১২ ডিসেম্বর ২০১৯
মার্কিন প্রভাব বিস্তারে ফের এশিয়া সফরে পেন্টাগন প্রধান

রাশিয়া ও চীনকে কেন্দ্র করেই এশিয়ায় প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মার্ক এসপার -

দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যেই দ্বিতীয়বারের মতো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সফর করছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পেন্টাগন প্রধান মার্ক এসপার। যদিও তার এ সফর মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরেই আবর্তিত । তার পরও অতি সম্প্রতি ইরানের সাথে নতুন করে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া এবং সিরিয়ায় চলমান সংঘাতের ফলে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে তার মনোযোগ আরো বৃদ্ধি করছে এবং আরো সৈন্য সমাবেশের দাবি করেছে।
এসপারের এশিয়া সফর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশলের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্যের চিত্র তুলে ধরে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দীর্ঘ লড়াইয়ে জর্জরিত হওয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের জন্য হুমকি হিসেবে প্রথমে চীনকে মনোযোগে আনাই এর মূল লক্ষ্য।
উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যৌথভাবে লড়াইয়ের বিষয় পরামর্শের জন্য গত বুধবার এসপার দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেন। কেননা উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রাগারটি পেন্টাগনের যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীদের মূল মনোযোগের বিষয় হিসাবে রয়ে গেছে। এসপার সপ্তাহব্যাপী এই সফরে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জেনারেল ওয়েই ফেংয়ের সাথে ব্যাংককে একটি বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ৫ নভেম্বরের ভিডিও ফোনকল ছাড়া এটিই তাদের প্রথম সরাসরি যোগাযোগ।
দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বিতর্কিত আঞ্চলিক দাবির বিষয়টি মাথায় রেখেই এসপার ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন সফরে যাবেন। ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন শত্রু আর ফিলিপাইন দেশটির দীর্ঘদিনের বন্ধু। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কিছু অংশের দাবিদার প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে ক্রমবর্ধমানভাবে ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে আছে।
জুলাইয়ে সিনেটে জয় পাওয়ার পর এসপারের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ ছিল এশিয়াতে। তারপর থেকে যে বিষয়গুলো তার আমলে প্রাধান্য পেয়েছে তার মধ্যে সৌদি আরবের তেল শিল্পের কেন্দ্রস্থলে একটি নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর দোষ চাপিয়েছে। ওই হামলা পেন্টাগনকে সৌদি আরবে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান, সেনা ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাতে উৎসাহিত করেছে। মে থেকে যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক সুরক্ষা বজায় রাখতে কাতারে বিমান বাহিনীর বোমারু বিমানসহ নৌবাহিনীর জাহাজ ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ১৪ হাজার সেনা পাঠিয়েছে।
গত বছরের শেষ দিকে, চীনকে কেন্দ্র করে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের দৃষ্টি সমুন্নত করার নতুন কৌশল হিসেবে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্দান থেকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাটারি সরিয়ে নিয়েছিল। তবে ইরানের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে পেন্টাগন সেই পদক্ষেপ থেকে সরে আসে। এরপর জুলাইয়ে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের বিমান ঘাঁটিতে সেনাসদস্যদের ফিরিয়ে আনে। এই ঘাঁটিটি ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান শক্তির কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হুসাইনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ওয়াশিংটন ঘাঁটিটি ছেড়ে দেয়।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ হাজার ২০০ সেনা রয়েছে। ইসলামিক স্টেট গ্রুপের অবশিষ্টাংশকে পরাস্ত করার জন্য বাগদাদ সরকারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র ২০১১ সালে ইরাক থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, কিন্তু আইএসের যোদ্ধারা সিরিয়ার সীমান্তবর্তী বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখল নেয়ার তিন বছর পর ইরাকে সৈন্য ফিরিয়ে আনে ওয়াশিংটন। আরএএনএনডি করপোরেশনের সিনিয়র প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রুস বেনেট বলেছেন, পেন্টাগন স্পষ্টতই চীন ও রাশিয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, তার সামগ্রিক পদ্ধতির ফলে কিছু এশীয় মিত্ররা তারা আর কতদিন মার্কিন সমর্থন লাভের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবেন তা ভাবছে ।
বেনেট বলেন, ‘আমি কোরিয়ায় কিছু সামরিক লোকের সাথে কথা বলেছি, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ফ্লেকি (ধূসর) মিত্র বলে মনে করে।’ তাদের দৃষ্টিতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র কোন বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারে এবং এরপরেই সেখান থেকে সরে যেতে পারে।’ দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ভাবনা উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন জোর দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির জন্য যে ব্যয় তার একটি বড় অংশ কোরিয়ানরা প্রদান করুক।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানতেন, কখন তারা একটি নতুন চীন/রাশিয়া কেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল ঘোষণা করেছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যও মনোযোগে থাকবে। কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এশিয়ার দিকে বেশি মনোনিবেশ করার পরেও মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় এশিয়াবিষয়ক এসপারের মিনিয়র উপদেষ্টা র্যান্ডাল শ্রাইভার বলেন, ‘আমরা সত্যিকার অর্থেই কিছু বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছি। তাই আমদের মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিগুলো মোকাবেলা করার পাশাপাশি একই সাময়ে অন্যান্য ইস্যু মোকাবেলায় সক্ষম হতে হবে।
এসপার বলেছেন, নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল বাস্তবায়নের কাজ চলছে। যা তিনি তার পূর্বসূরি প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জিম ম্যাটিসের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। গত মাসে পেন্টাগনে এসপার তার অস্ট্রেলিয়ান প্রতিপক্ষের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার এসব বিষয়ে আরও সম্পৃক্ত হওয়া দরকার, এই অঞ্চলে সামরিক বাহিনীকে নতুন করে পরিচালিত করা দরকার এবং এ (এশিয়া-প্যাসিফিক) অঞ্চলে আমার আরও সফর করা দরকার। এসপার বলেন, এই অঞ্চলটি মনোযোগের কেন্দ্রে আসতে দীর্ঘকাল লেগেছে। ওবামা প্রশাসন এটি চেষ্টা করেছিল ২০১২ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বের বিষয়টি ঘোষণা করে। কিন্তু এরপরেই ইসলামিক স্টেট গ্রুপের উত্থান ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের লড়াইয়ে ফিরে যেতে হয়, প্রথমে ইরাকে এবং পরে সিরিয়ায়’।

 


আরো সংবাদ




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik