২০ জুন ২০১৯

ভোটে ভরাডুবির পর কংগ্রেসে পদত্যাগের হিড়িক

-

লোকসভা নির্বাচনে টানা দ্বিতীয়বার ভরাডুবির পর পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টিতে। উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি রাজ বাব্বরসহ তিন রাজ্যপ্রধান এরই মধ্যে দলের সভাপতি রাহুল গান্ধীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।
কংগ্রেসের কর্ণাটক প্রচারণা ব্যবস্থাপক এইচ কে পাতিল ও উড়িষ্যাপ্রধান নিরঞ্জন পাটনায়েকও পদত্যাগ করেছেন।
পদত্যাগের গুঞ্জন রয়েছে রাহুলেরও। আজ শনিবার (২৫ মে) দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে মোটেও সুবিধা করতে পারেননি কংগ্রেস সভাপতি। নির্বাচনী প্রচারণায় তার ‘চৌকিদার চোর’ স্লেøাগান একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। গান্ধী পরিবারের দুর্গ বলে পরিচিত আমেথির আসনেও হেরে গেছেন রাহুল।
নির্বাচনে বিজেপির তিন শ’র বেশি আসনের বিপরীতে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৯২টি। বলা হয়ে থাকে, উত্তরপ্রদেশ যাদের, ভারত সরকার তাদের। সেখানকার ৮০টি আসনের মধ্যে এবার কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র একটি আসন। রাহুল গান্ধীর বোন প্রিয়াংকা গান্ধীকে সাধারণ সম্পাদকের পদ দিয়ে জোর প্রচারণা চালালেও লাভ হয়নি তাতে। রাজ্যের একমাত্র জেতা আসনটি হচ্ছে সোনিয়া গান্ধীর রায়বেরেলি।
ফতেহপুর সিকরি আসন থেকে কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচন করেছেন প্রখ্যাত বলিউড অভিনেতা রাজ বাব্বর। জিততে পারেননি তিনিও। এ কারণে, দলের ভরাডুবির দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন এ নেতা।
বৃহস্পতিবার এক টুইট বার্তায় রাজ বাব্বর বলেন, উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের ফলাফল লজ্জাজনক। নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে না পারায় নিজের দোষ স্বীকার করছি। দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে দেখা করে আমার সিদ্ধান্ত জানাব।
নিজ ঘাঁটিতেও রাহুলের পরাজয়
ভারতের উত্তরপ্রদেশের আমেথি আসনটি মূলত কংগ্রেসের দুর্গ। অনেকের কাছে আসনটি গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধীর বাবা ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ওই আসন থেকে জিতেই ক্ষমতায় বসেছিলেন। ২০০৪ সাল থেকে এ আসনে টানা নির্বাচিত হয়ে লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব করেন রাহুল; কিন্তু এবার শোচনীয় পরাজয় ঘটল তার।
৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজেপির কেন্দ্রীয় টেক্সটাইল-বিষয়ক মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির কাছে হেরে গেলেন রাহুল গান্ধী। রাহুল মোট ভোট পেয়েছেন তিন লাখ ৩১ হাজার ৩০৫টি। স্মৃতি ইরানি পেয়েছেন তিন লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৩ ভোট। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে হার স্বীকার করে নিয়ে স্মৃতিকে অভিনন্দন জানান রাহুল গান্ধী। এবার ভাইয়ের হয়ে প্রচারণায় নামেন গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। এর আগে আমেথির ভোটাররা বরাবরই গান্ধীদের প্রতি একনিষ্ঠ থেকেছে। এক কোটি চার লাখেরও বেশি ভোটার রয়েছে আমেথি কেন্দ্রে। এ বছর নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৩ শতাংশ, যেখানে ২০১৪ সালে পড়েছিল ৫২.৩৮ শতাংশ ভোট। গত ১৫ বছরে এখান থেকে তিনবার লোকসভার সদস্য হয়েছেন রাহুল গান্ধী। স্থানীয়দের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় তিনি। এর কারণ, নেহরু-গান্ধী পরিবারের প্রতি মানুষের আবেগ।
কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে এ আসনের ক্ষমতায় থাকাও পরও এত বড় হার কেন হলো রাহুলের? ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, স্মৃতি ইরানি এবার আমেথিতে জোরদার প্রচার চালিয়েছিলেন। এই কেন্দ্রে ২০১৪ সালে তিনি পরাজিত হলেও রাহুলের জয়ের ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছিল প্রায় এক লাখ ভোটে। তার পরেও এ বছর স্মৃতির ওপর বিজেপির আস্থা ছিল।
২০১৪ সালের পরাজয়ের পর থেকে অনবরত কেন্দ্রে এসেছেন স্মৃতি ইরানি। বিজেপির ভোট অস্থিতিশীল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কংগ্রেস-বিজেপি দুই পক্ষকে মাঠ ছেড়ে দিয়ে এসপি-বিএসপি জোট এই কেন্দ্র্রে কোনো প্রার্থী দেয়নি। ভোট গ্রহণের কয়েক দিন আগে বিএসপি সুপ্রিমো মায়াবতী বলেন, ‘আমরা আমেথি ও রায়বেরেলি কেন্দ্রে প্রার্থী না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিই, যাতে বিজেপি-আরএসএসের সাথে যুক্ত শক্তির ক্ষমতা কমে। আর দুই সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী আরেকবার ভোটে লড়তে পারেন।’
এবারের লোকসভা নির্বাচনে যেসব কেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল, আমেথি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই কেন্দ্রটির প্রতি আগ্রহ এতটাই বেশি যে, অনেক আগে থেকেই এখানে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়ে যায়। জয়ের জন্য বিজেপি যে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তা গত ৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের সময় বোঝা গিয়েছিল।
তবে কংগ্রেসও যে লড়াইয়ের মাঠ থেকে সরে এসেছে তা-ও নয়। রাহুল বেশ কয়েকবার কেন্দ্রে গিয়েছেন। কৃষকদের সাথে দেখা করেছেন। এ ছাড়া একাধিক প্রকল্প উদ্বোধন করেছেন তিনি। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও রাহুলকে জেতানোর জন্য নানা ধরনের কৌশল নির্মাণে সাহায্য করেছেন।
ভোট গ্রহণের দিন কেন্দ্র থেকে অনুপস্থিত ছিলেন রাহুল। এ দিকে সরবে উপস্থিত ছিলেন স্মৃতি। রাহুলের ওয়ানাড়ে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে অন্য রকম ব্যাখ্যাও দেয় কংগ্রেস। তারা বলে, দক্ষিণের ভোটারদের আশ্বস্ত করা ছাড়া রাহুলের ওয়ানাড়ে প্রার্থী হওয়ার আর কোনো কারণ ছিল না।
মমতার জরুরি বৈঠক
ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। পশ্চিমবঙ্গেও ভালো ফল করেছে। সেখানে আগের সব রেকর্ড ভেঙে তৃণমূলের কাছাকাছি আসন পেয়েছে বিজেপি।
লোকসভার ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির চেয়ে এগিয়ে থাকলেও তৃণমূলের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর যদিও এ কথা স্বীকার করেননি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তিনি শাসকদলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং একই সাথে এটা বলেছেন যে, সব পরাজয় ব্যর্থতা নয়।
আজ শনিবার এক জরুরি বৈঠক ডেকেছেন মমতা। দলের নেতাকর্মীদের সাথে বৈঠক করবেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের ১৮টিই গেছে বিজেপির দখলে। অপর দিকে তৃণমূলের আসন ২২টি। ফলে সেখানে কার্যত শাসকদল তৃণমূলের প্রতিদ্বন্দ্বী এখন বিজেপি। বাঁকুড়াসহ একাধিক আসনে তৃণমূল প্রার্থীদের হারের জের ধরেই জরুরি বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মমতা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীরা। এ ছাড়াও উপস্থিত থাকবেন দলের জেলা পর্যবেক্ষকেরাও। সেখানে ২০২০ সালের পৌরসভা নির্বাচনের কার্যনীতি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন মমতা।

 


আরো সংবাদ