২২ জুন ২০১৮

মালয়েশিয়ায় অর্থবহ পরিবর্তন

মালয়েশিয়ায় অর্থবহ পরিবর্তন - ছবি : সংগৃহীত

মালয়েশিয়ায় নবগঠিত পাকাতান হারাপান জোট সরকার দেশটির বিদ্যমান ব্যবস্থায় কী ধরনের গুণগত পরিবর্তন আনবে, সে দিকেই দৃষ্টি সবার। গুণগত পরিবর্তন বলতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে কী ধরনের রূপান্তর আসছে, সেটা মূল্যায়ন সময়ের দাবি। দেখতে হবে পরিবর্তনের প্রকৃতি, পরিধি ও বাস্তবতা কেমন। ধারণা করা হয়, ডা: মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার পরিবর্তন আনবে প্রধানত অর্থনৈতিক কার্যক্রমে, বিচারব্যবস্থায়, সিভিল সার্ভিসে, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে। গত ৯ মে অনুষ্ঠিত মালয়েশিয়ার ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয় তাৎপর্যপূর্ণ।

পাকাতান হারাপান জোট বিগত মার্চ মাসে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। পাঁচটি স্তম্ভ বা ফাইভ পিলার নির্দেশিত ইশতেহারে ৬০টি অঙ্গীকার (প্রমিজ) ঘোষণা করা হয়। ইশতেহারের প্রাধান্যপূর্ণ দিক হলো- সরকার গঠনের ১০০ দিনের মধ্যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। মোট ৬০টি অঙ্গীকারের মধ্যে ১০টি বাস্তবায়ন করা হবে ১০০ দিনের মধ্যে। এর শিরোনাম হলো- “10 promises in 100 days, to build the nation and fulfill hope”. এ ঘোষণা যতটা চমকপ্রদ, ততই চ্যালেঞ্জিং। আশা জোগানো অঙ্গীকার বা শর্ত ১০টি হলো- গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স (জিএসটি) কর্তন করা বা বাদ দেয়া, নির্ধারিত পেট্রল জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রদান, জাতীয় ঋণের বোঝা শূন্যে নামিয়ে আনা, গৃহবধূদের এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডে সম্পৃক্ত করা, সর্বনিম্ন মজুরি আধুনিকায়ন করা, alaysia Agreement 1963 (MA63) অনুযায়ী সাবা ও সারাওয়াক রাজ্যের স্ট্যাটাস পুনর্বহাল করা, PTPTN নামক উচ্চশিক্ষা ফান্ড স্থগিত করা, সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা স্কিম, বিভিন্ন কেলেঙ্কারির উন্মুক্ত তদন্ত করা এবং মেগা প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনা করা।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই মেগা প্রকল্প বাতিল এবং স্থগিত করা শুরু হয়েছে। কুয়ালা লামপুর-সিঙ্গাপুর হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্ক প্রকল্প বাতিল করেছে নয়া সরকার। এটি একটি মাল্টিবিলিয়ন মেগা প্রজেক্ট। ডা: মাহাথির বলেছেন, এটি অপ্রয়োজনীয় একটি প্রজেক্ট যেখানে প্রায় ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হবে, কিন্তু রিটার্ন আসবে না এক সেন্টও।

স্থগিত করা হয়েছে মেট্রোরেলের তৃতীয় প্রকল্প, যেটাকে বলা হয় এমআরটি থ্রি বা Klang Valley mass rapid transit line 3 (MRT 3). এটি বাস্তবায়ন করা হবে না মর্মে ঘোষণা দিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। কুয়ালা লামপুরের উপকণ্ঠে বৃহত্তর ক্লাং ভ্যালি অঞ্চলে এটি তৃতীয় লেন হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যার বেশির ভাগ স্টেশন হওয়ার কথা আন্ডারগ্রাউন্ডে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি শেষ হয়েছে এমআরটি ১, যা সংযুক্ত করেছে কুয়ালা লামপুরের উপকণ্ঠে সুংগাই বুলুহ ও কাজাং অঞ্চল। এমআরটি ২, যা নির্মাণাধীন, শুরু হয়েছে সুংগাই বুলুহ থেকে এবং সংযুক্ত করেছে সেরডাং ও পুত্রাজায়া।

বর্তমান সরকারের পর্যবেক্ষণ হলো, যেখানে সিঙ্গাপুরের সাথে সড়ক, রেল ও আকাশপথে সাশ্রয়ী ও সহজ যোগাযোগ বিদ্যমান; সেখানে কুয়ালা লামপুর ও সিঙ্গাপুরের মাঝে হাইস্পিড রেল যোগাযোগ একটি জাতীয় অপচয়। আর এমআরটি থ্রিও এমন একটি প্রকল্প- যা প্রচলিত মেট্রোরেলের সমান্তরালে উপর্যুপরি লাইন, যেটা নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা নেই।

অর্থনৈতিক বিষয়াবলি রাজনীতিকে শুধু প্রভাবিত করে না, বরং রাজনীতির গতিপথ পাল্টেও দিতে পারে। সেটা আরো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হলো মালয়েশিয়ায়। বিগত সরকার কর্তৃক দুর্নীতির কারণে ক্ষমতার পালাবদলে অর্থনৈতিক সংস্কারই প্রধান অ্যাজেন্ডা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এসব অর্থনৈতিক সংস্কারকার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সরকার যে লক্ষ্যে পৌঁছতে চায় তা হলো- মালয়েশিয়াকে আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি দেয়া এবং জাতীয় জীবনে পণ্য ও সেবা সহজলভ্য করা।

নির্বাচনে পাকাতান হারাপান জোটের নির্বাচনী ইশতেহারের লক্ষ্য ছিল, পাঁচটি বিশেষ সেক্টরে উন্নত দেশ উপহার দেয়া। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জাতিগত সম্পর্কের উন্নয়ন, সরকারি ইনস্টিটিউশন শক্তিশালী করা, পররাষ্ট্রনীতি ও সুশাসনের ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন আনা প্রভৃতি লক্ষ্যে কাজ করবে মাহাথির সরকার।

জোটের ভিশনে যে পাঁচটি পিলারের কথা বলা হয়েছে, তার প্রথম দু’টি হলো- ‘জনগণের দায়’ বা ঋণের বোঝা কমানো, আর অন্যটি হলো- সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীকরণ। অবশিষ্ট ‘পিলার’গুলো যথাক্রমে- জন-অর্থনীতি শক্তিশালী করা, সাবা-সারওয়াকের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং মালয়েশিয়ার ‘স্বর্ণোজ্জ্বল’ দিন ফিরিয়ে আনা।

বর্তমানে মালয়েশিয়ার বৈদেশিক ঋণ এক ট্রিলিয়ন রিংগিত। জাতীয় ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় ‘অফিসিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করেছে সরকার। যেকোনো মালয়েশিয়ান নাগরিক এখানে অনুদান দিতে পারবেন। সর্বনিম্ন এক রিংগিত হলেও অনুদান দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ট্রাস্ট ফান্ডের নাম দেয়া হয়েছে Tabung Harapan Malaysia. অর্থাৎ মালয়েশিয়া হোপ ফান্ড।
প্রধানমন্ত্রী মাহাথির বলেছেন, এটি হবে পরিকল্পিত ও স্বচ্ছ প্ল্যাটফর্ম। ক্যাশ টাকা নেয়া হবে না, জমা করতে হবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। Malayan Banking Berhad (Maybank)-এর একটি অ্যাকাউন্ট নাম্বার সংবাদপত্রে প্রিন্ট করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী খরস এঁধহ ঊহম জাতিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তাদের কন্ট্রিবিউশন এবং ফান্ড রেইজিংয়ে আগ্রহের জন্য।

এ অফিসিয়াল ট্রাস্ট ওপেন করা হয়েছে ৩০ মে এবং প্রথম দিনেই জমা পড়েছে সাত মিলিয়ন রিংগিত। দ্বিতীয় দিনের দুপুর নাগাদ জমা পড়েছে ১৮.৬ মিলিয়ন রিংগিত। তরুণেরা এগিয়ে আসছে ফান্ড সংগ্রহের কাজে। শাজারিনা নামক আইন পেশার একজন তরুণী তার পেজে লিখেছে, "Let’s do it again! And this time, WE are doing it! We can tell our children and grandchildren of this initiative that we all took part in to save Negaraku Malaysia" এ যেন একটি নতুন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ। দেশটির অতীত সেটাই বলে। ১৯৫৭ সালে মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা চূড়ান্ত করতে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী টেংকু আবদুল রহমান ব্রিটেন সফরের উদ্যোগ নেন, আর সেই সফরের খরচ জোগাতে মালয়ীরা নিজের স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সম্পদ বিক্রি করে সাহায্য করেছিল স্বাধীন দেশ দাবি করার নিমিত্তে। অর্থনৈতিক সংস্কারের আরেকটি দিক হলো, বিগত সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ১৭ হাজার ব্যক্তির চাকরি সুবিধা বাতিল করা হয়েছে এরই মধ্যে। এ উদ্যোগ সিভিল সার্ভিসে সরকারি ব্যয় কমানো, অর্থাৎ অপচয় রোধ করার জন্য। অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে বিদেশী শ্রমিকনীতিতে। বিদেশী শ্রমিক কমানো নিয়ে বিতর্ক চলছে নাজিব সরকারের সময় থেকেই। নীতিনির্ধারকদের তথ্য মতে, চলতি মাস থেকে এক মিলিয়ন বিদেশী শ্রমিক কমানোর উদ্যোগ নেয়া হতে পারে। মালয়েশিয়া হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিদেশী কর্মসংস্থানের ‘স্বর্গ’। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের শ্রমিকেরা সেখানে কর্মরত। সরকারি হিসাবে ১৭ লাখ বৈধ বিদেশী শ্রমিক আছেন, আর দেশটির ট্রেড ইউনিয়নের মতে, বৈধ-অবৈধ মিলে প্রায় ৬০ লাখ বিদেশী শ্রমিক আছেন। এসব শ্রমিক কমানোর ক্ষেত্রে সরকার দু’টি পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে। প্রথমত, ব্যাপক ‘অপারেশনের’ মাধ্যমে অবৈধ শ্রমিক গ্রেফতার করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো আর দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো- যেসব শ্রমিক অন্তত সাত বছর ভিসা নবায়নের সুযোগ পেয়েছে, তাদের ফেরত পাঠানো।

স্থানীয় ভাষায় ‘অপারেসি’ বা অপারেশন হলো ইমিগ্রেশন পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে, বিভিন্ন অঞ্চল ব্লক দিয়ে ব্যাপক গ্র্রেফতার অভিযান। এটি নিয়মিত কার্যক্রম হলেও মাঝে মধ্যে ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক মাত্রায় করা হয়।

দেশটির বহুবিধ সামাজিক সমস্যার অন্যতম প্রধান হলো- জন্মলগ্ন থেকেই বহু জাতীয়তার সমস্যা। চায়নিজ সম্প্রদায়ের ও ভারতীয় তামিল সম্প্রদায়ের নাগরিক মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। অন্যান্য সংখ্যালঘু মিলে মোট ৪০ শতাংশ নাগরিক সংখ্যালঘু। ভারতীয় বংশোদ্ভূত তামিলদের বৃহৎ অংশ অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত। অবশ্য বর্তমান প্রজন্মে শিক্ষায় সম্পৃক্ততার হার বেড়েছে। চায়নিজরা বেশির ভাগ শহরকেন্দ্রিক এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সর্বাধিক নিয়ন্ত্রণ তাদের। তামিলরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী, চায়নিজরা বেশির ভাগ বৌদ্ধ এবং আংশিক খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী। সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির চায়নিজদের সাথে ভূমিপুত্র মালয়িরা বাস করে আসছে যুগের পর যুগ। ১৯৬৯ সালে তাদের সাথে দাঙ্গা হলেও পরে একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিরাজ করছে সামাজিক স্থিতিশীলতা। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র তথা আইডি কার্ডের রঙের ভিন্নতা, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক লাইসেন্সে বৈষম্য এবং সরকারি চাকরিতে ভূমিপুত্র মালয়দের অগ্রাধিকার দেয়ার ফলে একধরনের চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবু দৃশ্যমান স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে অনেক কাজ করতে হবে বর্তমান সরকারকে।

চায়নিজদের সমর্থনপুষ্ট ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন পার্টি পাকাতান হারাপানের শক্তিশালী সদস্য। আর হিন্দুদের কমিউনিটি অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত অনেক বেসরকারি সংস্থা পাকাতান হারাপানের ‘কৌশলগত সঙ্গী’ হয়েছে, যার মধ্যে ‘হিন্দু রাইটস অ্যাকশন ফোর্স’ এবং ‘মাইনরিটি রাইটস অ্যাকশন পার্টি’ অন্যতম। স্বাভাবিকভাবেই অনুমেয়, এই অংশীদারদের সন্তুষ্ট রাখতে হবে মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন সরকারকে।

জাতিগত সমস্যা সমন্বয় করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ভারতীয় মালয়েশিয়ানদের আইডেন্টিফিকেশন কার্ড পরিবর্তন করে রেড থেকে ব্লু করার টাস্কফোর্স কাজ শুরু করেছে। তাতে অনুমান করা যাচ্ছে, সরকার কোনো কমিটমেন্ট রক্ষায় সময়ক্ষেপণের পক্ষে নয়। ‘মালয় অ্যাজেন্ডা’ বিশেষ করে ভূমিপুত্র মালয়িদের যে অব্যাহত সুযোগ দেয়া হয়েছিল, কোয়ালিশন ও কৌশলের কারণে তাতে পরিবর্তন হতে পারে বা হ্রাস পেতে পারে। কারণ, ৪০ শতক মাইনরিটি এখন ক্ষমতার অংশীদার।

মালয়েশিয়ায় শরিয়াহ আদালত আছে। মালয়েশিয়ার সংবিধান একটি অনন্য দ্বৈত বিচারব্যবস্থা যথা- সেকুলার আইন ও শরিয়াহ আইনের সমন্বয় করে চলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ক্ষেত্রে। নাজিব সরকারের শাসনামলে দেখা যায়, উদারতান্ত্রিক সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। মুসলিম ছাড়া ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন প্রকাশ্যে সব সুপারশপ থেকেই ড্রিংক ক্রয় করতে পারে; নিজ নিজ সম্প্রদায়ের রেস্টুরেন্টে চায়নিজ ও হিন্দুরা প্রকাশ্যেই সেসব খাবার ও পানীয় উপভোগ করে, যা ইসলামে হারাম। শহর-নগর, এমনকি ছোট বাজারেও ম্যাসাজ পার্লার, স্পা ও অনেক ক্ষেত্রে দেহব্যবসায় অনেকটা উন্মুক্ত হয়ে যায়। যদিও এসব হারাম স্থান ও পণ্য উপভোগ করা মুসলিমদের ক্ষেত্রে আইনগতভাবেই কঠোর করা আছে। আর মালয়েশিয়ান মুসলিমরাও বেশির ভাগই হারাম-হালাম মেনে চলেন বিধায় দেশটির প্রত্যেক ভোগ্যপণ্য ‘হালাল’ মার্ক করা বাধ্যতামূলক, যা নির্ধারণ করে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি।

তবু নাজিবের আমলে বিজাতীয় সংস্কৃতি যতটা উন্মুক্ত হয়েছে, তাতে মাহাথির মোহাম্মদ বছরখানেক আগেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। হয়তো সমাজ সংস্কৃতিতে নিয়ন্ত্রণ রেখা আরো সুস্পষ্ট হবে এ সরকারের সময়ে।
সিভিল সার্ভিসে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসবে না; শুধু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ পদগুলোতে কিছু পরিবর্তন আসবে এবং এটা শুরুও হছে। ক্ষমতায় বসার দুই দিন পরই মাহাথির ঘোষণা করেন, দুর্নীতির সাথে এটাকে সম্পৃক্ততা বা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দেয়ার সাথে আইজিপি এবং মালয়েশিয়ান অ্যান্টিকরাপশন কমিশনার কার্যক্রম তদন্ত করে দেখা হবে। আর একই সাথে কার্যক্রম তদন্তের কথা এসছে অ্যাটর্নি জেনারেল এবং নির্বাচন কমিশনারের ব্যাপারেও। কিন্তু বিস্তারিতভাবে মালয় সিভিল সার্ভিসের পরিবর্তন ততটা মুখ্য নয়। কারণ, জনপ্রশাসন রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখে না। মালয়েশিয়া এখন রাষ্ট্র হিসেবে সংশোধন ও পুনর্গঠনের পথে। সিভিল সার্ভিসে সম্পৃক্তরা মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ; যাদের বেতন, পেনশন, ভাতা ও আর্থিক সুবিধার পেছনে প্রায় সরকারি বাজেটের ৪০ শতাংশ ব্যয় হয়। এটা সংস্কার করা হবে ধাপে ধাপে।
সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় মান হারিয়ে ফেলায় মধ্যম আয়ের মালয়িরা তাদের সন্তানদের প্রাইভেট স্কুলে দিচ্ছেন। ১৭০টি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল আছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ মালয় জনগোষ্ঠীর। প্রাথমিক শিক্ষা পুনর্গঠনে সরকার দৃষ্টিপাত করবে বলে বিশ্বাস করে সমর্থক গোষ্ঠী।

রাজনীতিতে মূল পরিবর্তন এসেছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আধুনিকায়নের মাধ্যমে। এটি রাজনৈতিক আধুনিকায়নের একটি দৃষ্টান্ত। মাহাথির মনে করেন, দীর্ঘ দিনের সরকারব্যবস্থা ভেঙে দেয়া এবং বিরোধীদের ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রের আধুনিকায়ন ও বিজয় হয়েছে। কারামুক্ত আনোয়ার সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখছেন। আনোয়ার ইব্রাহিমের গণতান্ত্রিক লড়াই আর সমন্বিত রাজনীতির ফলাফলে বিশ্ব পেল এক নতুন মালয়েশিয়া।

মাহাথির মোহাম্মদ বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। তবু তাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে। আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ও তার দিনক্ষণ এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন হবে চ্যালেঞ্জিং। তিনি ক্ষমতার প্রথম দিন থেকেই সরকার পরিবর্তনের পথে হাঁটছে অতি দ্রুত অবিরত।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
email: eduliner04@gmail.com


আরো সংবাদ