২২ জুন ২০১৮

আফগানরা আমাদের ক্রিকেট শেষ করে দিল!

১টি সিরিজ হেরে ক্রিকেটের সব অর্জন ধুলোয় মিশে যায়নি - ছবি : এএফপি

একটি অনলাইন পোর্টালের গত ০৮ জুনের একটি খবরের শিরোনাম ‘লুকিয়ে বিমান বন্দর ছাড়লেন সাকিবরা’ দেখে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজ হেরে মনে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে বিতাড়িত হয়ে গেছে! নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে বাংলাওয়াশ হয়েছে সাকিবদের সাথে তাতে কী ওদের ক্রিকেট পিছিয়ে গেছে? সব কিছুইতেই আমরা একটু বেশি বেশি।

একজন সাকিবদের ফ্যান হিসেবে ৩টি ম্যাচই গভীর আগ্রহের সাথে টিভি সেটের সামনে বসে দেখেছি। সার্বিক খেলা দেখে কখনো মনে হয়নি বাংলাদেশ যোগ্যতর নয়। তবে আফগানদের ফিল্ডিংয়ের ক্ষিপ্রতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আর বোলিংয়ে রশিদ খান, নবী আর মুজিবকে ভালোই মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ। ২য় ম্যাচে রশিদকে নিজেদের উইকেট উপহার দিয়েছেন সাকিব ও তামিম। প্রথম ম্যাচে রশিদ সত্যিই ভালো বল করেছে। আর শেষ ম্যাচে ২৪ রানে ১ উইকেট পেয়েছেন রশিদ। বিশেষ করে শেষ ওভারে ৯ রান ডিফেন্স করে দল জিতিয়েছে। অফ স্পিনার মুজিবকেও ভালো সামলিয়েছে আর মোহাম্মদ নবীকে মারতে গিয়ে উইকেট দিয়েছে মূলত রান রেটের চাপ থেকে বাঁচতে। অন্যদিকে আফগান পেসাররা ওভার প্রতি ১০ রান করে দিয়েছে ।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ যদি ভালো খেলে তাহলে হারলো কেন? আসলে হারার মূল কারণ মানসিকতা ও পরিকল্পনায় ঘাটতি। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষা দেখলেই বোঝা যায় আসলে তারা ফাইট দিতে প্রস্তুত নয়।
প্রশ্ন হলো টিম ম্যানেজমেন্ট কেন উজ্জীবিত করতে পারল না দলকে? ৩ জন কোয়ালিফাইড স্পিনারকে না মেরে ৬ করে ওভার প্রতি রান তোলার পরিকল্পনা নিলে ১২ ওভারে আসত ৭২ রান। আর বাকী ৮ ওভারে ১০ গড়ে রান তুললে ৮০, রান মোট রান দাড়ায় ১৫২। এই লো পিচে ১৫০-১৬০ রান করে আমাদেও বোলিং দিয়ে জেতা সম্ভব। ম্যানেজমেন্টের কাজ হলো জটিল সমস্যার সহজ সমাধান দেয়া। ক্রিকেটারদের মাথায় সুন্দর পরিকল্পনা দিতে পারলে আর এক্সিকিউশনের জন্য উদ্ভুদ্ধ করা হলে তা না হওয়ার তো কথা নয়।

ইদানিং রাজনীতিবিদরাও ক্রিকেটকে ডুবানোর পাঁয়তারা করছেন। সাকিব-তামিমকে দখলে নেয়ার একটা অপ্রয়োজনীয় চেষ্টা চলছে। আমাদের ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়তো খেলা শেষ করে রাজনীতিতে এসেছেন। সাকিবকে কেন এখনি এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে হবে? কেন মাশরাফিকে এমপি পদের লোভ দিতে হবে? ক্রিকেট বোর্ড কি মনে করে তাদের অনেক বিকল্প তৈরি করে ফেলেছেন? যারা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ভালোবাসেন তারা দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন যে, সাকিব, তামিম, রিয়াদ, মুশফিক, মাশরাফির কোন বিকল্প গত ৫ বছরে তৈরি হয়নি। এখন যদি তারা রাজনীতি করে তাহলে যারা তাদের দলে ভিড়াতে চায় তারা কি বাংলাদেশের খেলাটা খেলে দিবেন? খেলোয়াড়রাও তো মানুষ, তারাতো এরকম প্রস্তাবে প্রভাবিত হতে পারেন, যার প্রভাব তাদের মনস্তত্বে ও খেলায় পড়ে। দয়া করে এ রত্নগুলিকে দেয়াল দখলের মত দখলে নিয়েন না। তারা ম্যাচিউরড, খেলোয়ারি জীবন শেষ করে নিশ্চয়ই পারলে জাতির সেবা করবে।

ঘরোয়া টি-২০ উৎসব বিপিএল খুব জমজমাট হয়, কিন্তু সেখানেও জাতীয় স্বার্থে পরিকল্পনার ছাপ মিলে না। এখান থেকে খুব বেশি খেলোয়াড় বের হয়েছে বলার সুয়োগ নেই। একটি দলে ৫ জন বিদেশী খেলোয়াড় খেললে দেশের ছেলেরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। ৩ জন বিদেশি নিয়ে বিপিএল হলে দেশের ক্রিকেটাররা নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পাবে। দেশি খেলোয়ারদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দিতে হবে।
জাতীয় দল নির্বাচনেও নানা সমস্যা, আর বিতর্ক। দল নির্বাচনে বয়স বিবেচনা না করে পারফরমেন্স বিবেচনা করা উচিত। অতি মাত্রায় নতুন খেলোয়াড় খেলানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতে করতে পুঁজিই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সারা বছর ঘরোয়া লীগ পারফর্ম করে যদি দলে যায়গা না পাওয়া যায় তাহলে কেন খেলবে? তুষার ইমরান, নাইম ইসলামরা নিয়মিত রান করছেন কিন্তু জাতীয় দলে আসতে পারছেন না। এটি আসলে সঠিক বিবেচনা নয়। বয়সের চিন্তা বাদ দিয়ে পারফরমেন্স বিবেচনা করলে ক্রিকেটের উপকার হবে। এছাড়া কিছু ভুল বিনিয়োগও ক্রিকেটে হচ্ছে। সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমানরা যদি পারফর্ম না করেও বছরের পর বছর দলে সুযোগ পায় তবে অপ্রতুল লেগ স্পিনার লিখনকেও সুযোগ দেয়া উচিত ছিল।

আসলে যে কারণে এত কথা তা হলো, সেরা খেলা বের করে আনার ক্ষেত্রে টিম ম্যানেজমেন্টের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। আমরা যারা দর্শক, আমরা কেবল মাঠের খেলাটা দেখি; কিন্তু অদেখা খেলাটা হয় পরিকল্পনা ও কৌশল নির্ধারণে। খেলোয়াড়দের মাঠে নামিয়ে দিলেই জিতে আসবে এমন মানসিকতা ঠিক নয়। আফগানিস্তানের সাথে পরাজিত হয়ে দেশের ক্রিকেট শেষ হয়ে যায়নি। খেলোয়াড়দের সমালোচনা না করে কারণ বের করতে হবে। খারাপ সময়ে তাদের পাশে থাকতে হবে, নচেৎ পরের সিরিজ আরো খারাপ হবে। সিরিজের চলাকালীন বিসিবি বসরাও দলের পারফরমেন্স নিয়ে বিক্ষিপ্ত মন্তব্য করেন, কিন্তু বিসিবি যে গত দুই সিরিজে কোন কোচ নিয়োগ দিতে পারেনি সেদিকে খেয়াল নাই।

আন্তর্জাতিক পরিম-লে আজকের বাংলাদেশের যে পরিচিতি তা মূলত গার্মেন্টস শিল্প আর ক্রিকেট দিয়ে। ক্রিকেটকে রাজনীতির বাইরে রেখে পুরো ব্যবস্থাপনাকে দেশব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে নতুনভাবে সাজাতে হবে, তুলে আনতে হবে তৃনমূলের প্রতিভা। তামিমদের ছায়ায় নতুন সাকিব, তামিম আসার আগ পর্যন্ত তাদেরকে রাজনৈতিক দখলে নেয়ার চিন্তা পরিহার করে আরো ভালো খেলার জন্য সহযোগিতা করতে হবে। ক্রিকেট অঙ্গণে অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা আর রাজনীতিকরণ কেবল পিছিয়েই দিবে ক্রিকেটকে। আফগানদের সাথে ১টি সিরিজ হেরে ক্রিকেটের সব অর্জন ধুলোয় মিশে যায়নি। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এদেশের সকল মানুষকে এক সাথে হাসার, আনন্দ করার খুব বেশি উপলক্ষ নেই, কেবল আমাদের সাকিব, তামিমরাই পারে পুরা জাতিকে একসাথে হাসাতে, নাচাতে। সুতরাং খারাপ সময় ভালো সময় সবসময়ে ওদের পাশ থাকতে হবে।


আরো সংবাদ