২২ জুন ২০১৮

অভাব, আত্মসম্মান ও সৌজন্যবোধ

ছবিটি প্রতীকী - ছবি : সংগ্রহ

১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে করাচিতে তিন বছরের কাছাকাছি কাটিয়েছি। সেখানে লব্ধ বহুবিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে অভাবী মানুয়ের কয়েকটি চিত্র তুলে ধরছি। হয়তো এটা ঠিক, এ অভিজ্ঞতাগুলো জেনারালাইজড করা যাবে না, তবে এগুলো আমার হৃদয়ে দাগ কেটেছে। অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই স্বভাব নষ্ট হয় না। মানুষ সৎ থাকতে চাইলে তা পারে; যদি তার আত্মসম্মানবোধ থাকে। আর সৌজন্যবোধ? সেটা হৃদয়ের ব্যাপার। প্রশস্ত হৃদয় লোকেরা তাদের সামর্থের মধ্যেই সেটা দেখাতে পারে অর্থ ব্যয় না করেই। যাদের কথা লিখছি তারা সমাজের অতি সাধারণ লোক।

১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল করাচির পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সে স্টাফ ইকোনমিস্ট হিসেবে কাজে যোগদান করি। নিয়ম-কানুন কিছুই জানি না। ইনস্টিটিউটের নিয়মানুযায়ী, নিকটবর্তী হাবিব ব্যাংকে আমার অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসের বেতনের টাকা জমা হবে। ইনস্টিটিউটের অ্যাকাউন্ট্যান্ট আমাকে সে রকমই বলেছেন। ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে আমার বেতনের টাকা জমা হওয়ার পর বাংক অ্যাডভাইসটি ইনস্টিটিউটের ক্যাশ পিয়ন আমার হাতে এনে দিলো। ছাত্রজীবনে কলেজ পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নিয়মিত ট্যালেন্টপুল স্কলারশিপ পেতাম। প্রথম বেতনের টাকা পেয়ে ভিন্নধর্মী এক আনন্দ পেলাম। যে পিয়ন ব্যাংক অ্যাডভাইসটি নিয়ে এলো তাকে খুশি হয়ে টাকা সাধলাম। সে নিলো না। বলল, ‘নে সাব’। সাধাসাধি করেও তাকে টাকা দিতে পারলাম না। তিন টাকায় তখন করাচির বিখ্যাত কাফে জর্জে পেটপুরে চিকেন-বিরিয়ানি খেয়েও আটআনা বাঁচত। কিন্তু সে নিলো না। পরে জানলামম ওখানে এ রেওয়াজ নেই। পিয়নরা কারো কাছ থেকে বকশিশ নেয় না। কারণ তাদের আত্মসম্মানে বাধে।

দেড় বছর করাচি কাটানোর পর প্রথমবারের মতো ঢাকা আসছি। মনটা আনন্দে ভরে গেল। সকাল ৯টায় আমার ফ্লাইট। বেবিটেক্সি নিয়ে সকাল ৭টার দিকে সদরে অ্যামপ্রেস মার্কেটে রওনা হলাম। ঢাকার বাসার জন্য কিছু ফলমূল কিনব। একটি বড় ঝুড়িতে বেশ কিছু আনার, নাশপাতি, আপেল, আঙ্গুর, বেদানা, কমলা, মনাক্কা ও মুসম্বি নিলাম। দোকানিকে বললাম, এসব প্লেনে ঢাকা যাবে সেভাবেই বেঁধে দেয়া দরকার। ফলের ঝুড়িটি বেশ বড় হলো। এতে খরচ হলো ৫০ টাকা। অটোরিকশাওয়ালা এটি রিকশায় টেনে তুলে আমাকে নিয়ে বাসায় ফিরল। সে রকমই কথা ছিল, আমাকে অ্যামপ্রেস মার্কেটে নিয়ে যাবে এবং বাসায় ফিরিয়ে আনবে। দূরের ফেডারেল এরিয়ার বাসায় পৌঁছে দেখি, হাতে অল্প সময় আছে। এটি রেসিডেন্সিয়াল এলাকা। গাড়ি চলাচল কম। এ রিকশা ছেড়ে দিলে সময়মতো যদি আরেকটি না পাই তাহলে প্লেন মিস করব। অটো-রিকশাওয়ালাকে আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বললাম। গোসল সেরে তাকে নিয়ে এয়ারপোর্ট যাবো। অপেক্ষা বাবদ এয়ারপোর্টে গিয়ে মিটারে যা রিডিং হবে তার চেয়ে তাকে পাঁচটাকা বেশি দেবো। সে বলল, ‘হাম আধ ঘণ্টা মে আপকো এয়ারপোর্ট লে যানে কে লিয়ে চলা আয়গা। আপকো পাঁচ রুপায়া বরবাদ করনে কা কোই জরুরত নেহি’।
গোঁ ধরলাম তাকে অপেক্ষাই করতে হবে। আমি ছাড়ছি না। সে আমার চাপাচাপিতে অপেক্ষা করতে রাজি হলো। আধ ঘণ্টার মধ্যে আমি তৈরি হয়ে এসে রিকশায় উঠতে যাবো, এমন সময় আক্ষেপ করে বললÑ ‘সাব, আপনে খামোখা পাঁচ রুপায়া বরবাদ কিয়া। হাম পাঠান কা বাচ্চা হ্যায়। জান যা সেকতা লেকিন বাত ঝুটা নেই বলতা। আধ ঘণ্টা মে হাম জরুর আপকো এয়ারপোর্ট লেনে আতা। আপনে একিন নেহি কিয়া’।

আমি বললাম, ‘তোমহারা উপর মেরা একিন থা। লেকিন অ্যাক্সিডেন্ট কা বাত তো কোই আগে সে কভি নেহি বোল সেকতা’। এই বলে হাঁটু অবধি লম্বা ছাই রঙয়ের শার্ট ও ঢোলা সালওয়ার পরা বলিষ্ঠ উঁচা-লম্বা স্বাস্থ্যবান জোয়ান পাঠান ছেলেটির বুকে ডান হাতের তালু ঠেকিয়ে রাখলাম। পায়ে তার কাবুলি স্যান্ডেল। সে তার সিটে বসে অটোরিকশা স্টার্ট দিলো। আসলে রিস্ক নিতে চাইনি। বুঝলাম আমার অতি সতর্কতার কারণে ছেলেটির পাঠানি সততায় যে আঘাত দিলাম তার কাছে এই পাঁচ টাকা কিছুই না। টাকা দিয়ে সব কিছু কেনা যায় না। তবে এ পাঁচ টাকা আমাকে আধ ঘণ্টার টেনশন থেকে বাঁচিয়েছে। যদি প্লেন মিস হতো? ছেলেটিকে তা বুঝিয়ে বললাম।
এক মাসের ছুটিতে ঢাকা আসার কালে বাবুর্চিকে বিদায় করে এসেছিলাম। নতুন বাবুর্চি রাখা হয়নি। আপাতত, দুপুরে ইনস্টিটিউট থেকে ফেরার পথে কাফে জর্জ থেকে দুপুরের খাবার সেরে বাসায় ফিরি। বাসার ধারেকাছে রাতে খাওয়ার মতো হোটেল নেই। লালুক্ষেত বাজার থেকে একটাকা খরচ করে আধা সের টাটকা আপেল কিনি। একপোয়া দুধ রাখি। পাশের রুমের ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ার কর্মচারী ভদ্রলোক যখনই সময় পান, তার কেরোসিনের স্টোভে দুধটা গরম করে দেন। এতেই রাতটা চলে যায়। রাতে খাওয়ার জন্য দূরে যেতে ইচ্ছে করে না। দুপুরে কাফে জর্জ থেকে খেয়ে আসি। এভাবে এক মাস চলল।

কাফে জর্জে দুপুরের খাবার খাই। খাবার শেষে হোটেল বয়কে কিছু টিপস দেই; চার আনা বা আট আনা। নির্দিষ্ট কোনো রেট নেই। যার যা খুশি তাই দেয়। কেউ কেউ দেয়ও না। বিভিন্নভাবে এদের পরীক্ষা করে দেখেছি। কোনোদিন আট আনা দিয়েছি। কোনো দিন চার আনা। কোনো দিন দেইও নি। কিন্তু কী আশ্চর্য, এতে করে আমার প্রতি তাদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ করিনি। প্রতিবারই এসে সালাম দিয়ে খাবার মেন্যুটি হাতে তুলে দেয়। খাবারের অর্ডার নিয়ে সালাম দিয়ে মেন্যু হাতে করে খাবার আনতে চলে যায়। এরা কোনো প্রকার রাগ বা বিরাগের বশবর্তী নয়। খাবার শেষে পিরিচে করে বিল নিয়ে আসে। বিল পরিশোধের পর অবশিষ্ট টাকা একই পিরিচে করে দিয়ে যায়। টিপস যাদের দেয়ার এই পিরিচেই দেয়া হয়। কাফে জর্জে এর আগে ও পরেও বহুবার খেয়েছি, কিন্তু হোটেল বয়দের টিপস চাইতে কোনোদিন দেখিনি। দিলে খুশি, না দিলে অখুশি নয়। এর জন্য তারা লালায়িত নয়।
ছুটির দিন বাদে সকালের এবং দুপুরের নাশতাটা নিয়মিত ইনস্টিটিউটের ছাদের কেন্টিনেই সেরে নেই। ইনস্টিটিউটের ধারে বা দূরে যে বাসায়ই থেকেছি, তাই করেছি। এক দুপুরে খাবার শেষে একাই কেন্টিনে বসে আছি। এমন সময় ইনস্টিটিউটের এক সুদর্শন মধ্যমাকৃতির পেশোয়ারি বেয়ারা দুপুরের খাবার খেতে কেন্টিনে প্রবেশ করে আমার একটু দূরে সামনের একটি টেবিলে বসল। কাউন্টার থেকে প্লেটে করে সে তার খাবার দু’টি তন্দুর রুটি ও কিছু সবজি নিয়ে এসে খাচ্ছে। তার গোল করে কিনার গুটানো গোলাকৃতির চেপ্টা ও ছাই রঙয়ের সুন্দর পেশোয়ারি টুপির দিকে তাকিয়ে আছি। সে তা লক্ষ করে একপর্যায়ে আমাকে বলল, ’আও সাব, খানা খাও’। আমি বললাম, ’হাম খায়া, তুম খাও’। সে খেতে থাকে। আমি উঠে অফিসে চলে এলাম। সৌজন্য দেখাতে সে কার্পণ্য বা দ্বিধা করল না।

১৯৬৯ সালের এপ্রিলে দুই বন্ধু মিলে লাহোর রাওয়ালপিণ্ডি ইসলামাবাদ বেড়াতে গিয়েছিলাম। লাহোরে এক সন্ধায় হোটেলে ফিরতে দু’জনে বেবিটেক্সিতে উঠেছি। ড্রাইভার এক মধ্যবয়সী শীর্ণ ব্যক্তি। তাকে আমাদের গন্তব্য বুঝাতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলাম যে, উর্দু ভাষাটা আমাদের ভালো করে রপ্ত হয়নি। আমাদের ভাঙা ভাঙা দুর্বোধ্য উর্দু বোল শুনে ড্রাইভার ইংরেজিতে জানতে চাইল, আসলে আমরা কোথায় যাবো। আমরা তার বিশুদ্ধ ইংরেজি শুনে অবাক হয়ে গেলাম। জানতে চাইলাম, তিনি কতদূর লেখাপড়া করেছেন। তিনি জানান, তিনি বিএ পাস এবং সরকারি দফতরের একজন কর্মচারী। আমরা জানতে চাইলাম যে, তিনি তবে রিকশা চালান কেন। উত্তরে তিনি বললেন, মাসে যা বেতন পান তাতে সংসার চলে না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারেন না। তাই অফিস ছুটির পরে রিকশা চালিয়ে বাড়তি রোজগার করছেন। ছুটির দিনে সারা দিনই রিকশা চালানোর সুযোগ পান। এতে করে তার সংসারের অভাব ঘুচেছে। তিনি আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন। মিটারে ভাড়া যা উঠেছে তাই নিলেন। আমার মনে পড়ে, সেকালে বাংলাদেশে সরকারি অফিসের কোনো কোনো টাইপিস্ট অফিস ছুটির পর ঢাকার টিএন্ডটি ভবনের সামনে রাস্তার উত্তরপাশে টাইপিস্টের কাজ করে বাড়তি রোজগার করতেন। তবে তাদের কেউ বেবিটেক্সি চালাতেন বলে শুনিনি।
এসব ছোটখাটো ঘটনা খেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, মানুষ চাইলে তার আত্মমর্যাদা অক্ষুণœ রেখেই চলতে পারে। তাদের সবাইকে আমার কাছে সুখী মানুষ বলে মনে হয়। হয়তো একটু কষ্ট করতে হয়। তবু এ ধরনের জীবন যাপনে যে সুখ আছে তা পাওয়া যায় না হাত সাফাই করে চলে। সমাজের এসব অতি সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের অনেক কিছুই শিক্ষণীয় আছে, যা কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে শেখা যায় না। বার্টান্ড রাসেলের মতে, ‘সুখের জন্য কষ্ট দরকার, বিনা কষ্টে সুখ মেলে না। সুখের সাধনা সহজতর সাধনা, কিন্তু সহজ সাধনা নয়। (অতি কঠিন সাধনা যার অতি কঠিন সুর) তা জয় করে নিতে হয়, অমনি পাওয়া যায় না’। (মোতাহার হোসেন চৌধুরী অনূদিত রাসেলের ’দি কঙ্কোয়েস্ট অব হ্যাপিনেস’, সুখ ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ১৯০)

তাদের এই সততা, কর্মনিষ্ঠা ও অল্পে তুষ্টি সমাজে তাদের যে স্বাধীনতা দিয়েছে তা সিকিউরিটি গার্ড পরিবেষ্টিত দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাশালী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের নেই। তারা ’বনের পাখি’, কিন্তু ‘খাঁচার পাখি’ নয়। রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন- ’স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,/কে বাঁচিতে চায়,/দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,/কে পরিবে পায়’। প্রবৃত্তির দাসত্ব বড় ভয়ানক। পরমুখাপেক্ষিতা এবং অসততা প্রবৃত্তির দাসত্বেরই শামিল। প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিতেরাও বলে গেছেন, ’যদ্যপি বল্কল পর, রহ উপবাসী/হয়ো না হয়ো না তবু পরের প্রত্যাশী’। বার্টান্ড রাসেল একবার বলেছিলেন, ‘আমার বাগানের মালির সাথে কথা বলে যে সুখ পাই, পণ্ডিতদের সাথে কখা বলে তা পাই না’। সম্ভবত এই শ্রেণী-বিভক্ত সমাজে বৈষয়িক বিচারে এরা অভাবী। কিন্তু এ জগতে এসব নিরাভরণ পরিশ্রমী লোকেরাই খাঁটি, সুখী ও স্বাধীন মানুষ। তাদের বঞ্চিত করা গেলেও কোনো প্রকারেই অশ্রদ্ধা করা যায় না। হ
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক,
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কাডার


আরো সংবাদ