২৩ জুলাই ২০১৮

বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তাকেই প্রতিপক্ষের ভয়

বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তাকেই প্রতিপক্ষের ভয় - ছবি : সংগৃহীত

শেখ মুজিবকে স্বাধীন দেশের স্থপতি হিসেবে মনে রাখবে, তেমনি খালেদা জিয়াকেও গণতন্ত্রের অবিসংবাদিত নেত্রী হিসেবেই মনে রাখবে। শাসনের নামে দুঃশাসন, গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র, উন্নয়নের নামে লুটপাট- এ দেশের মানুষেরা স্বপ্ন দেখছি সংগ্রামের নেত্রী, আপসহীন বেগম খালেদা জিয়া সব চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে জনমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই ময়দানে আবির্ভূত হবেন

কথায় আছে, যেখানে সুর থাকে না, সেখানে অসুর প্রাধান্য পায়। আর অসুরের প্রতাপ বাড়লে সমাজের কী হাল হয়, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্ষেতে গাছ না জন্মাতে দিলে আগাছায় যেমন ক্ষেত ছেয়ে যায়, তেমনি সমাজে যদি সুনিয়ম প্রচলিত না থাকে সেখানে আপনা থেকে অরাজকতার সৃষ্টি হয় এবং সমাজের মানুষ কষ্ট পায়।
একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী কাঠামো হলো গণতন্ত্র। যদি গণতন্ত্র না থাকে, সে স্থান দখল করে স্বৈরতন্ত্র। তখন যুক্তির নিরিখে নয়, প্রচলিত নিয়ম-কানুন, মর্যাদা-মূল্যবোধের ভিত্তিতে নয়, রাষ্ট্র চলে তখন গায়ের জোরে এবং বন্দুকের নলের দাপটে। হিটলার-মুসোলিনির মতো একটি রাষ্ট্রে এক ব্যক্তির কথাই তখন আইন হয়ে যায়। দেশে তখন সাধারণ-অসাধারণ, গুণী-জ্ঞানী, ভালো-মন্দ কারো মতামতের গুরুত্ব থাকে না। স্বাধীন মত প্রকাশের পথও রুদ্ধ হয়ে যায়।

দেশে গণতান্ত্রিকব্যবস্থা প্রচলিত থাকলেই লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী এবং বিজ্ঞানী নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। সরকারের সবল বা দুর্বল দিক, অভ্যন্তরীণ নীতি, পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও রাজনীতিকেরা যৌক্তিক আলোচনা উপস্থাপন করার সুযোগ পান।

স্বৈরাচার সবসময় সবার আগে টিকে থাকতে চায়। এ জন্য সে সরকার সমালোচনা যেমন সহ্য করে না, তেমনি স্বাধীনভাবে কাজ করারও সুযোগ দেয় না কাউকে। সব সমালোচনাকারীর মুখ বন্ধ করে রাখতে চায়। সাধারণদের মুখ বন্ধ করে পেশিশক্তির প্রাধান্য বাড়িয়ে দেয়, যাতে কেউ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে না পারে। নিতে গেলেই পেটোয়া বাহিনী কণ্ঠ চেপে ধরে।

স্বৈরশাসকেরা সবসময় নিজেদের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে। অন্যের মতামত তারা সহ্যই করতে পারে না। বর্তমান বাংলাদেশে সরকার যেন প্রতিপক্ষ বলতে কারো অস্তিত্ব সহ্য করতে পারে না। তাহলে তাদের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক আচরণ, সৌজন্য-শিষ্টাচার এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার কিভাবে আশা করা সম্ভব?

রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য এক মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টি করে। কয়েক লাখ মুসলিমকে মিয়ানমার সরকার বের করে দেয়। সীমান্তের নাসাকা বাহিনী ও বৌদ্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আক্রমণ-নির্যাতন এত ভয়াবহ ছিল যে, লাখ লাখ রোহিঙ্গা কেবল প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে প্রাণ হাতে নিয়ে কোনোমতে ভিটেমাটি ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সরকার বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিল, এত বড় জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কী করা যায়! কোথায় আশ্রয় দেয়া যায়। তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থাও করতে হবে। সে সময় বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রস্তাব করেছিল সব দলের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠনের, যাতে শুধু সরকারিভাবে নয়, রাষ্ট্রের সব নাগরিকদের নিয়ে যাতে এত বড় সঙ্কটের মোকাবেলা করা যায়। কিন্তু সরকার এতে একেবারেই কর্ণপাত করেনি। বরং ক্ষমতাসীন দলের কর্তাব্যক্তিরা নানাভাবে একে নিয়ে উপহাস করেছেন। এতেই বোঝা যায়- বর্তমান সরকার জনমতকে উপেক্ষা করে।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জেল খাটছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে সাজা দেয়া হয়েছে। অথচ কুয়েত সরকারের দেয়া টাকা যেভাবে ব্যাংকে জমা ছিল, সেভাবেই সে টাকা বহাল আছে। বরঞ্চ সেটা সুদে-আসলে সাত কোটি ছাড়িয়ে গেছে। শেখ মুজিবও বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। বিশেষ করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার তিনি যেমন ছিলেন ১ নম্বর আসামি তেমনি ২৫ মার্চ রাতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্যও তাকে গ্রেফতার করা হয়। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মনে করেছিলেন, তাকে গ্রেফতার করলেই পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে এবং এ দেশের মানুষও স্বাধীনতার দাবি পরিহার করবে। বাস্তবে আমরা দেখলাম পাক-আর্মি ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নিরীহ ও ঘুমন্ত বাঙালির ওপর এক পৈশাচিক আক্রমণ চালায় এবং মুজিবকে বন্দী করে পাকিস্তান কারাগারে নিয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ চুপ মেরে বসে থাকেনি। কোন চাপের কাছেই মুজিব মাথা নত করেননি। নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও হয়তো ভেবেছেন, আমি হয়তো মারা যাব, কিন্তু আমার মৃত্যুর মধ্য দিয়েও যদি বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্ম হয়, তবে আমার জীবন সার্থক। একজন গ্রেট লিডার হিসেবে শেখ মুজিবের আত্মত্যাগ, একে ছোট করে দেখার সুযোগ কোথায়?

আজ বেগম খালেদা জিয়া জেল খাটছেন। তাকে জেলে নেয়ার আগেও কি তাকে ভয় দেখানো হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছে। তার সাথে আপস করার জন্য কি সরকারের তরফ থেকে কম চেষ্টা চলেছে? দেশবাসী মনে করে, যদি খালেদা আপস ফর্মুলায় রাজি হতেন, তবে অনেক আগেই তিনি বের হয়ে যেতে পারতেন অথবা তার হয়তো জেলে যাওয়ারই প্রয়োজন হতো না। সম্পূর্ণ জামিনযোগ্য মামলায় ক্ষমতার জোরে তাকে জেল খাটানোর অর্থই হচ্ছেÑ তিনি কোনো ধরনের আপসে রাজি হচ্ছেন না, কিংবা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করছেন না।

খালেদা জিয়া দেশের মাটি-মানুষের নেত্রী এবং গণতন্ত্রের প্রতীক। একদিন যেমন শেখ মুজিবকে ছাত্রনেতারা তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়েছিলেন, তেমনি সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়াকেও তার দলের লোকরা ‘গণতন্ত্রের মা’ উপাধি দিয়েছেন। দেশের সব মানুষ জানে, এমনকি রাজনৈতিক দুশমনেরাও স্বীকার করে, বেগম খালেদা জিয়া কখনো ভণিতা পছন্দ করেন না। কান্না না এলেও কান্নার ভান করতে হবে, হাসি না এলেও হাসতে হবে-এটা তিনি কখনোই করেন না। তিনি কথা দেবেন, কথা রাখবেন না, তা হতে পারে না। তার ইচ্ছা বা সম্মতিতে দেশ বা গণতন্ত্রের গায়ে আঁচড় লাগবে সেটাও তিনি হতে দেবেন না। এ সত্যগুলো জনগণ জানে বলেই তার কথাকে সত্য বলে জ্ঞান করে। তিনি যেখানে যান, সেখানে ব্যাপক লোকের সমাবেশ ঘটে। তিনি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা। দেশের লোকেরা মনে করে, গণতন্ত্র উদ্ধারের তার ভূমিকা সমোজ্জ্বল। তাকে প্রতিপক্ষের ভয়টা এখানেই। সেজন্য আজ তিনি কারাবন্দী। সামর্থ্য একমাত্র খালেদা জিয়ারই আছে।

একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধু ও খালেদা জিয়াকে একই উচ্চতায় পরিমাপ করে বলেছেন- ‘বঙ্গবন্ধু সেদিন যেমন পাক সরকারের ইচ্ছার কাছে দাসখত দেননি বা নানারকম ভয় দেখিয়েও তাকে টলানো যায়নি, একইভাবে খালেদা জিয়াকেও টলাতে পারছে না লীগ সরকার। এ কারণে বঙ্গবন্ধুর মতো খালেদা জিয়া মারা গেলেও তাকে মনে রাখবে দেশের মানুষ। তারা যেমন শেখ মুজিবকে স্বাধীন দেশের স্থপতি হিসেবে মনে রাখবে, তেমনি খালেদা জিয়াকেও গণতন্ত্রের অবিসংবাদিত নেত্রী হিসেবেই মনে রাখবে।’

শাসনের নামে দুঃশাসন, গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র, উন্নয়নের নামে লুটপাট- এ দেশের মানুষেরা স্বপ্ন দেখছি সংগ্রামের নেত্রী, আপসহীন বেগম খালেদা জিয়া সব চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে জনমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই ময়দানে আবির্ভূত হবেন।


আরো সংবাদ