২৫ এপ্রিল ২০১৯

ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে গাজা

ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে গাজা - ছবি : এএফপি

গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিরা ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। ২০০৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরাইল গাজার ওপর অবরোধ আরোপ করে। এক দশক ধরে সর্বাত্মক এই অবরোধে গাজার অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এর সাথে আবার যোগ হয়েছে মিসরের অবরোধ। মিসরও ইসরাইলের সাথে যোগ দিয়ে গাজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সরবরাহে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আর্থিক সহায়তা কমানোর ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরো অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে গাজার ফিলিস্তিনিরা এখন কঠিন দিন পার করছেন। তাদের আয় কমে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য যা সামান্য ছিল সেটাও বন্ধের পথে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গাজার ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনির আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে তারল্য সঙ্কটের। আর এটা প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতির সব খাতের ওপরই। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে গাজার আর্থিক সঙ্কটের পেছনে প্রধানত দু’টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর একটি হচ্ছে- ইসরাইলি ও মিসরীয় অবরোধ এবং অন্যটি হচ্ছেÑ গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী হামাস ও পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণকারী ফাতাহ সংগঠনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। হামাস ২০০৭ সালে গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার এই দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং ওই বছর থেকেই গাজার ওপর অবরোধ আরোপ করে ইসরাইল।

চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের বেকারত্বের হার বেড়েই চলেছে। বর্তমানে এই হার দাঁড়িয়েছে ৪৪ শতাংশে। জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত ২০ বছরে গাজা উপত্যকায় কোনো শিল্প কারখানা গড়ে ওঠেনি এবং এই ভূখণ্ডের অর্থনীতি বাইরের সহায়তার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ১৯৯৪ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠনের পর থেকে গাজার মাথাপিছু আয় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এর ফলে এই ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রার মানের চরম অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, গাজার ফিলিস্তিনিরা যেকোনো সময় তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসতে পারে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও গাজার হামাস নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে গাজার সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও ঠিকমতো দেয়া হচ্ছে না। আগে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বেতন দিলেও হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকে তা প্রায় বন্ধ করে দেয়। অন্য দিকে, হামাসও কর্মচারীদের বেতন দিচ্ছে না। এতে হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন। হামাস দাবি করছে যে, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার অংশ হিসেবে গাজায় তাদের হাজার হাজার কর্মীকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কর্মচারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু মাহমুদ আব্বাস বলছেন যে, তার আগে হামাসকে গাজার নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে হবে।

কিন্তু হামাস তাতে সম্মত হয়নি। ফলে অচলাবস্থাও কাটেনি। বিশ্বব্যাংক অবশ্য গাজা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য সেখানে একটি কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সরকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু হামাস নেতারা তাতে গুরুত্ব না দেয়ায় ইসরাইল মিসর ও ভূমধ্যসাগরের বেষ্টনীর মধ্যে থাকা এই ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির আশা তেমন নেই বললেই চলে।
গাজার অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো চাপের মধ্যে ফেলতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন খড়গ দিয়েছেন। গাজার ফিলিস্তিনিদের সহায়তার জন্য বিশ্বের উন্নত ও ধনী দেশগুলো আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে প্রতিবছর। জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ ও পূর্ত সংস্থার (আনরুয়া) মাধ্যমে এই সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে। এই অর্থ সংস্থাটি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র এত দিন আনরুয়াকে বছরে দিত ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি এই সহায়তার মধ্যে ৩০ কোটি ৫০ লাখ ডলারই কমিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে বড় ধরনের আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে আনরুয়া। এই চাপ কাটিয়ে ওঠার জন্য সংস্থাটি মধ্যপ্রাচ্যের ধনী আরব দেশগুলোর কাছে হাত পাতছে। কিন্তু এসব দেশ কতটুকু এগিয়ে আসবে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। আনরুয়ার মুখপাত্র ক্রিস গানেস বলেন, আমরা, ধনী আরব দেশগুলোর কাছে গাজার জন্য ২০ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছি। নতুন শিক্ষা বছর শুরুর জন্য আগস্ট মাসে যখন স্কুলগুলো খুলবে তখন এই অর্থ প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া গাজার লাখ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুকে আমরা খাদ্য সহায়তাও দিয়ে থাকি। সে জন্যও অর্থের প্রয়োজন। তবে ইসরাইলি ও মার্কিন অনেক কর্মকর্তা গাজার নতুন প্রজন্মের লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে উদ্বাস্তু মনে করেন না। কারণ ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময়ে যে সাত লাখ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলেন তাদের অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। তাদের বর্তমান বংশধরেরা কোনোভাবেই উদ্বাস্তুর মর্যাদা পেতে পারেন না বলে ইসরাইলি ও মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন।

চলমান আর্থিক সঙ্কটের কারণে গাজার ব্যবসা-বাণিজ্যও প্রায় বন্ধের পথে। যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালু রাখার চেষ্টা করছিলেন তারাও এখন ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। ঋণ দানকারীদের অভিযোগের কারণে এসব ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে গাজার পুলিশ। গত এক বছরে এ ধরনের প্রায় ৪২ হাজার ৫০০ লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করার জন্য এসব কারাবন্দীকে সপ্তাহে দুই দিন করে মুক্তি দেয়া হয়ে থাকে। গাজার চেম্বার অব কমার্সের কর্মকর্তা মাহের তাবা বলেন, এই ভূখণ্ডের ব্যবসা-বাণিজ্য আসলে মরে গেছে। কারণ, লোকজনের ক্রয়ক্ষমতা নেই, দোকানে দোকানে মালামাল যাও আছে, ক্রেতা নেই। আর গত সাত মাসে আমদানিও অর্ধেকে নেমে এসেছে। তিনি জানান, আর্থিক সঙ্কটের কারণে ২০১৬ সালে ছয় কোটি ২০ ডলার সমপরিমাণ অর্থের চেক বাউন্স হয়েছিল, ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ২০ লাখ ডলারে। গাজার অর্থনীতি যে ভেঙে পড়েছে এটা তারই প্রমাণ।
শুধু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রই নয়, মাহমুদ আব্বাসের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও গাজার অর্থনীতিকে দুর্বল করার জন্য চেষ্টা করছে। হামাসের কর্তৃত্বকে খর্ব করার জন্যই আব্বাস এ চেষ্টা করছেন। বাইরের ও ভেতরের দ্বিমুখী চাপে গাজার ফিলিস্তিনিরা চিঁড়েচ্যাপ্টা হচ্ছেন। গাজার এই বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত ইসরাইলি জেনারেলরাও। সম্প্রতি তারা ইসরাইল সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, গাজার মানবিক পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকলে আবারো যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। আর আর্থিক সহায়তা কমে যেতে থাকলে আনরুয়াও অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে তারা মনে করেন। আর এর ফলে গাজার পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। আর এর পরিণতি হবে- ফিলিস্তিনিদের সাথে আরো একটি যুদ্ধ।


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al
hd film izle
gebze evden eve nakliyat