২২ জুন ২০১৮

আইসিসি এবং রোহিঙ্গাদের দুর্দশা

আইসিসি এবং রোহিঙ্গাদের দুর্দশা - ছবি : সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর গত ৯ এপ্রিল এর বিচারক বরাবর একটি আবেদন করেছেন। প্রাক-শুনানি চেম্বারে করা ওই আবেদনে বিচারকের প্রতি প্রসিকিউটর উল্লেখ করেন, প্রয়োজনে ঘটনা তদন্ত করার অধিকার আদালতের আছে এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেয়ার পুরো দায়ভার মিয়ানমারের।

এই আবেদনের সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অপারেশন’-এর কথা উল্লেখ করা হয়। ধারণা করা হয়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭৩০টি শিশুসহ কমপক্ষে ছয় হাজার ৭০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি ওই সময়ে কী পরিমাণ যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করাও অনেক কঠিন। কমপক্ষে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নারীকে এক প্রকার ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়। ২০১৭ সালের আগস্টে আক্রমণ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে; গ্রামের রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি ও সহায় সম্পদ ধ্বংস করে দেয়া হয়। রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশকে বসতভিটা ও গ্রাম ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়। ২০১৮ সালের মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী, কমপক্ষে আট লাখ ৩৬ হাজার ২১০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছে, যাদের বেশির ভাগই ২০১৭ সালের হামলার পর নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে পালিয়ে আসে।

নিজের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলে অথবা এই সংগঠনের সদস্যভুক্ত দেশগুলোতে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার বিচারের ক্ষমতা আইসিসির রয়েছে। তবে মিয়ানমার আইসিসির সদস্য নয়। এর অর্থ হলো, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যত ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা এই কোর্টের আওতার বাইরে।
কাজেই বলতেই হয়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ করা হয়েছে, সেসব এই কোর্টের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা যায় কেবল একটি যুক্তিতে আর তা হলো- যদি দেখানো সম্ভব হয় যে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে চালানো এসব অপরাধের জন্য তাদের এখনো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এবং এর মাত্রা বেড়েই চলেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১০ সালের মার্চে এই আদালতের সদস্য হয়েছে।

প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, কাউকে বিতাড়িত বা উচ্ছেদ করাও এমনই একটি অপরাধ। বিতাড়নকে অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করতে হলে একটি বিষয় অবশ্যই তুলে আনতে হবে; আর তা হলো, ভুক্তভোগীরা আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে গেছে এবং অন্য একটি রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছে। একই সঙ্গে, উচ্ছেদের মতো অপরাধ তখনই সম্ভব হয় যদি ভুক্তভোগী একবারের জন্য হলেও অন্য একটি রাষ্ট্রের সীমানায় প্রবেশ করে। আর এটাই ‘উচ্ছেদ’কে সহজাতভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করে।

রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্রটি হলো বাংলাদেশ। যদিও রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদে বাধ্য করেছে যে সহিংসতা, তা ঘটেছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে, কিন্তু এই উচ্ছেদরূপী অপরাধের ঢেউ বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। যেহেতু ভুক্তভোগীরা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে, তাই অপরাধও প্রমাণিত। যা-ই হোক, প্রসিকিউশন যুক্তি তুলে ধরেছে যে, আদালত এই বিচার চালু করতে পারে; কারণ আংশিকভাবে হলেও এর সদস্যরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

বেশ কয়েকজন ভাষ্যকার যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, তার পেছনে দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট যুক্তি আছে। তা সত্ত্বেও সম্ভবত এসব যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যেতে বসেছে। গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্স এলএলপির (জিআরসি) ৪০০ শান্তি মহিলা বা পিস ওমেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আংশিকভাবে যে উচ্ছেদ বা বিতাড়ন চালানো হয়েছে তা শুধুই একটি অপরাধ নয়। এর সঙ্গে আরো তিনটি অপরাধ এখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই সংঘটিত হচ্ছে, যার দায়ভার পুরোপুরি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের। এসব অপরাধ হলো বর্ণবাদ, গণহত্যা এবং নিপীড়ন- যা এই আদালতের বিচারের আওতায় পড়ে।
এই চারটি অপরাধ উচ্ছেদ, নিপীড়ন, গণহত্যা এবং বর্ণবাদ এগুলো যে এখনো হচ্ছে, তা শুরুতে আন্দাজ করা একটু কঠিন। এর অর্থ হলো- এসবের ফলাফল নির্ভর করছে এখন যা হচ্ছে তা কত দিন চলে এবং এর ব্যাপকতা কতটা, তার ওপর। একই সঙ্গে, অপরাধীরা যত দিন পর্যন্ত নিজেদের অপরাধ স্বীকার না করে এবং একই রকম অপরাধ করা থেকে বিরত না হয়। অন্যায়ভাবে কাউকে আটক করে রাখলে অপরাধ কেবল ওই ব্যক্তিকে আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং আটক ব্যক্তি ছাড়া না পাওয়া পর্যন্ত এবং আবারো মুক্ত-স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত এ অপরাধ ঘটছে বলেই ধরে নেয়া হয়। একইভাবে কাউকে উচ্ছেদ করা, কারো প্রতি বর্ণবাদী আচরণ করা, নিপীড়ন চালানো এবং গণহত্যার মতো অপরাধের ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে প্রযোজ্য।

উচ্ছেদের অপরাধ শুধু রোহিঙ্গাদেরকে তাদের বসতভিটা থেকে বিতাড়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উচ্ছেদের পর থেকেই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অবস্থান করছে, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ক্রমাগত তাদের নিজেদের বাড়িঘরে ফিরতে বাধা দেয়া হচ্ছে এবং তারা নিজেদের বসতভিটায় বসবাস করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্য দিকে, এ উচ্ছেদ যদি তাদের ওপর সামগ্রিকভাবে চালানো নিপীড়নমূলক কার্যক্রমের অংশ হয়, তাহলে বাংলাদেশের শরণার্থী-শিবিরে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের এ নিপীড়ন চলতেই থাকবে। যে বাংলাদেশ সরকার তাদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দিয়েছে তাদের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা এ নিপীড়নের শিকার হবে না বরং হবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে, যারা এখনো তাদের বিরুদ্ধে অমানবিক অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠীর শাসনামলের এমন এক প্রেক্ষাপটে যারা নিপীড়নকে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে রূপ দিয়েছে এবং একটি জাতিগত বা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে অন্য গোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। কাজেই মিয়ানমারে বর্ণবাদের মতো অপরাধ যে, এখনো সংঘটিত হয়েই যাচ্ছে তাই শুধু নয়, বরং বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

জাতিসঙ্ঘসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে খুবই সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে যে, রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনা, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মদদে নিপীড়নমূলক কার্যক্রমেরই অংশ এবং এটা চালানো হয় মিয়ানমারের বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপটেই।

উচ্ছেদের পর থেকেই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সচেতনভাবে এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছে, যেন রোহিঙ্গারা তাদের বসতভিটায় আর কখনো ফিরতে না পারে। ক্ষমতাসীন বর্ণবাদী সরকারের সময়ে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পরও এটা বন্ধ হয়নি এবং মৌলিক মানবাধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজেদের বসতভিটায় ফিরে যাওয়ার অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়েছে। অন্যভাবে বললে, এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তারা আশ্রয় নেয়া অবস্থায়। আর এ কারণেই এসব অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক আদালতের আওতায় পড়ে।

আবার, বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ থেকে যেমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, তাতে মনে হয়- মিয়ানমারে গণহত্যা এখনো চলছে। অনেকটা নিশ্চিত হয়েই, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান জেইদ রা’দ আল হুসেইন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন- গণহত্যার উপদানগুলো হয়তো এখনো উপস্থিত আছে, এই বিবেচনা উড়িয়ে দিতে পারে কে? গণহত্যা সম্ভবত সংঘটিত হয়েছে উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি করা এক পরিবেশে। এর লক্ষ্য ছিল একটি সংখ্যালঘু জাতি, সম্প্রদায় বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।

মিয়ানমারে তাদের বিরুদ্ধে যেসব কার্যক্রম চালানো হয়েছে, এর ফলে রোহিঙ্গারা তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন থেকে বঞ্চিত হয়েছে; নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ জোর করে তাদের বাধ্য করেছে বাংলাদেশের দিকে এক দীর্ঘ ও বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিতে। এ সময় তাদের নিজেদের কোনো ধরনের সহায়-সম্পদ ও খাদ্য-পানীয় নিতে দেয়া হয়নি, এমনকি ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার কথাও ভাবা হয়নি। বাংলাদেশে আসার সময় রাস্তায় তাদের আরেক দফা হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পথেই তাদের মালামাল ও সহায়সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে এবং তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছে।
অসংখ্য তথ্য-প্রমাণ থেকে এটা স্পষ্ট, রোহিঙ্গাদের দুঃসহ সহিংসতার শিকার বানানো হয়েছে এবং তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। এই নির্যাতন শুধু তাদের ভিটেমাটিছাড়া করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই কিংবা তাদের গ্রাম, বাড়িঘর, সহায়সম্পদ ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং তাদের জীবনের পরবর্তী অংশেও এসব নির্যাতনের প্রভাব সম্প্রসারিত হয়েছে।

খুবই পরিকল্পিতভাবে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা পুরুষ ও তরুণকে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে পরে হত্যা করা হয়েছে। পরিবার থেকে আলাদা করার পর হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী ও তরুণীকে হত্যার উদ্দেশ্যে কিংবা বিকলাঙ্গ করে দিতে, এমনকি তাদেরকে সামগ্রিকভাবে ধ্বংস করে দিতেই তাদের ওপর নিষ্ঠুর কায়দায় অমানুষিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়েছে। আর এভাবেই একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে নিঃশেষ করে দেয়ার কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করা এই যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে গণহত্যার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এমন অবস্থায় মিয়ানমারে চালানো এই গণহত্যার প্রভাব যেমন পড়তে শুরু করেছে, তেমনি সম্প্রসারিত হয়েছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডেও এবং তা এখনো চলছে। এর অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে এর বিচার হতে পারে।

আইসিসির বিচারকদের সিদ্ধান্তই রোহিঙ্গাদের জন্য সর্বশেষ আশা, যাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে আর কোনো জায়গা থেকে আইনগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই। রোহিঙ্গারা যেসব নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে এখনো যেসব নিপীড়ন সহ্য করে যেতে হচ্ছে, তারা শুধু তার ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছে। আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে নিন্দিত এই অপরাধের দায় মুক্তির সমাপ্তির জন্য এবং ন্যায়বিচারের আকুতির প্রতি সাড়া দিয়ে আদালত কি তার সক্ষমতার হাত বাড়িয়ে দেবে?
লেখক : গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্স এলএলপির ব্যবস্থাপনা অংশীদার, উজয় আইসেভ : গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্স এলএলপির পরামর্শক। আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম।
https://www.aljazeera.com/indepth/opinion/icc-plight-rohingya-180530144248660.html


আরো সংবাদ