১৪ ডিসেম্বর ২০১৮

জেট এয়ারওয়েজের অপারগতা না উপেক্ষা?

জেট এয়ারওয়েজের অপারগতা না উপেক্ষা? - ছবি : সংগৃহীত

হারাম শরিফে এতেকাফের প্রত্যাশা দীর্ঘ দিনের। অবশেষে মহান রাব্বুল আলামিন সুযোগ করে দিলেন। গত ১৪ রমজান ভারতীয় 'Jet Airways'-এ ঢাকা থেকে জেদ্দার উদ্দেশে যাত্রা। বেলা সাড়ে ৩টায় মুম্বাই বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি। বিমান থেকে নির্দিষ্ট টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হলো যাত্রীদের। সুদীর্ঘ টার্মিনাল ভবনের এক প্রাপ্ত থেকে অপর প্রান্ত অনেকটা মার্চ করার মতোই যেতে হলো। মাঝখানে দেহতল্লাশি থেকে শুরু করে ব্যাগ-ব্যাগেজ, জুতো, মোজা কিছুই তল্লাশি থেকে বাদ গেল না। কয়েকজন যাত্রীকে বিশেষ তল্লাশির নিমিত্তে বিশেষ কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলেও কিছুই পাওয়া গেল না। সার্বিক আচরণ নিরাপত্তার নামে বাড়াবাড়িই মনে হলো। কোনো বিমানবন্দরে এতটা হয়রানি ও বিব্রতকর অভিজ্ঞতা এই প্রথম। টার্মিনালে হিন্দু কৃষ্টি ও বিশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট নানা দিক ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টা যাত্রী-দর্শকদের নজরে পড়ার মতো। এক স্থানে নানা দেব-দেবীর অতিপ্রাকৃতিক মূর্তি সারিবদ্ধভাবে সাজানো দেখতে পেলাম। তবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ জাতিগোষ্ঠীর চেতনা ও বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে এমন কোনো চিত্র বা শিল্পকর্ম নজরে পড়ল না। ভাবলাম, আমাদের কোনো বিমানবন্দরে মুসলিম কালচার ও ঐতিহ্যের ধারক চিত্রকর্ম দ্বারা সজ্জিত করা হলে ধর্মনিরপেক্ষতার ইজ্জত হানিসহ সাম্প্রদায়িক মানসিকতার অভিযোগ তুলে কী তুলকালাম কাণ্ডই না ঘটানো হতো।

কঠিন নিরাপত্তা তল্লাশির পর আমাদের নির্ধারিত ওয়েটিং রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে ছোট পরিসরে হলেও নামাজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আসর নামাজ শেষে যাত্রীরা ‘এহরাম’ বেঁধে জেদ্দার উদ্দেশে পরবর্তী যাত্রার অপেক্ষায়। যাত্রীদের সবাই বোধকরি রোজাদার। সুতরাং ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসতেই সবার মধ্যে চাঞ্চল্যের ভাব লক্ষ করা গেল। সূর্যাস্তের তখনো ৩০-৪০ মিনিট বাকি। ‘Jet Airways’-এর পক্ষ থেকে একজন মহিলা এসে যাত্রীদের ইফতারির জন্য বিচলিত না হয়ে অপেক্ষা করতে বললেন। সময়মতো হাতে হাতে ইফতারি ও পানি পৌঁছে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি চলে গেলেন। সময়মতো দূরের কথা, সূর্যাস্তের পরও ইফতার আসছে না। সময়ের হিসাবে ভুল হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে আজানের শব্দ শোনার জন্য কান পেতে থেকেও কোনো শব্দ তো দূরের কথা, যত দূর নজর যায় ডানে-বামে সামনে কোনো মসজিদের মিনারও নজরে এলো না। ক্ষণিকের জন্য হলেও আমরা বেমালুম হয়ে গিয়েছিলাম যে, এটা বাংলাদেশ নয়; যদিও মুম্বাই শহরের বিপুল বাসিন্দাই মুসলিম। তবু আজানের শব্দ নেই, মসজিদের সুউচ্চ মিনার নেই, বিষয়টি ’৪৭-এ ভারত বিভাগের যৌক্তিকতাই নিরূপণ করল যেন।

আজান শোনা যাক বা না যাক, ইফতার তো করতে হবে। টার্মিনাল ভবনে খাবার দোকানের অভাব নেই। কিন্তু কেউ ভারতীয় ‘রুপি’ ছাড়া সৌদি রিয়াল বা বাংলাদেশী টাকা নিতে নারাজ। তীর্থ যাত্রীদের একজনের কাছে কয়েকটি ভারতীয় রুপি পাওয়া গেল। তা দিয়ে এক প্যাকেট চানাচুর ও এক বোতল পানি কিনে যাত্রীরা জীবনের স্মরণীয় ইফতারটি সেরে নিলেন কোনোমতে। এই গরমের দিনে ১৬-১৭ ঘণ্টা অভুক্ত থাকার পর এটা ক্ষুধা ও পিপাসার কাতরতা আরো বাড়িয়ে দিলো। ভারতীয়দের ‘আতিথেয়তা’ সম্পর্কে দেশে নানা মুখরোচক গল্প শুনে থাকলেও ভারতের মাটিতে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অভাব ছিল অনেকেরই। মক্কা শরিফ পৌঁছার পর ‘ঔবঃ অরৎধিুং’-এর এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা অনেকের মুখেই শোনা গেছে।

যা হোক, এবার আকাশে ওড়ার প্রতীক্ষা। রাত আনুমানিক ৮টায় বিমানে ওঠার ডাক পড়ল, যদিও ৭টা ২৫ এ ছাড়ার কথা। ইফতার বলি বা ডিনার, রাত ৯টার দিকে ১৮ ঘণ্টা ধরে অভুক্ত রোজাদার যাত্রীদের যে খাবার পরিবেশন করা হলো তাতে দু’জনের খাবার একটা ব্রয়লার মুরগির জন্য যথেষ্ট বলা যেতে পারে। সাথে ২০০ মিলিলিটার এক বোতল পানি। চা-কফি পানের জন্য দেয়া কাপগুলো খুব যত্নসহকারে তুলে নিতে দেখা গেল। এগুলো ‘ওয়ান টাইম’ ব্যবহারের জন্য হলেও পুনঃপুন ব্যবহার হয় বলে সন্দেহ করা যায়।

‘জেট এয়ার ওয়েজ’ কর্তৃপক্ষের কাছে সঙ্গত জিজ্ঞাসা, ইফতার দিতে যদি অক্ষমই হবেন তাহলে ঘটা করে ঘোষণা দেয়া হলো কেন? কর্তৃপক্ষের ইফতারির সময়জ্ঞান নেই, তা-ও ভাবা যায় কেমন করে? বাণিজ্যিক চেতনাই যদি এমন আচরণের মুখ্য কারণ হয়ে থাকে, তাহলে যে খাবার রাতে দেয়া হলো সেটাই ইফতারের সময় দেয়া হলো না কেন? তাহলে এটা ‘অসাম্প্রদায়িক’ চেতনারই বহিঃপ্রকাশ, যা মিডিয়ার খোরাক জুগিয়ে আসছে নিয়মিত?


আরো সংবাদ