২২ জুন ২০১৮

বাসে যৌন হয়রানি ও গণধর্ষণ : বিচার ও প্রতিকার চাই

-

বাংলাদেশে পাবলিক বাসে মহিলা যাত্রীদের ওপর যৌন হয়রানি বহু বছর ধরে প্রতিকারহীনভাবে চলছেই। অপ্রতুল পাবলিক বাসের কারণে ভিড়ের সুযোগে বিকৃত মানসিকতার কিছু পুরুষ যাত্রী মহিলা যাত্রীদের হয়রানি করে চলেছে, হেল্পাররা মেয়েদের বাসে ওঠানামার সময় অহেতুক গায়ে হাত দেয়- এ রকম অসংখ্য অভিযোগ আছে; তবুও প্রতিকার হচ্ছে না। মেয়েরা প্রতিদিন যৌন হয়রানির আতঙ্ক নিয়ে এবং এর শিকার হয়ে পাবলিক বাসে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণপরিবহনে যাতায়াতকারী ৯৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার এবং এ হেনস্তাকারীদের ৬৬ শতাংশ পুরুষের বয়স ৪১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে এবং ৩৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তারা ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, শিকার হওয়া নারীদের ৮০.৭ শতাংশ প্রতিবাদ করেন না কিংবা কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই অবস্থা থেকে কি বোঝা যাচ্ছে না, নারীরা ভীষণ হতাশ? ৮০ শতাংশেরও বেশি নারী প্রতিবাদ করছেন না।

কারণ তারা দেখছেন প্রতিবাদ করে কোনো ফায়দা হয় না। এটা কি ভয়াবহ অবস্থা নয়? একে তো নারী যাত্রীরা জঘন্য অসুস্থ মানসিকতার পুরুষ যাত্রীদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ, এর মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে পাবলিক বাসের চালক এবং তার সহযোগীদের দ্বারা চলন্ত বাসে মহিলা যাত্রীদের ধর্ষণের উদ্দেশ্যে যৌন হয়রানির অভিযোগ আসা শুরু হয়েছে। ভারতের দিল্লিতে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে চলন্ত পাবলিক বাসে একটি মেয়েকে গণধর্ষণ করার ফলে সে মারা যায়। ভারতের ওই ভয়াবহ ঘটনার অনুকরণে বাংলাদেশেও কিছু বাসচালক এবং তাদের সহকারীরা মহিলা যাত্রীদের চলন্ত বাসে অথবা বাস থেকে তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় আটকে গণধর্ষণের বর্বরতা শুরু করে দিয়েছে। এ ধরনের বেশির ভাগ ঘটনায় দেখা যায়- ভিক্টিম মেয়েটি যদি রাতের বা ভোরের যাত্রী কিংবা শেষের স্টপেজের যাত্রী হয়, তখন বাসে ওঠার পর চালক ও তার সহকারীরা পরিকল্পিতভাবেই অন্য কোনো যাত্রীকে বাসে উঠতে দেয় না বা বাসে ত্রুটি আছে বলে আগেই অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। এভাবে তারা কোনো নারীকে ধর্ষণের জন্য টার্গেট করে এবং টার্গেটকৃত নারী ছাড়া তারা বাস জনশূন্য করে ফেলে ইচ্ছা করেই। আবার টার্গেট করা নারী যাতে বুঝতে না পারেন যে বাসে তিনি একা, সে ক্ষেত্রে কিছু ঘটনায় দেখা যায় তারা নিজস্ব লোকজন যাত্রী সাজিয়ে বাসে বসিয়ে রাখে। এরা পরে মেয়েটির ধর্ষণকারী হয়ে আত্মপ্রকাশ করে।

জানা মতে, চলন্ত পাবলিক বাসে প্রথম গণধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যায় ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি। ওই দিন মানিকগঞ্জের ঢাকা-আরিচা হাইওয়েতে ‘শুভযাত্রা পরিবহনে’ একজন নারী গার্মেন্ট কর্মীকে বাসের চালক ও সহকারী নরপশুর মতো ধর্ষণ করে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যায়। মেয়েটির কাছে বাসের ভাড়ার জন্য খুচরা টাকা ছিল না- তাই তিনি ১০০০ টাকার নোট দিয়েছিলেন। বাসের সহকারী বলেছিল, তাকে বাকি টাকা ফেরত দেবে। কিন্তু মাঝরাস্তায় বাস নষ্ট- এ কথা বলে তারা সব যাত্রী নামিয়ে দেয়- মেয়েটিকে তারা বাকি টাকা ফেরত দেবে বলে বাসে বসে থাকতে বলে। কিন্তু এরপর বাস চালু করে কিছু দূরে নিয়ে চলন্ত বাসেই নরাধমেরা মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। এ ঘটনার পর পুলিশ চালক এবং তার সহকারীকে গ্রেফতার করেছিল, কিন্তু এরপর কী পদক্ষেপ নেয়া হলো জানা যায়নি। গত এপ্রিল মাসে ধামরাইয়ে একজন নারী গার্মেন্ট কর্মী রাত ১০টায় কাজ শেষে বাসায় ফেরার জন্য ‘যাত্রীসেবা’ নামে একটি লোকাল বাসে উঠলে বাসটি ধামরাইয়ের কালামপুর বাসস্ট্যান্ড পৌঁছলে মেয়েটি ছাড়া সব যাত্রী বাস থেকে নেমে যান। এরপর বাসের দরজা-জানালা বন্ধ করে ড্রাইভারসহ পাঁচ দুর্বৃত্ত মেয়েটিকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণ করে। মেয়েটির আর্তচিৎকার শুনে একটি পেট্রল পাম্পের কর্মীরা ধামরাই থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এলাকা থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার এবং পাঁচজনকে আটক করে। ২০১৬ সালের এপ্রিলেও একজন গার্মেন্ট কর্মী ‘বিনিময়’ নামের লোকাল বাসে করে ভোর ৬টায় আত্মীয়ের বাসা থেকে ফেরার পথে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলন্ত বাসে বাসের তিনজন কর্মী দ্বারা গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহে ‘ছোঁয়া’ বাসে যাওয়ার সময় রূপা খাতুন নামে একজন আইনের ছাত্রীকে বাসের চালক এবং তার সহকারীরা গণধর্ষণের পর হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় পঁচিশ মাইল এলাকায় বনে ফেলে রেখে যায়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যার পৈশাচিক ঘটনার মামলায় বাসের চালক এবং তিন সহকারীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর ডকুমেন্টেশন থেকে জানা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১০ জন নারীকে চলন্ত বাসের ভেতরে কিংবা বাস থেকে জোর করে নামিয়ে গণধর্ষণ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজনকে হত্যাও করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বলেই ধারণা করছে ‘অধিকার’। রূপার ঘটনা ছাড়া চলন্ত বাসে গণধর্ষণের কেউ বিচার পেয়েছেন কি না, জানা যায়নি।

কিছু দিন ধরে দেখা যাচ্ছে- বেশ কিছু সাহসী মেয়ে ফেসবুকে পাবলিক বাসের চালক আর তার সহযোগীদের যৌন নিপীড়নের কথা তুলে ধরছেন। গত ১৭ মার্চ ঢাকায় ‘নিউ ভিশন’ নামের বাসে একটি মেয়েকে যৌন হয়রানি করার কথা মেয়েটি তার ফেসবুকে লেখার পর বাসের চালক ও সহকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া, ১৭ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে ২০ মে ঢাকায় চলাচলরত ট্রাস্ট পরিবহনের কয়েকটি বাস আটকে প্রতিবাদ জানায় তার সহপাঠীরা। এর কিছু দিন আগে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে তুরাগ পরিবহনে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে তার সহপাঠীরা ৩৫টি বাস আটকে রেখে প্রতিবাদ করেছে। এরপর পুলিশ বাসটির ড্রাইভার ও তার দুই সহকারীকে গ্রেফতার করে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, রাজধানীতে বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন সাত হাজার বাস চললেও সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাস মোটে ৪০০টি (প্রথম আলো, ২২ মে ২০১৮)। অর্থাৎ ছয় হাজার ৬০০টি বাসই বেসরকারি মালিকানায় চালিত হচ্ছে এবং এগুলোতে যাত্রী হয়রানি ও অদক্ষ চালক নিয়োগসহ চরম অরাজকতা বিরাজ করছে দীর্ঘ দিন। আসলে যেনতেনভাবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন মহল সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মালিকদের বাস চলাচল করে এবং এসব বাসে সংঘটিত বেশির ভাগ ঘটনার কোনো বিচার হয় না। বাসগুলোর চালক ও সহযোগীদের পর্যাপ্ত তথ্যসহ এদের ফৌজদারি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড সরকারের কাছে আছে কি না সন্দেহ। ঠিকমতো তথ্য না থাকলে অভিযুক্তদের খুঁজে বের করা সহজ হয় না। প্রতিটি বাসের চালক এবং সহযোগীর তথ্য তালিকা বাসগুলোতে ঝুলিয়ে দেয়া থাকা দরকার এবং সরকারের কাছে এদের তথ্য থাকা জরুরি। প্রতিটি বাসের চালক এবং তার সহকারীর আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করা দরকার।

সম্প্রতি ঢাকায় পরিবহন মালিকদের সংগঠন জানিয়েছে- ঢাকা শহরের পরিবহন শ্রমিকদের প্রায় ৫০ শতাংশই মাদকসেবী। নেশার ঘোরে বাস চালানোর ফলে এক দিকে বাসের তলায় চাপাপড়ে প্রতিদিন অনেক মানুষ হতাহত হচ্ছেন, অন্য দিকে নেশা করে মহিলা যাত্রীদের ওপর যৌন হয়রানি এবং গণধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটায়। তাই পাবলিক বাসসহ সব পরিবহনের চালকদের মাদকাসক্তি আছে কি না, নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখা দরকার। যাত্রী নিরাপত্তা বাড়াতে এবং যৌন হয়রানি ঠেকাতে গণপরিবহনে জরুরি সেবার জাতীয় হেল্প ডেস্ক নম্বর ৯৯৯ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার কথা বিআরটিএ বললেও বেশির ভাগ বাসে তা নেই। এটা কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ে না কেন? বাসগুলোতে ৯৯৯ নম্বর থাকলে বিপদে পড়লে মেয়েরা অন্তত সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এ ছাড়া প্রতিটি বাসে সিসি টিভি ক্যামেরা লাগানো বাধ্যতামূলক করা উচিত।

বিচারব্যবস্থার চরম দুর্বলতা আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের ওপর দোষ চাপানোর প্রবণতার কারণে বেশির ভাগ মেয়ে সহজে বিচার চাইতে যায় না। যারা বিচার চায় তাদের চেষ্টায় কিছু অভিযুক্ত কখনো গ্রেফতার হলেও অনেকেই জামিনে বের হয়ে আসে। এ পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। বাসে ধর্ষণসহ যৌন হয়রানির বিচার না হওয়ায় এসব অপরাধ থামানো যাচ্ছে না।

স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও দেশে সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পর্যাপ্ত গণপরিবহন থাকলে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে চলাচল করতে পারত এবং যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। বর্তমানে বাসে খুব অল্প সিট নারীদের জন্য বরাদ্দ করা আছে। এই সিট পূরণ হয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের বাসে উঠতে বাধা দেয়া হয় বা উঠলেও তাদের ভিড়ের চাপে থাকতে হয় এবং তখন অনেকেই যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। অন্য দিকে, নারী যাত্রী বহনকারী বাসের সংখ্যাও খুব সীমিত হওয়ায় তা বেশির ভাগ নারীর কোনো কাজে আসে না। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের মোটেও মাথাব্যথা দেখা যাচ্ছে না।

পাবলিক বাসে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনেক মেয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগগুলো পর্যন্ত নেয় না। অনেক মেয়েই দূরে কাজ নেয়া, পড়াশোনা করা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়। অনেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য যানবাহনে উঠতে বাধ্য হয়। একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জানালেন, যৌন হয়রানির আতঙ্কে তিনি আর পাবলিক বাসে ওঠেন না। ভাড়ায় চালিত মোটরবাইক অনেক সময়ই খুব ঝুঁকিপূর্ণভাবে চালানো হয় এবং রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও প্রতিদিন মেয়েটি ভাড়ায় চালিত মোটরবাইকে করেই লালমাটিয়া থেকে সুদূর বসুন্ধরায় তার বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। কারণ হিসেবে তিনি জানালেন, বন্ধ বাসে যৌন হয়রানির শিকার হলে মোটরবাইকের মতো লাফিয়ে নামা সম্ভব নয়। তাই বাস বাদ দিয়ে মোটরবাইকে চড়া শুরু করেছেন। তার কিছু বান্ধবীও এটা করছে। পাবলিক বাসে যৌন হয়রানির আতঙ্ক কত মেয়েকে যে তাড়া করে ফিরছে, তার হিসাব কে রাখে?

নীতিনির্ধারণকারী যারা দেশে নারী উন্নয়নের জয়গান গাইছেন, তারা প্রাইভেট গাড়ি বাদ দিয়ে পাবলিক বাসে চলাচল শুরু করুন- সেখানে নারীদের অবস্থা নিজেই দেখুন, তারপর এসব সাফল্যনীতি গাইবেন কি না বিবেচনা করুন। সদিচ্ছা থাকলে পাবলিক বাসে নারীদের ধর্ষণসহ যৌন হয়রানি ঠেকানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিন। ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়।

লেখক : মানবাধিকার কর্মী ও অধিকার-এর জেন্ডার বিশেষজ্ঞ
taskin133@gmail.com


আরো সংবাদ