল মিডিয়া সেল আমার মরহুম পিতাকেও ছাড় দেয়নি। আমি তার কিছুই ক্ষতি করতে পারতাম না। তবে যে ক্ষতি করতে পারে, তার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে এ অধম ৩০ মে, ২০১৬-এর কলামে আপনাদের অবহিত করেছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘মাইনাস থ্রি’। ওই কলামে বলা হয়েছিল, আলতাফ হোসাইনের পর নওয়াজ শরিফ ও আসিফ জারদারিকে মাইনাস করা হবে। নওয়াজ শরিফ মাইনাস হয়ে গেছেন। জারদারিকে মাইনাস করার প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে।

২২ জুন, ২০১৭ ‘মাফিয়া’ শিরোনামের কলামে বলেছি, মুসলিম লিগের (এন) ভেতর ঝামেলা শুরু হয়েছে। কিছু মন্ত্রীর ধারণা, প্রধানমন্ত্রী হাউজের নিয়ন্ত্রণ নওয়াজ শরিফের হাত থেকে বেরিয়ে একজন মাফিয়ার হাতে চলে গেছে, যে সরকারকে শেষ করে দেবে। কিছু দিন পর নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী হাউজের ওপর যার নিয়ন্ত্রণ ছিল, তাকেও গ্রেফতার করা হয়। ২৫ জুলাই, ২০১৮ মুসলিম লিগের (এন) কপালে যা ঘটেছে, তা আমরা এক বছর আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম। আর এ জন্য আমি ৩১ জুলাই, ২০১৭ ‘বাধা দিতে পারলে বাধা দাও’ শিরোনামে আমার কলামে লিখেছিলাম, মুসলিম লিগের (এন) ‘বাধা দিতে পারলে বাধা দাও’ ধরনের অহঙ্কারী মনোভাব ছেড়ে দিয়ে ‘ইয়া আল্লাহ ইয়া রাসূল নওয়াজ শরিফ নির্দোষ’ ধরনের বিনয়ী মনোভাব অবলম্বন করা উচিত। মুসলিম লিগের (এন) নেতৃবৃন্দ বিনয়ী মনোভাব অবলম্বন করেননি। বিপ্লবের ঘোষণা করেছেন, কিন্তু অতীতের ভুলের স্বীকার করেননি। নওয়াজ শরিফ নিজের অহমিকার ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন।

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ আমার কলামের শিরোনাম ছিল ‘তিনটির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই’। তাতে লিখেছি, মুসলিম লিগ (এন) ও পিপলস পার্টির পাশাপাশি তেহরিক ইনসাফও ক্ষমতা লাভের জন্য সমঝোতা করতে দেরি করেনি। তিনটির মধ্যে কোনো তফাত নেই। পরিশেষে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেছি, যা কিছু নওয়াজ শরিফ ও আসিফ জারদারির সাথে ঘটেছে, তার সবটুকু ইমরান খানের সাথেও হতে পারে। আমার মনের ইচ্ছা, ইমরানের খানের সাথে ওই সব কিছু না ঘটুক, যা আগের প্রধানমন্ত্রীদের সাথে হয়েছে। আমি ২৪ জুলাই, ২০১৭ আমার কলামের শিরোনাম দিয়েছিলাম ‘পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর পরিণাম’। ওই কলামে লিখেছিলাম, যতক্ষণ রাজনৈতিক দলগুলো মজবুত না হবে, ততক্ষণ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর পরিণাম তাই হবে, যা নওয়াজ শরিফের হয়েছে।

আজকের কলামে আবার আরজ করছি, ইমরান খান যেন ওই সব ভুল থেকে দূরে থাকেন, যে ভুল নওয়াজ শরিফকে কারাগারে প্রেরণের কারণ হয়েছে। কয়েকদিন আগে মাওলানা ফজলুর রহমান আসিফ জারদারিকে মুসলিম লিগের (এন) সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব প্রদান করলে জারদারি জবাব দেন, ‘ইমরান খানকে শিক্ষা দিতে চাইলে তাকে প্রধানমন্ত্রী হতে দিন।’ খান সাহেব, ওই প্রধানমন্ত্রী হাউজের দিকে যাবেন না, যেখানে কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেন না। পুরান প্রধানমন্ত্রী হাউজের পাশাপাশি পুরাতন প্রধানমন্ত্রীদের পুরান ভুলগুলো থেকেও দূরে থাকুন। নতুবা আপনার পরিণাম পেছনের প্রধানমন্ত্রীদের চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে না। আর এ পরিণাম আগামী ছয় মাসে নজরে এসে যাবে।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ৩০ জুলাই, ২০১৮ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক


আরো সংবাদ