২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ঝুলন্ত পার্লামেন্টের দিকে পাকিস্তান

ঝুলন্ত পার্লামেন্টের দিকে পাকিস্তান - ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা এখন তুঙ্গে। এর মধ্যেই একের পর এক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে সম্প্রতি বরখাস্ত হওয়া প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে নিয়ে। তার সমস্যা যেন কমছে না। বছর খানেক আগে মনে হচ্ছিল, নওয়াজ শরিফ অবলীলায় জিতে যাবেন। কিন্তু পর্দার অন্তরাল থেকে ঘুঁটির চালে তিনি পর্যুদস্ত। গত সপ্তাহে আরেক মামলায় তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী যুদ্ধের বদলে তাকে জেলের ঘানি টানতে হবে।
নওয়াজ শরিফ যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, অন্তত নির্বাচন পর্যন্ত যাতে দুর্নীতির মামলার রায় আটকে রাখা যায়।

কিন্তু হয়নি। সবকিছু দেখে অনেকে বলেছেন, আদালত যেন পণ করেছিল যে নির্বাচনের আগে রায় ঘোষণা করতেই হবে। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো লন্ডনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় মামলায় তাকে সাজা দিতে পেরেছে। তার মেয়ে মরিয়মকে দেয়া হয়েছে সাত বছরের কারাদণ্ড। নওয়াজ শরিফকে আগেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদচ্যুত করেছিল দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তখনই তাকে সব ধরনের সরকারি বা রাজনৈতিক পদে থাকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এবার তার কারাদণ্ড হলো।

এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেশ বিপাকেই পড়ে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও বেশ বড় ধরনের ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার ওপর দিয়ে। তার স্ত্রী কুলসুম ক্যান্সারে আক্রান্ত। তিনি লন্ডনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নওয়াজও সেখানে রয়েছেন। তবে দেশে ফিরলে তাকে কারাগারেই যেতে হবে। তিনি হয়তো আপিল করে বের হতে পারবেন। কিন্তু মনে হচ্ছে না, জামিন নির্বাচনের আগে পাবেন। অবশ্য তিনি নির্বাচনের আগেই দেশে ফিরবেন, এমন সম্ভাবনাও নেই।
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে ‘জিহাদ’ শুরু করেছে, তার প্রথম বড় ধরনের শিকার হলেন নওয়াজ শরিফ। পানামা গেট নামের যে মামলায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, তাতে তিনি বরখাস্ত হবেন, তা কেউ ভাবতে পারেনি। বরং উপর্যুপরি দ্বিতীয় মেয়াদে যখন জয়ী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনার মুখে তাকে পদচ্যুত করা হয়েছিল।

পাকিস্তানের রাজনীতির জন্য এটি বড় ধরনের একটি ঘটনা। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দলীয় প্রধানকে এমন জটিলতায় ফেলা মানে ওই দলের সম্ভাবনা বেশ কমে যাওয়া। নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগের (এন) বেলাতেও তা-ই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি পদচ্যুত হয়েছেন, কারাদণ্ডের শাস্তি পেয়েছেন বলেই নয়, আরেকটি কারণেও দলটির অবস্থা নাজুক। যেই মাত্র তিনি বরখাস্ত হয়েছেন, সাথে সাথে তার দলের অনেক সদস্য অন্য দলে যোগ দিয়েছেন। বড় অংশ যোগ দিয়েছেন ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফে (পিটিআই)।
এই মুহূর্তে ইমরান খানই এগিয়ে আছেন। যে দুর্নীতির মামলায় নওয়াজ সাজা পেয়েছেন, সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্যই তার সেরা অস্ত্র। অনেকেই মনে করছে, এবার তার কাছে এসেছে সুবর্ণ সুযোগ। ১৯৯২ সালে যেমন সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, এবারো তিনি চমক দেখাবেন। তিনিই হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু পাকিস্তানের মতো দেশে কি জনপ্রিয়তা কিংবা দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান দিয়েই ক্ষমতায় আসা যায়? সম্প্রতি পাকিস্তান সফরকালে কিছু অন্য ভাষ্যও পাওয়া গেছে। ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনার কথাই বিশ্লেষকদের মন্তব্যে উঠে এসেছে।

পাকিস্তানের এ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ মিডিয়া প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে পাকিস্তানে গিয়ে সরেজমিনে অবস্থা দেখেছেন এ লেখক। নির্বাচনের ঠিক এক মাস বাকি থাকতে বাংলাদেশ সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সাথে করাচি পৌঁছে অবাক লেগেছিল। পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াল লিখনÑ কিছুই নেই। বাংলাদেশে নির্বাচনের সম্ভাবনা আঁচ পেলেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার-প্রপাগান্ডায় অতিষ্ঠ হওয়ার জোগাড় দেখে অভ্যস্ত। তার ওপর এখন বিশ^কাপ মওসুম। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা পতাকায় মোড়া পুরো দেশ। কিন্তু করাচিতে কিছুই নেই। ওই দিন সন্ধ্যায় একটি উর্দু দৈনিকে যাওয়ার পথে গলির মুখে একটি পোস্টার দেখে স্থানীয় এক লোককে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, এটি নওয়াজ শরিফের এক প্রার্থীর। পরের দিনও করাচি ছিলাম, ঘোরাফেরা একেবারে কম হয়নি। কিন্তু আর কিছুুই চোখে পড়েনি। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাও না। পরে ৩ ও ৪ জুলাই ঢাকা ফেরার পথে করাচিতে যাত্রাবিরতি করেছি। এবার কয়েকটি পোস্টার দেখা গেল। কিন্তু আহামরি কিছু নয়। করাচি হলো পিপিপি ঘাঁটি। কিন্তু রাজপথ অন্তত কাঁপানোর জন্য কিছু করতে দেখা যায়নি।
তবে টেলিভিশন ছিল সরব। নির্বাচনের খবরই প্রায় পুরো সময় প্রচারিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা উপস্থিত আছেন পর্দায়, রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যও প্রচার করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তারাও জবাব দিচ্ছেন সাবলীলভাবে।

পাকিস্তানের সুপরিচিত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইকরাম সেহগাল জোর দিয়েই বললেন, নওয়াজ শরিফ বা ইমরান খান- কারো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। সে ক্ষেত্রে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই বেশি। আর ওই সরকার গঠন করতে পারেন নওয়াজ শরিফ সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা চৌধুরী নিসার কিংবা সদ্যবিদায়ী বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী মির আবদুল কুদ্দুস বিজেনজো।

একই ধারণা পোষণ করেন করাচিভিত্তিক উর্দু দৈনিক ফারজের এডিটর ইন চিফ মুখতার আকিলও। স্বতন্ত্র সদস্য হয়েও যেভাবে মির আবদুল কুদ্দুস বেজেনজো বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তা বেশ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি সম্ভবত ওই ঘটনাকে পুরো পাকিস্তানের জন্য টেস্ট কেস হিসেবে দেখছেন।
উল্লেখ্য, নওয়াজের পতনের সাথে সাথেই চৌধুরী নিসার দল ত্যাগ করেছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে দেশটির রাজনীতি-সংশ্লিষ্টদের প্রবল ধারণা। একই কথা প্রযোজ্য বেজেনজোর ব্যাপারেও।

তৃতীয় পক্ষ যে ক্ষমতায় আসছে, তা করাচি, ইসলামাবাদ ও লাহোরে বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাও একই কথা জানালেও। তবে তারা তা করেছেন পরিচয় না করার শর্তে। তাদের অভিমত, ইমরান খান প্রচার-প্রপাগান্ডায় যতই এগিয়ে থাকুন না কেন, তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হবে না। নওয়াজ শরিফের পক্ষেও সম্ভব হবে না পুরো পাকিস্তান থেকে সমর্থন জোগাড় করা। ফলে নির্বাচনের পর নিসার বা বেজেনজোদের কেউ দল গঠন করে সরকার চালাতে পারেন। আর তাদের সহায়তায় আসতে পারে পর্দার অন্তরালে থাকা কোনো গ্রুপ।

তবে নওয়াজের দল কিংবা ইমরান খানের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যাপারে আশাবাদী লোকের সংখ্যাও কম নয়। লাহোর যাওয়ার পথে ইসলামাবাদ বাস স্টেশনে কথা হলো দুবাইপ্রবাসে তানভির তাহিরের সাথে। তিনি জোরালোভাবে বলছেন, ইমরান খানই হতে যাচ্ছেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তিনি অবশ্য স্বীকার করলেন, পাঞ্জাব হলো শরিফদের ঘাঁটি। এখানে তাদের হারানো কঠিন। তবে এখান থেকে ইমরান যদি ৫০ ভাগ আসনও পান, তবে তাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। অন্য কোনো প্রদেশে শরিফরা ভোট পাবেন না। শরিফদের দুর্নীতির কথা তিনিও জোরেশোরে জানালেন। তার মতে, এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেন কেবল ইমরান খান। তিনি জানান, তাদের মতো লোকজন বিদেশে গিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠান, সেই অর্থ নওয়াজদের মতো লোকজন বিদেশে পাচার করে দেন।

হ্যাঁ, কেবল পাকিস্তানে নয়, বর্তমান বিশ্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াটা এখন বেশ বড় ধরনের থিমে পরিণত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে কথা বলে মাঠ কাঁপিয়ে তোলা যায়, ক্ষমতার সাথে জড়িত যে কাউকে যেকোনো ধরনের মামলায় আটকে ফেলাও সম্ভব যদি কলকাঠি ঠিকমতো নাড়া যায়। নওয়াজ ওই ফাঁদেই ধরা পড়েছেন।
তবে অনেকেই মনে করেন, নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তবে শরিফদের অতটা ভয় পাওয়ার কারণ নেই। নওয়াজ শরিফ, তার মেয়ে মরিয়ম পাকিস্তানে বিশেষ করে পাঞ্জাবে তুমুল জনপ্রিয়। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের আসনসংখ্যা ৩৪২। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন হয় ১৭২টি। এক পাঞ্জাবেই আছে ১৭৪টি আসন। বাকিগুলোর মধ্যে সিন্ধুতে ৭৫, খাইবার পাকতুন খাওয়ায় ৪৮টি, বেলুচিস্তানে ২০টি, ফাটায় ১২টি, কেন্দ্রীয় রাজধানীতে তিনটি।

শরিফের দল যদি পাঞ্জাবে তার অবস্থান ধরে রাখতে পারে তবে অন্যান্য প্রদেশ থেকে সামান্য কিছু সমর্থন নিয়ে তারা শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। যে শক্তিটি তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে, তারা তাদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হবে।

লাহোরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফয়সালও এই বক্তব্য সমর্থন করলেন। তার মতে, সহানুভূতির ভোট শরিফদের পক্ষেই যাবে। নওয়াজ শরিফের স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ, তিনি একটি প্রভাবশালী মহলের শিকার হয়ে অপদস্থ হচ্ছেন। এটিই পরিণামে তাকে ফিরিয়ে আনব। আর পক্ষত্যাগ পাকিস্তানের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। সবসময়ই হয়। তবে পক্ষত্যাগীরা ব্যতিক্রম ছাড়া ভালো করতে পারেন না। আবার যে দলে তারা যোগ দেন, তাতেও নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

ইসলামাবাদে সামা টিভির ব্যুরো চিফ খালিদ আজিম চৌধুরীও মনে করেন, নওয়াজ শরিফের দল আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে। অন্যরা যতই লাফালাফি করুক, শেষ পর্যন্ত পারবে না। অবশ্য চূড়ান্ত রায়ের জন্য ২৫ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যে অনেক হিসাবই পাল্টে যেতে পারে।


আরো সংবাদ