১৪ নভেম্বর ২০১৮

কী বলেন ট্রাম্প-পুতিন

ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক - ছবি : এএফপি

রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে অবস্থান পরিবর্তনের আভাস মিলল ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দূরে থেকে অনেক দিন ধরে পরস্পরের প্রশংসা করছিলেন তারা। পুতিনের প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেছিলেন- ‘তিনি খুব ভালো নেতা’, ‘টাফ কুকি’। অন্য দিকে ট্রাম্পকে ‘খুবই উজ্জ্বল একজন ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমান এবং বহুমাত্রিক’ বলেছিলেন পুতিন।

এত কিছুর পর দুই নেতার মুখোমুখি বৈঠকটি নিয়ে বিশ^ব্যাপী বইছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। দুই নেতার হাত মেলানো, প্রায় দুই ঘণ্টা একান্ত বৈঠক, প্রথম দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, এক টেবিলে দুপুরের খাবার খাওয়া ও আলোচনা করা- সবই আসছে আলোচনায়। বৈঠকটিকে ‘লজ্জাজনক, অপমানজনক, রাষ্ট্রদ্রোহের সাথে তুলনীয়’ বলছে সমালোচকেরা।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, হেলসিঙ্কিতে অনুষ্ঠিত বৈঠক প্রত্যেকের জন্যই একটি শুভ সূচনা। আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ এবং ভালোভাবে শেষ হয়েছে। আমরা যে কয় ঘণ্টা একসাথে কাটিয়েছি তা ছিল খুবই গঠনমূলক। এই বৈঠক রাশিয়ার সাথে বলিষ্ঠ আলোচনার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়ার সূচনা করেছে। ভবিষ্যতে দুই দেশ এরকম আরো আলোচনায় বসবে বলে আমি আশাবাদী।
একজন সাংবাদিক ট্রাম্পের কাছে জানতে চান প্রেসিডেন্ট পুতিন তার প্রতিদ্বন্দ্বী কি না? ট্রাম্প বলেন, আমি তাকে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী বলেই মনে করি এবং তিনি একজন ভালো প্রতিদ্বন্দ্বী। আমি মনে করি প্রতিদ্বন্দ্বী শব্দটি একটি সম্পূরক।

সংবাদ সম্মেলনে পুতিন বলেন, আজকের বৈঠকের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সব ইস্যুতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার আস্থা সৃষ্টি হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আলোচনা খোলামেলা এবং গঠনমূলক হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে সফল, উপকারী ও ফলপ্রসূ। এটা ঠিক যে- অনেক সমস্যাই রয়ে গেছে, আমরা সব বাধা দূর করতে পারিনি। কিন্তু আমি মনে করি, এ পথে আমরা প্রথম একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পেরেছি। এটি সবার কাছে পরিষ্কার যে, একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চলছে। বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাধা, চলমান উত্তেজনা এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পেছনে সঠিক কোনো কারণ নেই। স্নায়ুযুদ্ধের যুগ শেষ হয়েছে। এখন আমেরিকা এবং রাশিয়ার একসাথে মিলে সব সমস্যা সমাধান করা উচিত।

২০১৬ সালের নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ নিয়ে পুতিন বলেন, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনোই হস্তক্ষেপ করেনি রাশিয়া। তবে আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় চেয়েছিলাম।
নিজের গোয়েন্দা দফতর ও পুতিনের মধ্যে তিনি কাকে অধিক বিশ্বাস করেন, এমন এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, রুশ প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত জোরালো ভাষায় কোনো রকম হস্তক্ষেপের কথা অস্বীকার করেছেন। তার এ কথায় বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই। তিনি বুঝতে পারেন না, রাশিয়া কেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কম্পিউটার ব্যবস্থা থেকে তথ্য চুরি করতে যাবে। রাশিয়ার মাথা ঘামানোর কোনো কারণ নেই।

পুতিনের সাথে বৈঠকে বসার আগে টুইটারে দেয়া এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার সাথে আমাদের সম্পর্ক এত খারাপ কখনো হয়নি। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বছরের ‘বোকামি ও নির্বুদ্ধিতাকে’ ধন্যবাদ এবং এবারে দায়ীদের থামাতে হবে। আজকের বৈঠক আরো অনেক আগেই অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত ছিল। রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে খারাপ অবস্থার পরিবর্তন চার ঘণ্টা আগেই হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনে করা তদন্তেরও নিন্দা জানান ট্রাম্প। টুইটারে করা ট্রাম্পের ওই কমেন্টে ‘লাইক’ দেয় রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বৈঠক শুরুর আগে পুতিনের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই সফলভাবে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন, সফল সমাপ্তি ও রাশিয়ার পারফরম্যান্সের জন্য তাকে অভিনন্দন জানান ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, সত্যিই চমৎকার একটি বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য আমি আপনাকে শুভেচ্ছা জানাতে চাই, এটি অন্যতম সেরা আয়োজনগুলোর একটি ছিল। আমি বেশ কয়েকটি খেলা দেখেছি। বিশ্বকাপের আয়োজন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের আলোচনার জন্য চীনের বাণিজ্য, দ্বিপক্ষীয় বন্ধু প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ আরো বেশ কিছু বিষয় রয়েছে। আমাদের একসাথে কাজ করার বড় সুযোগ রয়েছে, আমরা অনেক বছর ধরে একসাথে হতে পারিনি। আমরা একসাথে পথ চলি; সেটি দেখতে চায় বিশ্ব। আমাদের কাছে বিশ্বের ৯০ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, এটি ভালো নয়।

ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে পুতিনের পাশে বসে উষ্ণ বক্তব্য দিয়ে বৈঠক শুরু করেন ট্রাম্প। আর তখনই রাশিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ার আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, অনেক দিন থেকেই আমি দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছি। আমি মনে করি আমরা একটি অসাধারণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারব। আমি সেটিই আশা করি। আমি একথাই বলে আসছি। আমি নিশ্চিত যে, আপনারাও কয়েক বছর ধরে এ কথা শুনে এসেছেন। আমি প্রচার চালিয়ে বলেছি, রাশিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক ভালো ব্যাপার, খারাপ কিছু না। রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের উন্নতি হলে সেটি ভালো হবে।
বৈঠকের শুরুতে পুতিন বলেন, আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পেরে আমি আনন্দিত। যদিও আমাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। আমরা ফোনে কথা বলেছি এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে আমাদের বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। তবে অবশ্যই নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার এবং বিশ্বের সমস্যাপূর্ণ অনেক এলাকা নিয়ে আলোচনার এটিই সময়।

সিরিয়া থেকে শুরু করে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টিসহ কোরিয়া উপদ্বীপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ নিয়েও বৈঠকে কথা হয়েছে। আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে ১২ রুশ অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টিও। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্প কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন পুতিন। তবে ওই নির্বাচনে রাশিয়ার হাত থাকার কথা পুতিন জোরালোভাবেই নাকচ করেছেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।


আরো সংবাদ