২২ জুন ২০১৮

হুমকির মুখে ভারতের গণতন্ত্র

কংগেসের মঞ্চে রাহুল গান্ধী - ছবি : এএফপি

১৯৪৭ সালের বসন্তে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারা একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেন। সেটি হচ্ছে, নতুন জন্ম নিতে যাওয়া ভারত প্রজাতন্ত্রে ভোট দেয়ার অধিকার আর ব্রিটিশরাজের আইন সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক নাগরিকই ভোট দেয়ার অধিকার পাবেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম দেয় এবং একই সাথে এটি বিরাট চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। ইসরাইলি ইতিহাসবিদ অরনিট শানি তার নতুন বইয়ে এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, নেতাদের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের যে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন, বিশেষ করে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা ছিল একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। ১৯৫১ সালে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ১৭ কোটিরও বেশি ভোটারের তালিকা প্রস্তুত করা, ওই সময়ে যাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই ছিল অশিক্ষিত, কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা ছিল সাঙ্ঘাতিক চ্যালেঞ্জের। কাজটি শেষ করতে হাজার হাজার কর্মীর দুই বছরের বেশি সময় লেগে যায়। নবগঠিত ভারত প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ মোটামুটি হিসাব করে বের করেছিলেন, ভোটার তালিকা করতে যে কাগজ প্রযোজন হবে তার ঘনত্ব হবে ২০০ মিটারের বেশি।

আজকে সেই ‘ফোনবুক’-এর ঘনত্ব ওই সময়ের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। ভারতে আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে মোট ভোটার হবে ৯০ কোটিরও বেশি। তবে আজ আর ভোটার তালিকা প্রস্তুতসহ আনুষঙ্গিক সব কাজ সম্পন্ন করা কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। গত সাত দশকের গণতান্ত্রিক চর্চার ধারাবাহিকতায় ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও এর আয়োজনের প্রক্রিয়া একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার মধ্যে এসে গেছে। নির্বাচন কমিশন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও দক্ষ হয়ে উঠেছেন। তারা এখন স্থানীয়, রাজ্য ও জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেন। এসব নির্বাচনে এখন নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জটি আসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। ভারতের সাম্প্রতিক কয়েকটি পার্লামেন্টের সদস্যদের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, এদের এক-তৃতীয়াংশের বেশির বিরুদ্ধে আছে নানা ধরনের অপরাধের মামলা। নির্বাচনের সময় প্রভাব বিস্তার এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকার গঠনে জনপ্রতিনিধি কেনাবেচার যে সংস্কৃতি ভারতে গড়ে উঠেছে, সেটাই এখন ভারতীয় রাজনীতির বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

গত মাসে কর্নাটক রাজ্যে অনুষ্ঠিত রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে ভারতের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি ও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসঙ্কেতের চিত্রটি দেশবাসীর সামনে অত্যন্ত নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, ভোট তিন ভাগে ভাগ হবে। ফল ঘোষণার পর দেখা যায়, বাস্তবেও তাই ঘটেছে। কোনো দলই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তৈরি হয় ঝুলন্ত বিধানসভা। এ পরিস্থিতিতে দু’টি দল [কংগ্রেস ও জনতা দল (এস)] কোয়ালিশন সরকার গঠনের চুক্তি করলে তাদের সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়। কিন্তু রাজ্যের গভর্নর, যিনি কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত। তিনি এ দুই দলকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ না জানিয়ে সব নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে বিজেপিকে আমন্ত্রণ জানান এবং বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য ১৫ দিন সময় দেন। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শপথ গ্রহণের পর থেকেই বিরোধী বিধায়কদের বাগিয়ে আনতে নানা চেষ্টা চালাতে থাকেন। মন্ত্রিত্বের টোপ ও প্রত্যেক বিধায়ককে এক কোটি রুপি করে ঘুষ প্রদানের প্রস্তাব বিজেপি দিয়েছে বলে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হতে থাকে। অন্য দিকে কংগ্রেস ও জনতা দল (এস) তাদের বিধায়কদের তিনটি হোটেলে নিয়ে আটকে রাখে, যা ভারতে নজিরবিহীন ঘটনা। এ দিকে রাজ্য গভর্নরের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টে যায়। সেখানে রাতভর শুনানির পর শীর্ষ আদালত বিজেপিকে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য রাজ্য গভর্নরের দেয়া ১৫ দিন সময় কমিয়ে এক দিনে নামিয়ে আনেন। আর এতেই বিজেপির সরকার গঠনের সব চেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়। পদত্যাগ করেন বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পা। রাজ্যের গভর্নর বাধ্য হয়ে কংগ্রেস ও জেডি (এস)-এর জোটকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। এরপর জেডি (এস) নেতা কুমারস্বামীর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়।

ভারতের বর্তমান রাজনীতির এই চিত্র শুধু কর্নাটকেই নয়, পশ্চিমবঙ্গেও একইভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। এ রাজ্যে গত মাসে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে গ্রাম পঞ্চায়েত, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের মোট আসনের এক-তৃতীয়াংশ রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীরা বিনা প্রতিন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অনেক স্থানেই অন্য দলের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিলের সাহস পাননি। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, তৃণমূল কংগ্রেস পুরো রাজ্যে মোট আসনের তিন-চতুর্থাংশ পেয়েছে।

ভারতের যে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে এত দিন তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে বলে মনে করা হতো, সেগুলোতেও এখন রাজনীতির প্রভাব বা দলীয় প্রভাব ও নানা অনিয়ম ঢুকেছে বলে জনমনে ধারণা জন্মাতে শুরু করেছে। সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন ছিল দেশের সব মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। কিন্তু এখন এ দু’টি প্রতিষ্ঠান নিয়েও মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকেছে। গত জানুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্টের চারজন বিচারপতি সংবাদ সম্মেলন করে প্রধান বিচারপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা অভিযোগ করেন, প্রধান বিচারপতি মামলা বণ্টনের ক্ষেত্রে অর্থাৎ বিভিন্ন বেঞ্চে মামলা প্রেরণের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করেছেন। এ অভিযোগের পর জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয়ে যায় যে, প্রধান বিচারপতি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছেন।

নির্বাচন কমিশন রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে তাদের দায়িত্ব পালন করছে বলে এত দিন যে ধারণা জনমনে ছিল, সেটিও পাল্টাতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন এখন আর নিরপেক্ষ নয়, দলীয় প্রভাব এতে ঢুকে গেছে। গত বছর অক্টোবরে গুজরাট রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত তারিখ নির্বাচন কমিশন কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে বিশেষ সুবিধা এনে দেয়। কারণ, নানা কারণে রাজ্যের ভোটারদের মধ্যে বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হলে তাতে বিরোধী দল কংগ্রেস সম্ভবত ভালো ফল করত, কিন্তু নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ায় বিজেপি বিপুল অর্থ ব্যয় করে ও দলীয় প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচনের ফল তাদের পক্ষে আনতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এর ফলও তারা পায়। নির্বাচনে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজেপি আবারো সরকার গঠন করে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ভোটের তারিখ পিছিয়ে না দিলে বিজেপির জয়লাভ করা কঠিন হতো। নির্বাচন কমিশনের আনুকূল্য পেয়েই তারা গুজরাটে ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পিউ গ্লোবাল ভারতে সম্প্রতি একটি জরিপ চালায়। এই জরিপের ফলে দেখা যায়, ভারতে গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। পরিবর্তে তারা একজন শক্তিশালী শাসক এমনকি সামরিক শাসনের চিন্তাও করছেন। তবে ১৯৭০-এর দশকে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ভারতের জনগণ কার্যত একজন একনায়কের শাসনই দেখেছে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই শাসন বেশি দিন টেকেনি। জনগণও এ ধরনের শাসন পছন্দ করেনি।

সমগ্র ভারতে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ রেল-ব্যবস্থার যেমন সংস্কার প্রয়োজন, তেমনি দেশটির গণতন্ত্রেরও সংস্কার করা প্রয়োজন বলে জনগণের একাংশ মনে করে। তবে এ কথা সত্য, ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা যত ত্রুটিপূর্ণই হোক না কেন, এর অনেক অর্জনও রয়েছে। এই ব্যবস্থা ভারতের মতো বিশাল ও নানা বৈচিত্র্যে ভরপুর একটি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করে রেখেছে, সেনাবাহিনীকে বরাবরই রেখেছে ক্ষমতার বাইরে এবং একই সাথে এই ব্যবস্থা নাগরিক স্বাধীনতাকে রেখেছে সমুন্নত; যা ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। ১৯৫০ সালে গৃহীত সংবিধানের আলোকেই দেশটির নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও পার্লামেন্ট নিজ নিজ আওতার মধ্যে থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে এভাবেই চলে আসছে; কিন্তু চার বছর আগে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এত দিনের এসব অর্জন ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। সব জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থাই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা ভারতের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে বলে দেশটির নানা মহলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেমন পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলো যেকোনো সময় যেকোনো বিষয়ের ওপর সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারে। সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে বিরোধী দলের অনাস্থা প্রস্তাব মুহূর্তেই বাতিল হয়ে যাবে। পার্লামেন্টের বিজেপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। বিরোধী দলগুলো মোদি সরকারের বিরুদ্ধে একটি অনাস্থা প্রস্তাব আনার চেষ্টা করলেও লোকসভার স্পিকার সেই প্রস্তাব এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গ্রহণ করছেন না। এটি সুস্পষ্টভাবেই সংসদীয় রীতির বরখেলাপ। বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, মোদির সরকার চায় না গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো তার স্বাভাবিক গতিতে চলুক।

এ দিকে, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে চার বিচারপতির সংবাদ সম্মেলন করে আনা অভিযোগ সম্পর্কে ভারতের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বলেন, বিচারপতিদের অভিযোগের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কেননা, প্রধান বিচারপতি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর অনেক মামলা জুনিয়র বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত বেঞ্চগুলোতে পাঠিয়ে দেন এবং এসব বেঞ্চের বিচারপতিরা সরকার সমর্থক হিসেবেই পরিচিত। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এসব মামলা সিনিয়র বিচারপতিদের বেঞ্চে পাঠানোর কথা প্রধান বিচারপতির। কিন্তু তিনি নিয়ম লঙ্ঘন করে কিছু নির্ধারিত বেঞ্চে ওই মামলাগুলো পাঠাচ্ছেন। এ কাজ করে তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রতি জনগণের উচ্চ ধারণাকেই ভূলুণ্ঠিত করছেন। ভারতের সেনাবাহিনী আরেকটি বৃহৎ জাতীয় প্রতিষ্ঠান। গত সাত দশকের রেওয়াজ হচ্ছে, সবচেয়ে সিনিয়র জেনারেলই সেনাপ্রধান হবেন। কিন্তু মোদি সরকার সেই রীতি ভঙ্গ করে জুনিয়র জেনারেল বিপিন রাওয়াতকে সেনাপ্রধান নিয়োগ দেয়। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই জেনারেল রাওয়াত বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে মোদি সরকারকে প্রকাশ্যেই সমর্থন দিয়ে আসছেন, যা ভারতের সেনাবাহিনীর ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠানে এভাবে রাজনীতি ও দলীয় আনুগত্য ঢুকে পড়ায় ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েই দেখা দিয়েছে সংশয়-সন্দেহ।


আরো সংবাদ