২২ জুন ২০১৮

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম ইন্তিফাদা

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম ইন্তিফাদা - ছবি : এএফপি

ফিলিস্তিন ভূখণ্ডটি ঐতিহ্যগতভাবে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল এবং সংলগ্ন কিছু এলাকা নিয়ে বিরাজমান ছিল। ১৫ মে, ১৯৪৮ সাল। এক দিনে লাখো ফিলিস্তিনিকে তাদের হাজার বছরের আবাসভূমি থেকে সীমাহীন অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়ে উৎখাত করা হয়। সেই ভূমিতে বহিরাগত ইহুদিদের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় আজকের ইসরাইল। দিনটিকে ফিলিস্তিনিরা ‘বিপর্যয়’ বা ‘নাকবা’ দিবস হিসেবে বিবেচনা করে। ১৯১৭ সালে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলে শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। সেই থেকে শুরু প্রতারিত, ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, ভাগ্যবিড়ম্বিত ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। গত ৭০ বছর ধরে এই সংগ্রাম বিরতিহীনভাবে চলছে।

১৯৪৭ সালেই জাতিসঙ্ঘ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। জাতিসঙ্ঘের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব অনুসারে জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন। আর পূর্ব জেরুসালেম হলো ইসরাইলের অবৈধভাবে দখল করা ভূমি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেখানেই মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে এনেছে। আর সেটা করেছে সেই ফিলিস্তিনিদের বিপর্যয় বা ‘নাকবা’ দিবসে। ১৫ মে’র পর ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজার বিক্ষোভগুলো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কলেবরে হয়। বিক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে এ দিন গাজায় ৬০ জন নিহত এবং আড়াই হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হন।

ফিলিস্তিনিদের প্রথম ইন্তিফাদা শুরু হয় ১৯৮৭ সালের ৮ ডিসেম্বর। ওই দিন গাজার শরণার্থী শিবিরের বাইরে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি লরি চাপা দিয়ে চারজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলে মানুষের চাপা ক্ষোভ জ্বলে ওঠে। জানা যায়, ১০ হাজারের মতো শোকার্ত মানুষ উপস্থিত হন। সেই নামাজে জানাজার জামাতে আবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের জ্বলন্ত লাভা ছড়িয়ে পড়ে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ক্যাম্প থেকে গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমের সব অঞ্চলে। তারা ইসরাইলি সেনা এবং ট্যাংকগুলোর দিকে পাথর ছুড়ে নিজেদের প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনিদের পুরো প্রতিরোধ আন্দোলনকে ‘দাঙ্গা’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে উত্তাল জনতার মিছিলে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। তারপরও প্রতিরোধ আন্দোলন আরো তীব্র এবং বৃহৎ আকার ধারণ করে। তখন দখলদাররা শুরু করে গণগ্রেফতার কর্মসূচি। প্রথম বছরেই ইসরাইলি সরকার ১৬০০ বার কারফিউ জারি করে। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় ফিলিস্তিনিদের খামার ও বসতবাড়ি, উপড়ে ফেলা হয় গাছপালা। ইউএন রিলিফ এবং ওয়ার্ক এজেন্সি ফর ফিলিস্তিন রিফিউজির তথ্য মতে, ইন্তিফাদা সূচনার প্রথম বছরেই ৩০০ ফিলিস্তিনি শহীদ হন, গুরুতর আহত হন ২০ হাজার এবং সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো ফিলিস্তিনি কারাবরণ করেন ইসরাইলি দখলদারদের হাতে।

ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের দল ফিলিস্তিন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও) সহিংসতার লাগাম টেনে ধরতে এবং জাতিসঙ্ঘের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার চেষ্টা করে। বিপরীতে গাজা উপত্যকায় জন্ম হয় ইসলামিক প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের, যারা নিজেদেরকে পিএলও’র বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়।

হামাস তার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ঘোষণা করে। এ ঘোষণা আন্দোলনরত যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করে এবং সাহস জোগায় ইসরাইলি দখলদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার।
১৯৮৮ সালে জর্ডানের সুলতান হোসেন পশ্চিম তীরের সঙ্গে সব প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার আন্দোলন হুমকির মুখে পড়ে। তবে মুক্তিকামী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের উপর্যুপরি তরঙ্গাভিঘাত অব্যাহত থাকে, সেই সঙ্গে স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার ডাকও জোরদার হয়। একই বছরে দ্যা ফিলিস্তিন ন্যাশনাল কাউন্সিল নামের প্রবাসী সরকার ১৯৪৭ সালের জাতিসঙ্ঘের নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান গ্রহণ করে।

১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং চতুর্থ জেনেভা কনভেশন অগ্রাহ্য করার অভিযোগে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাবিত নিন্দা জানানোর খসড়া সিদ্ধান্তে একের পর এক ভেটো প্রয়োগ করে। নরওয়ের আগ্রহে পিএলও এবং ইসরাইলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে, যা পরের বছর অলসো চুক্তির মাধ্যমে পরিণতি লাভ করে। ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের উপস্থিতিতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন এবং পিএলওর চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তিতে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময় নির্ধারণ করা হয়, যে সময়ের মধ্যে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দখলিকৃত এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে সচল করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরাইলের প্রতি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান সহিসংতা বন্ধের দাবি জানিয়ে ৬০৭ এবং ৬০৮ নং প্রস্তাব উত্থাপন হয়।
১৯৯৩ সালে যখন ইন্তিফাদা স্তিমিত হয়ে আসছে ততদিনে ১৫০০ ফিলিস্তিনি এবং ১৮৫ ইসরাইলি নাগরিক নিহত হয়েছে; ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি করেছে কারাবরণ। প্রথম ইন্তিফাদায় ইসরাইলি বাহিনীর আধুনিক সব সমরাস্ত্রের মোকাবেলায় পাথর ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিরা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল, ইসরাইল যে একটি হিংস্র রাষ্ট্রশক্তি এই সত্য বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশিত হয়। ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় ২০০০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে। এটি ‘আল আকসা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। দখলদার ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন বেশ কিছু সৈন্যসামন্ত সঙ্গে নিয়ে আল আকসা মসজিদে প্রবেশ করলে ফিলিস্তিনিরা দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু করে।
বায়তুল মুকাদ্দাস ইস্যুতে এবার শুরু হয়েছে তৃতীয় ইন্তিফাদা। আল আকসা মসজিদসহ অন্যান্য মুসলিম ঐতিহ্য ধ্বংস করে বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইহুদিবাদীদের শহর হিসেবে চিহ্নিত করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে জোরালো প্রতিবাদ শুরু করে ফিলিস্তিনিরা। এরই মধ্যে ২০১৭ সালে জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার ট্রাম্পের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে এবং ফিলিস্তিনিরা তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরু করতে বাধ্য হয়।

এ দিকে, ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রামের অব্যাহত গতিধারায় আশার আলো জাগায় ১৯৭৯ সালে সংঘটিত ইরানের বিপ্লব। বিপ্লবের পর ফিলিস্তিন ও আল-কুদসের মুক্তির লক্ষ্যে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করতে মাহে রমজানের শেষ শুক্রবারকে আল-কুদস দিবস ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে বিশ্ব মুসলিম এ দিবসটি পালন করে আসছে। বর্তমান ফিলিস্তিনে হামাসের নেতৃত্বে জেগে উঠেছে ফিলিস্তিনের অজুত মানুষ। আর দক্ষিণ লেবাননে বিপুল শক্তি অর্জন করেছে এক লড়াকু সংগঠন হিজবুল্লাহ। তাদের হাতে পর্যুদস্ত হয়ে ২০০৬ সালে ইসরাইলি সেনাবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।

যে জাতি শাহাদতের মধ্যে গৌরব খুঁজে, তাদের কেউ থামাতে পারে না। তাদেরকে হত্যা করা যায়, বন্দী করা যায় কিন্তু স্বাধীনতার আকাশছোঁয়া স্বপ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। বায়তুল মোকাদ্দসকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন অর্জন না করা পর্যন্ত এ ইন্তিফাদা অব্যাহত থাকবে, ইনশা আল্লাহ। 


আরো সংবাদ