২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভয়ের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের স্ববিরোধিতা

ভয়ের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের স্ববিরোধিতা - ছবি : নয়া দিগন্ত

‘ইউএনও অফিসে যাচ্ছি। কাজ সেরে ইনশাআল্লাহ ফিরে আসব’। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠের উত্তর শোনা যায়; কিন্তু মানুষটি আর ফিরে আসেনি! ফোনের ওপার থেকে শোনা যায় গুলির আওয়াজ (বিবিসি, প্রথম আলো, ২ জুন ২০১৮)। একরাম নিহত হলেন ‘বন্দুকযুদ্ধে’। বিধবা হয়েছেন আয়েশা। এতিম হতে হলো তাহিয়াত-নাহিয়ানকে। হোক যুবলীগের বা যুবদলের সভাপতি, হোক মাদকসেবী বা ব্যবসায়ী, তাকে বিনা বিচারে বন্দুকের গুলিতে প্রাণ দিতে হবে, এটি আধুনিক সভ্য দেশে কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে নাগরিক বা বিদেশী হলেও অপরাধের উপযুক্ত বিচারের জন্য তার আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দেশীয় বা আন্তর্জাতিক, উভয় আইন দ্বারাই সিদ্ধ। রাষ্ট্রের নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের প্রধান ‘চুক্তি’ই হলো- রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করবে। তা না হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের উদ্দেশ্য ক্ষুণœ হয়ে যায়।

মাদকবিরোধী অভিযান একটি মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু এর পদ্ধতি, আইনগত ভিত্তি ও কঠোরতা নিয়ে নাগরিকসমাজে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত চালু হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর রিপোর্ট (জুন, ২০১৮) অনুযায়ী, এ বছরের গত পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) দেশে ২২২টি বিচারবহির্র্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ (ক্রসফায়ার) মারা গেছে ২১৬ জন। র‌্যাব আর পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে গত ২৩ দিনে (৮ জুন পর্যন্ত) ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৩৯ জন ‘মাদক ব্যবসায়ী’ নিহত হয়েছে; গ্রেফতার এক হাজার ৩০০-এর বেশি। ২০১৬ সালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায় ১৫৬ জন ও ২০১৭ সালে ১৭৮ জন (৬ জুন ২০১৮, ডেইলি স্টার)। এ সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারেই প্রতি বছর বাড়ছে। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত তৎকালীন সরকারও সন্ত্রাস দমন ও অস্ত্র উদ্ধারের জন্য একই ধরনের ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ পরিচালনা করেছিল। ওই সময় ৫৭ জন মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাস্টডিতে প্রাণ হারায় (৬ জুন ২০১৮, ডেইলি স্টার)।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশে যে ‘খুনের বা গুলির সংস্কৃতি’ শুরু হয়েছে, তা অনেক যুদ্ধের বিভীষিকাকেও হার মানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ভাষ্যমতে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এমন অভিযান চলেছে। মাদকবিরোধী অভিযান সুপরিকল্পিত হলে এর প্রথম ধাপে মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে কার্যকর আইন তৈরি করে যারা এ অপরাধে জড়িত তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা যেত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের সাধারণ ক্ষমা করতে পারলে মাদক ব্যবসায়ীরা কেন সাধারণ ক্ষমার আওতায় আসবে না? তাদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করা যেত। সরকার যদি দ্রুত এর বিচার সম্পন্ন করতে চায়, সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্র যখন নিজেই আইন ভঙ্গ করে মানুষের জীবন ধারণের অধিকার কেড়ে নেয়, তখন সেটি ব্যর্থরাষ্ট্র হওয়ার পথ সুগম করে। সে অবস্থায় সরকারের আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন সরকার পড়ে যায় বৈধতার সঙ্কটে।

চলতি অভিযানে বর্তমান সরকারসংশ্লিষ্ট মাদক গডফাদাররা পেয়েছে বিশেষ ছাড়, এটাই সাধারণ মানুষের ধারণা। কেউ কেউ সরকারের অনুমোদন নিয়ে চলে গেছেন বিদেশ ভ্রমণে। কিন্তু গুলি খেয়ে মরছে মধ্যম সারির ও প্রান্তিক পর্যায়ে জড়িতরা। যারা দেশের মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় দিনাতিপাত করে মহাসুখে, তাদের কেন বিচার হয় না? ২০০ টাকার জন্য আকরামদের কেন মরতে হয়? বেসিক ব্যাংকের চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা আর জনতা ব্যাংকের পাঁচ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা লুটকারীদের কেন শাস্তি হয় না? এই বড় বড় আসামি যখন বাঁচার অধিকার পায়, ছোট অপরাধীরা কেন আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারটুকু পাবে না?

মাদক বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিরও কিছু স্ববিরোধিতা লক্ষ করা যায়। যুবকেরা সব নেশার প্রথম ধাপে শুরু করে ধূমপান, যা মানুষের শরীরে বড় বড় রোগ সৃষ্টি করে এবং পরিবেশ দূষণ ঘটায়। সেই বিড়ি-সিগারেট কোম্পানিগুলোকে শুধু ট্যাক্স-রেভিনিউ পাওয়ার আশায় ছাড় দিয়ে রেখেছে জনগণের ভয়াবহ ক্ষতি করার জন্য। তদুপরি, এক দিকে মদপান ও ব্যবসায়ের লাইসেন্স দিয়ে রাখা হয়েছে, অন্য দিকে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে- যা রাষ্ট্রীয় দ্বৈতনীতির প্রতিফলন। যে দেশের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়েছে, সে দেশে মদ ও ধূমপান কেমন করে বৈধ হয়, তা কারো বোধে আসবে বলে মনে হয় না। নেশাজাত দ্রব্য ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকেও অগ্রহণযোগ্য। এ যাবৎ সরকারগুলো মদের লাইসেন্স কিভাবে দিয়ে রেখেছে সেটা জনমনে একটা বড় প্রশ্ন।

সমস্যার মূল উৎপাটন না করে শাখা-প্রশাখা ছাঁটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মাদক উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহ বন্ধ করলেই তো এর ব্যবসা ও সেবন ৮০ শতাংশ কমে যায়। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক তৎপরতারও প্রয়োজন ছিল। কারণ আমাদের যুবকদের টার্গেট করে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে ফেনসিডিল ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য উৎপাদন ও সরবরাহ করে আসছে, যা সংবাদমাধ্যমে আমরা বহু দিন ধরে দেখে আসছি। এ ছাড়া অন্যায়, দুর্নীতি ও অনিয়মগুলো যে মিডিয়া সরকারের নজরে আনবে তার উপায়ও সীমিত। সবাই আজ রাজনৈতিক বিভাজনে বিভক্ত। সরকারবিরোধী কিছু লিখলেই ভয়ে থাকতে হয় সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের- কে কখন গুম বা গ্রেফতার হয়ে যান! মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর রিপোর্ট (জুন, ২০১৮) অনুযায়ী এ বছরে গত পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) ২৫ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন, সাতজন লাঞ্ছিত, সাতজনকে হুমকি দেয়া হয়েছে এবং ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মন্তব্য করায়।

দেশের মানুষ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কার্যক্রম বা সরকারের কাজের সমালোচনা রাজপথেও করতে পারছে না, করলে বাধা ও নির্যাতন; সংবাদমাধ্যমে সমালোচনা করলে বিপদ; সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে করলে গ্রেফতার। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ দেশের এ পরিস্থিতিকে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাস বলে, কোনো সমস্যার সমাধান আইনি প্রক্রিয়ায় শুরু হলে তা একই প্রক্রিয়ায় শেষ হয়; রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শুরু হলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শেষ করা যায়, আর গুলির মাধ্যমে শুরু হলে তা গুলি দিয়েই শেষ করতে হয়। যে দেশে মসির চেয়ে অসি বেশি শক্তিশালী, যে দেশে যুক্তির আলোকে নিভিয়ে দেয়া হয় শক্তির জোরে- সে দেশে রাজনৈতিক বা সামাজিক মুক্তি আসার পথ অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। তাই আমাদের প্রিয় জন্মভূমির সামনের দিনগুলো নিয়ে কোনোভাবেই স্বস্তি আসছে না চিন্তাশীলদের মনে। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার গুলির বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ অনেক আশা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল। সেই দেশে বন্দুকের গুলিতে এত মানুষের মৃত্যু- নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশের চিত্র হতে পারে না।
লেখক : পিএইচডি গবেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

shoheldu412@gmail.com, www.thoughtreviver.com


আরো সংবাদ