১৪ ডিসেম্বর ২০১৮

বাংলাদেশের প্রতি বার্মার ঐতিহাসিক বৈরিতা

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা - ফাইল ছবি

পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর সীমান্তে ভারতীয় ত্রিপুরা, দক্ষিণ-পূর্বে মিজোরাম এবং দক্ষিণ সীমান্তে বার্মার নিম্নাঞ্চলীয় আরাকানের ভূ-প্রাকৃতিক গঠন অভিন্ন। মিজোরাম ও বার্মার অনেক স্থানের নামের শেষ বর্ণের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু স্থানের নামেও মিল আছে। এটা এ দেশের অন্য কোনো স্থানের নামের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়াও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ও স্বরভঙ্গিতেও রয়েছে সীমান্তের ওইসব অঞ্চলের প্রভাব। নাফ নদীকর্তৃক বিভাজন না হলে চট্টগ্রাম ও আরাকান হতো একই ভূ-ভাগ। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ১৩টি উপজাতির মধ্যে স্বল্পসংখ্যক লুসাইদের পূর্বপুরুষেরা মিজোরামের লুসাই পার্বত্যাঞ্চলের। তদ্রƒপ বেশকিছু ত্রিপুরীয়দের পূর্বপুরুষ হলো ত্রিপুরার। অবশিষ্টদের বেশির ভাগই জাতিগতভাবে বার্মিজদের একই পূর্বপুরুষদের বংশধর। তার বাস্তবতার নিরিখে আজ এরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক।

ঐতিহাসিক তথ্য মতে, ত্রিপুরা ও আরাকান উভয় শক্তিশালী রাজ্যের মধ্যবর্তী চট্টগ্রাম অঞ্চল দখলের চেষ্টায় তাদের মধ্যে লড়াই শুরু হয় আনুমানিক নবম শতাব্দী বা তারও আগে। বাংলার পশ্চিম সীমান্তে এর তৎকালীন রাজধানী ছেড়ে ও পরবর্তী লক্ষণাবতীর দূরবর্তিতায় কিংবা পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুর থেকে সীমান্তের চট্টগ্রামকে কখনো বাংলার রাজ্যভুক্তির কোনো উদ্বেগ ইতিহাসে অনুপস্থিত। সম্ভাব্য কারণ হয়তোবা ছিল, মধ্যবর্তী পূর্ববঙ্গীয় নদী ও সমুদ্র অভিযানের অসাধ্যতা এবং বিদ্যমান রাজ্যগুলোর নৌ-শক্তির অসমতা। কোনো কোনো ইতিহাসে বলা হয়েছে ১২৩৭ ও ১২৯৪ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ববঙ্গ রাজ আরকানের মগদের কর প্রদান করে স্বাধিকার রক্ষা করেছিলেন। মনে হয়, এ পূর্ববঙ্গরাজ বলতে বিক্রমপুরের রাজা লক্ষণসেনের ছেলেদের রাজত্বকে বুঝানো হয়েছে। উল্লেখ্য, এর কিছু দিন আগেই লক্ষণসেনের মূল রাজধানী লক্ষণাবর্তী দখল করে নেয় মুসলমানেরা, যাদের পূর্ববঙ্গে রাজ্য বিস্তৃতিতে এক শত বছরেরও বেশি সময় লাগে এর ভূ-প্রাকৃতিক কারণে। সোনারগাঁওয়ে তাদের রাজধানী স্থাপনের পরেই চট্টগ্রামকে নিয়ে শুরু হয় ত্রিমুখী লড়াই।

১৫৩১ খ্রিষ্টাব্দে এ অঞ্চলে প্রথম আসে ইউরোপীয় জাহাজ। এবার পর্তুগিজ জলদস্যুরা চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন শুরু করে। তাদের সহযোগতিায় আরাকানি নৌশক্তি বাড়লে পূর্ববঙ্গে ইতঃপূর্বে দু-তিন শ’ বছর চালানো তাদের জুলুম-নির্যাতন এক নতুন মাত্রায় ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসে পরিণত হয়। সমুদ্র উপকূলসহ সুবিধামতো বিভিন্ন স্থানে তাদের লুটপাট ছাড়াও অপহরণ করা শতশত নর-নারীকে আরাকানে নিয়ে দাসরূপে বিক্রয় করা হতো। ওলন্দাজরা তাদের ক্রয় করে নিত। (তথ্য Micropaedia, V-VII, Page-76)

সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে আরাকান রাজ্য ঢাকা থেকে বার্মার পেগু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ সময় আরাকান রাজ সভায় কবি ছিলেন বাংলার প্রথম মুসলিম কবি দৌলত কাজী, যার বাড়ি ছিল চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার সুলতানপুর। এরপরে সেখানে সভাকবি হন সৈয়দ আলাওল, যার জন্ম ফরিদপুর জেলার জালালপুর গ্রামে। ১৬৫২ খ্রিষ্টাব্দে সুন্দসুধর্ম (চন্দ্রসুধর্ম্ম) আরাকানের সিংহাসনে আরোহণের পর তার রাজত্বকালেই শাহ সুজা বাংলাদেশ হতে পালিয়ে আরাকানে আশ্রয় নেন। পরে ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান নৌশক্তিকে সমূলে ধ্বংস করে প্রায় ২০৫ বছরের মগ শাসনের অবসান ঘটিয়ে সুবেদার শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম দখল করে নাম রাখেন ‘ইসলামাবাদ’।

কক্সবাজার, রামু, চশরিয়া, টেকনাফ প্রভৃতি স্থানে আগে থেকেই মগজাতির বসতি ছিল। সে কারণে মুঘল আমলে তাদের ওপর মাথাপিছু ‘মগ জমা’ নামে বার্ষিক কর আরোপ করা হয়েছিল। এর পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩৫৮ টাকা। ১৭৬০ সালে মীর কাশিমের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রাম, মোদিনীপুর ও বর্ধমানের রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে। ব্রাহ্মরাজ আলংফায়ার ছেলে বোদোপায়া ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে আক্রমণ করে আরাকান এবং পরে আসাম দখল করেন। এই সময় বর্মী সেনারা আরাকানিদের গ্রেফতার করে নারী ও পুরুষ ভাগ করে স্ত্রী লোকদের বার্মা পাঠায় এবং পুরুষদের হত্যা করে। এই দমন নীতির ফলে হাজার হাজার আরাকানি উদ্বাস্তুদের যে স্থানে পুনর্বাসিত করেন তার নামানুসারে সেই স্থানের নাম হয় ‘কক্সবাজার’।

১৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তখনো বর্মী সেনাদের অত্যাচারে নাফ নদী তীরবর্তী রাস্তায় স্তূপাকার জরাজীর্ণ বৃদ্ধ মা ও শিশুর মৃতদেহ দেখা যায়। ওই সময় হতে ১৮০০ সালের মধ্যে চট্টগ্রামে আগত উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে বোদাপায়ার নামকরণে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও মুর্শিদাবাদ ছেড়ে দিতে বার্মা পত্র দেয়। পরে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ঢাকার অর্ধেক অংশ দাবি করা হয়। বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনে ইংরেজ ক্যাপ্টেন ক্যানিং অবগত হন যে, বেনারস থেকে সেখানে আনা ২০ জন ব্রাহ্মণ তাদের সংস্কৃতি গ্রন্থের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের কতিপয় অঞ্চল আরাকানিদের বলে উল্লেখ করার পর পরই বর্মি রাজা ঢাকা, লক্ষ্মীপুর, হাতিয়া ও সন্দ্বীপ দাবি করেন। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে বার্মা শাহপুরী দ্বীপ দখলসহ সীমান্তে তাদের আগ্রাসী তৎপরতায় ১৮২৪ সালে বার্মার বিরুদ্ধে ব্রিটিশরা যুদ্ধ ঘোষণা করে। পরাজিত বার্মা ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইয়ানদাবুতে করা চুক্তি মতে- ব্রিটিশরা আসাম, মণিপুর, আরাকান ও বার্মার সর্বনিম্নাঞ্চলে টেনসিরিমের দখল পান। পরবর্তী কালে আরো দু’টি যুদ্ধে বার্মা ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়।


আরো সংবাদ