২২ জুন ২০১৮

প্রকাশ্যে যুদ্ধ গোপনে শোক

সিরিয়া যুদ্ধে নিহত এক ইরানি সেনার জন্য দোয়া করছেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনী(২০১৭ সালের ছবি) - ছবি : সংগ্রহ

২০১১ সালে সিরিয়ার গণঅভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর থেকে সিরিয়ায় ইরানের সামরিক উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। যুদ্ধের প্রথম দিকে সিরীয় সৈন্যদের প্রশিক্ষণদানের জন্য সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোর মধ্যেই তেহরানের হস্তক্ষেপ সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে ইরান বেশ কিছু শিয়া মিলিশিয়া রিক্রুট করছে এবং তাদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করে সিরিয়ার যুদ্ধ ক্ষেত্রে সরকারপন্থীদের শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে।

২০১৩ সালের বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে সরকারবিরোধী বাহিনী যখন সিরিয়ায় এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন ইরানি সামরিক উদ্যোগ আসাদ সরকারকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দি লেভান্টের (আইএসআইএল) উত্থানে তেহরান ‘ওয়ার অন টেরর’ তথা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে সিরিয়ার যুদ্ধে বিজেদের সম্পৃক্ততাকে বৈধতা দেয় এবং সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করে। ওই বছর প্রচলিত সামরিক বাহিনী আইআরজিসিতে যোগদান করে। তারা তাদের আফগান ও পাকিস্তানি শিয়া মিলিশিয়া (যথাক্রমে ১৪ হাজার শক্তিশালী ফাতেমি ডিভিশন ও পাঁচ হাজার সৈন্যের শক্তিশালী জিনারি ব্রিগেড) এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর সাথে সিরিয়ার যুদ্ধে যোগদান করে।

২০১৫ সালের গ্রীষ্মে ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিদেশ শাখা আল কুদস ব্রিগেডের কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সুুলেমানি মস্কো সফর করেন। তিন মাস পর রাশিয়া সিরিয়ায় তাদের স্থলবাহিনী মোতায়েন করে এবং সিরিয়ার বাশার সরকারের জন্য আকাশপথ নিরাপদ করাতে বিমানবাহিনীর মাধ্যমে বোমা হামলা জোরদার করে। রাশিয়া ও ইরানের সমন্বিত অভিযান অবশেষে আসাদ সরকারকে রক্ষা করেছে।
সিরিয়ার যুদ্ধে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং লাশের ঝুলি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরানি জনগণের কাছে সিরিয়ার নৌযুদ্ধে ইরানের সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে ইরান সরকার তৎপর হয়ে ওঠে।

নিহত সৈন্যদের গোপনে জানাজা ও দাফন
সিরিয়ার যুদ্ধে একেবারে শুরু থেকেই ইরান সম্পৃক্ত থাকলেও কেবল আইএস উত্থানের পরই যুদ্ধে ইরানি সৈন্যদের নিহত হওয়ার খবর আসতে থাকে। ২০১৬ সালে সরকারি হিসাবে সৈন্যদের হতাহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। এদের মধ্যে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারাও রয়েছেন, যাদের মৃত্যুর খবর লুকিয়ে রাখা কঠিন। সিরিয়ার যুদ্ধে বর্তমানে নিহত ইরানি সৈন্যদের সংখ্যা চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হয়।
সিরিয়ায় ইরানি সৈন্য মোতায়েনের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে ইরান সরকার সাধারণত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’কে ব্যবহার করে আসছে। ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে বিশেষভাবে আইএসআইএল দ্রুত বিস্তার লাভ করলে ইরান সরকার ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ ছদ্মাবরণে সিরিয়ায় সৈন্য মোতায়েন করে।

চূড়ান্তভাবে ইরান ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বাগাড়ম্বরটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আইএস’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসাদকে ক্ষমতায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। উভয়পক্ষ বিশেষভাবে বিবেচনা করে এই অজ্ঞাত সত্যটি উদঘাটন করে যে, আসাদ এবং আইএস হচ্ছে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আসাদের বর্বরতা আইএসকে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। অপর দিকে, আইএস আসাদের গণহত্যাকে বৈধতা দিয়েছে।
ইরানি জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করার শুরুতে শিয়া বুজুর্গ ব্যক্তিদের মাজার রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিল। এগুলোর মধ্যে ছিল দামেস্কের দক্ষিণে অবস্থিত সাইয়েদা জয়নব মসজিদ। শিয়ারা এটাকে মহানবী সা:-এর জামাতা ‘প্রথম শিয়া ইমাম’ আলী ইবনে আবু তালিবের মেয়ের কবর বলে মনে করে। ইরানের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা তাদের ভাষায় গোষ্ঠীগত ‘ওয়াহাবি সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

মাঝে মাঝে ইরানের সামরিক এলিটরা সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপকে তাদের ‘ইসলামি বিপ্লব রফতানি’ করার মূর্তপ্রতীক হিসেবে দেখে থাকে। উদাহণস্বরূপ, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুলেমানি ঘোষণা করেন, ‘বর্তমানে আমরা বাহরাইন থেকে ইরাক এবং সিরিয়া থেকে ইয়েমেন ও উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত ইসলামি বিপ্লব রফতানি করার চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি।’ বাশার আল আসাদের সরকারকে রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়ে ইরান কাজ করছেÑ তেহরানের কর্মকর্তারা তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অবশ্য কর্মকর্তারা ইরাক যুদ্ধের (১৯৮০-১৯৮৮) সময় দামেস্কের আনুগত্যের জন্য সিরিয়াকে তাদের ‘পাওনা ফিরিয়ে দেয়া’ বা ধন্যবাদ দেয়ার বিষয় নিয়ে মাঝে মাঝে আলোচনা করতেন।
কিন্তু ইরান-ইরাক যুদ্ধ ও সিরিয়া যুদ্ধে ইরানের সৈন্যদের নিহত হওয়ার মাঝে বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। ইরান-ইরাক যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের জানাজা ও দাফন প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হলেও সিরীয় যুদ্ধে নিহত ইরানি সৈন্যদের ছবি ও লাশ নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। প্রকৃতপক্ষে আইআরজিসি এবং তাদের একটি ফোর্স বাসিজ সিরীয় যুদ্ধে হতাহত সৈন্যদের ব্যাপারে শোক পালনের অনুষ্ঠানা জনগণের কাছে সম্পূর্ণ গোপন রাখে।
নতুন এই গোপনীয়তা আয়াতুল্লাহ খামেনির নীতিবাক্যের একটি নজিরবিহীন বৈপরীত্য। ইরাকের সাথে যুদ্ধে শুরু হওয়ার মাত্র এক মাস পর তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা শোক প্রকাশ বা বিলাপ করার মধ্য দিয়ে জীবন্ত তথা প্রাণবন্ত আছি।’ দশকের পর দশক ধরে এসব দাফন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির শিয়া শোক প্রকাশ সংস্কৃতি প্রদর্শিত হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে ইসলামি রাষ্ট্রটির সাহসী যোদ্ধাদের প্রতিরোধ সংগ্রামের বিষয় ফুটে উঠেছে। সিরিয়ায় হস্তক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানি কর্তৃপক্ষ ইরানি সৈন্যদের হতাহত হওয়াকে কেন্দ্র করে জনসমক্ষে যেকোনো রকম শোক পালন বুমেরাং হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে।

অপ্রকাশিত ব্যয়
ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএল যুগের পর বিশেষভাবে সিরিয়ায় বর্তমান কথিত পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় আসাদ সরকারের জন্য ইরানের কয়েক বছরব্যাপী সামরিক সমর্থনের জন্য তেহরান অর্থনৈতিক পুরস্কার অর্জন করেছে।
সামরিক অভিযানের প্রতিশ্রুত লভ্যাংশ প্রথম দর্শনেই আকর্ষণীয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেগুলো অর্জন করা খুব একটা সহজ নয়। কেবল সিরীয় অর্থনীতির অবস্থাই টলটলায়মান নয়, বরং রাশিয়াও সিরিয়ায় তার হস্তক্ষেপ থেকে কিছুটা লাভবান হতে চায়।
যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তেহরান দামেস্ককে শত শত কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। কিন্তু এসব ঋণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তেহরান সিরিয়ায় মোতায়েন করা, হিজবুল্লাহর হাজার হাজার যোদ্ধার জন্যও অর্থ ব্যয় করেছে। সাথে সাথে, তারা যেসব মিলিশিয়া রক্ষণাবেক্ষণ করে সেগুলোর পেছনেও বিরাট অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে- তা সত্ত্বেও সিরিয়ায় অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে তেহরান কথা বলা অব্যাহত রেখেছে। বিষয়টি ইঙ্গিতবহ। সিরিয়ায় ইরানের আর্থিক ব্যয়ের বিষয় এবং একই সময়ে ইরানি অর্থনীতি যে ভালো নেই, তা-ও যাচাই-বাছাই করতে হবে তাদের।
জনরোষ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য সিরিয়ায় সামরিক ব্যয়ের বিষয়কে গোপন রাখা হয়েছে। ইরান সেখানে তাদের হস্তক্ষেপের জন্য কত অর্থ ব্যয় করেছে তা অস্পষ্ট। বিভিন্ন সূত্রে ধারণা থেকে বলা যায়, ইরান সিরিয়ায় বার্ষিক ছয় শ’ কোটি থেকে দুই হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় করেছে। তেলের দাম পড়ে যাওয়া এবং স্বদেশে দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা কোনো অনুল্লেখযোগ্য ব্যাপার নয়।

আইএসআইএলের বিরুদ্ধে বিজয় দাবি
সিরিয়ার সরকারের প্রতি আনুগত্যের জন্য সন্দেহজনক বডিব্যাগ বিনিময় এবং আর্থিক সহায়তার যৌক্তিকতা যাচাই করা ইরানের জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে তেহরানের মন্দাভাবে হলেও, চতুর্দিকে একটি বিজয় জাহির করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
এটা বিস্ময়কর কিছু নয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল এবাদি ঘোষণা করেন, তার দেশে আইএসআইএলের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। রাশিয়ার সামরিক বাহিনী সিরিয়াকে নিয়েও একই ঘোষণা দেয়। অথচ তেহরানের সামরিক বাহিনী এবং রাজনৈতিক এলিটরা এর তিন সপ্তাহ আগেই এই কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। নভেম্বরে তেহরানের একজন কর্মকর্তা জোর গলায় আইএস-এর ওপর বিজয় দাবি করেন। এই দাবির মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে জানান যে, ইরানি সৈন্যরাই এই বিজয়ের পেছনে রয়েছে। ইরানের রক্ষণশীল দৈনিক কায়হান দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বক্তব্যের সাথে সুর মিলিয়ে গত বছর ১৮ নভেম্বর এক শিরোনামের মাধ্যমে ঘোষণা দেয় : ‘ইরাকে দায়েশের (আইএসআইএল) দলিল বা নথিপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’ এবং এর দু-এক দিন পর অপর এক ঘোষণায় বলা হয় ‘সিরিয়ায় দায়েশের সর্বশেষ ঘাঁটি মুক্ত করা হলো।’
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে পত্র বিনিময়ের পরিপ্রেক্ষিতে মিডিয়া উপলব্ধি করতে পারে, রাষ্ট্রটি আইএসআইএলের ওপর নিজেদের বিজয় উদযাপন করছে। প্রথমে আইআরজিসির সুলেমানি সর্বোচ্চ নেতার কাছে লিখিত এক খোলা চিঠিতে আইএসআইএলের ওপর তাদের বিজয় ঘোষণা করেন এবং এ বিজয়ের জন্য ইরানিদের পরিচালিত শিয়া মিলিশিয়া আর হিজবুল্লাহর প্রশংসা করেছেন।

খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সৈন্যদের বিজয়কে ‘গোটা মানবতার জয়’ বলে আখ্যায়িত করে চিঠির দ্রুত জবাব দেন। এরপর প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, আইআরজিসির কমান্ডাররা এবং সেনাবাহিনীর অন্যান্য উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা সুলেমানিকে অভিনন্দন জানান।
কিন্তু এখন আইএসআইএল ‘পরাজিত’। সুতরাং সিরিয়ায় তেহরানের অব্যাহত সামরিক উপস্থিতির আর যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। এখন তাদের বাগাড়ম্বরপূর্ণ নীতি-কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। অধিকন্তু, দীর্ঘ ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানের সময় মনে হয় ফুরিয়ে আসছে।
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ