১৭ আগস্ট ২০১৮

ভারতে কৃষকেরা কেন আন্দোলনে নেমেছে

ভারতে কৃষকেরা কেন আন্দোলনে নেমেছে - ছবি : সংগৃহীত

ভারতে লাখ লাখ কৃষক গত শুক্রবার থেকে ১০ দিনব্যাপী আন্দোলন শুরু করেছে। ঋণ মওকুফ, খাদ্যশস্য, তেলবীজ ও দুধের মতো উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির দাবিতে তারা এ আন্দোলনের ডাক দেয়। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও রাজস্থানের কৃষকেরা তাদের জন্য একটি ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা দাবি করেছেন।

দেশটির কর্মসংস্থানের সর্ববৃহৎ এই সেক্টরের সঙ্কট মোকাবেলায় তারা সরকারের কাছে সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
এক বছরের কম সময়ের মধ্যে এটি এ ধরনের তৃতীয় বৃহত্তম আন্দোলন। গত মার্চে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মার্চ করে রাজধানী মুম্বাইয়ে পৌঁছে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল।

রাষ্ট্রীয় কৃষাণ মহাসঙ্ঘের প্রতিবাদ আন্দোলনের জাতীয় পর্যায়ের আহ্বায়ক অভিমন্যু কোহের বলেন, কৃষকেরা এখন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে। হরিয়ানার এই কৃষক বলেন, ঋণ থেকে আমাদের মুক্তি প্রয়োজন। আমরা ভিক্ষা চাই না, আমরা ক্রিমিনালও নই। কৃষকেরা আজ ঋণে ডুবে গেছে। কিন্তু এর কারণ এই নয় যে, তারা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। বরং সরকারের ভুলনীতির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
কৃষকেরা এ সময় মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) বা সর্বনি¤œ সহায়তা মূল্য নির্ধারণের দাবি জানায়। ভারত সরকার এই মূল্যেই উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে ফসল কিনে থাকে। তবে কৃষক ফেডারেশনের একটি রিপোর্টে দেখা যায়, ৯৪ শতাংশ কৃষকই এমএসপি থেকে কম দামে তাদের ফসল বিক্রি করে থাকে। যেখানে গম, তুলা, সরিষা, দুধ প্রভৃতি পণ্যের উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়ছেই সেখানে কৃষকেরা চুক্তিবদ্ধ মূল্যের চেয়েও কম মূল্যে তাদের পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এ কারণেই কৃষকেরা ঋণ করছেন এবং ঋণের কারণে তারা কারাদণ্ডও ভোগ করছেন।

অন্য দিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষি ঋণ মওকুফ মূলত ঋণ চক্রকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আবার প্রতীকী সহায়তার নামে দেয়া ভর্তুকিও এই কৃষি সঙ্কট মোকাবেলায় কোনো সমাধান নয়। অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বোস আলজাজিরাকে বলেন, ঋণ মওকুফটি আসলে ত্রাণ দেয়ার মতো। এটি কেবল ঋণের বোঝার নিচে কৃষক চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া থেকে রক্ষা করে। কিন্তু এটি দীর্ঘ মেয়াদে কৃষকদের পণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে বা কাঠামোগত সমস্যার ক্ষেত্রে কোনো সমাধান নয়।
ভারতে কৃষি সঙ্কটের স্বরূপ
দেশটির কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দশকব্যাপী ঋণ, খরা এবং আয়ের নি¤œগতি ভারতজুড়ে কৃষিখাতের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। কৃষকদের সহায়তা গ্রুপ আশার কর্মকর্তা কবিতা কুরুগান্তি বলেন, চাষযোগ্য জমির অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ইত্যাদির কারণে সেখানে কৃষকেরা সেখানে ঋণ অর্থনীতির মধ্যে জড়িয়ে যায়। অনেকগুলো জিনিস যেমন- আয় কমে যাওয়া, ফসল নষ্ট হওয়া ইত্যাদি পরিস্থিতিকে আরো বেশি জটিল করে তুলেছে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ, সম্পদ জব্দ করা ইত্যাদির কারণে দেশটির কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যার হার অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি হিসাবমতেই, দেশটির ৫২ শতাংশ কৃষক পরিবার ঋণের জালে আবদ্ধ।

কারা আন্দোলন করে এবং কেন?
এবারের আন্দোলনটি করছে রাষ্ট্রীয় কিষান মহাসঙ্ঘ। আগামীকাল কৃষক ফেডারেশন মধ্যপ্রদেশের মন্দসুরে একটি স্মৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে গত বছর পুলিশের গুলিতে ছয় কৃষক নিহত হয়েছিল। এ সময় তারা প্রতীকী অনশনও করবে। আগামী ১০ জুন এই আন্দোলন শেষ হবে। উল্লেখ্য, ১৯৩ টি গ্রুপের মিলিত ফেডারেশন অল ইন্ডিয়া কিষান সংঘর্ষ সমবায় সমিতি এ আন্দোলন থেকে দূরেই থাকছে।

কৃষকদের আয় কমছেই
ভারতের ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে ১৭ শতাংশ অবদান রাখে কৃষি খাত। কিন্তু এরপরও কৃষকদের আয় বাড়ছে না। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ২০২২ সাল নাগাদ কৃষকদের আয় দ্বিগুণ হবে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিনি এতে সফল হবেন না। ভারতের রাজ্যগুলো মাঝেমধ্যেই কৃষি ঋণ মওকুফের ঘোষণা দেয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নীতি কৃষকদের সুফল পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। গত বছর মহারাষ্ট্রে ৫২৩ কোটি ডলার কৃষি ঋণ মওকুফের ঘোষণা দেয়া হয়। তারপরও সেখানে কৃষকদের আত্মহত্যার মাত্রা ছিল সর্বাধিক।

দেশটির অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কৃষকদের সাহায্যে করা সরকারের যেকোনো প্রকল্পের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে এর ফলে বাজেট ঘাটতি না বাড়ে বা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কোনো নীতি লঙ্ঘিত না হয়। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউটিওকে জানায়, ভারত ধান ও গমচাষিদের অনুমোদন অর্থের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিয়ে ডব্লিউটিওর নীতি লঙ্ঘন করেছে। স্বাধীন খাদ্য ও বাণিজ্যনীতি বিশ্লেষক দেবেন্দ্র শর্মা বলেন, আমি আশা করছি ভারতের কৃষকেরা মার্কিন কৃষকদের মতো রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের মোট জনসংখ্যার মাত্র দুই শতাংশ কৃষক এবং তারা বিশাল আকারের ভর্তুকি পায়। অন্য দিকে ভারতের কৃষকেরা ভর্তুকির নামে পায় খুবই সামান্য অর্থ।

ভারতের অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট তিন লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছে। তবে অন্যরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। গবেষকেরা বলেন, পাঞ্জাবে ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১০০০ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। যেখানে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, হারটি বছরে ৩ শ’রও কম।
সমাধান কোথায়
রাষ্ট্রীয় কৃষাণ মহাসঙ্ঘ জানিয়েছে, যদি কৃষকদের মতামত উপেক্ষা করা হয় তাহলে উত্তেজনা আরো বাড়বে। এর আহ্বায়ক কোহের বলেন, ভারতের কর্পোরেটদের ঋণ মওকুফ হচ্ছে, নীরব মোদির মতো ঋণখেলাপিরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এগুলো কি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না? অথচ কৃষকেরা এক রুপি ঋণ পরিশোধের চেক পেয়েছেন। এটি কি জঘন্য ধরনের কৌতুক নয়?

২০১৬ সালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের ১৭টি রাজ্যের কৃষকদের বার্ষিক আয় ২০ হাজার রুপির চেয়েও কম। অন্য দিকে ২০১১ সালের জরিপে বলা হয়, প্রতিদিন দুই হাজার ৪০০ কৃষক পেশা ছেড়ে শহরে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

স্বাধীন খাদ্য ও বাণিজ্য পলিসি গবেষক দেবেন্দ্র শর্মা বলেন, ভারতের কৃষি অনেক গভীর সঙ্কটে নিপতিত হয়েছে। এ কারণে হাজার হাজার কৃষক আত্মহত্যা করছে। ভারতের সরকার মনে করছে, লোকজনকে কৃষির বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত এবং আমাদের অর্থনীতির নীতিগুলোও সেভাবেই রচিত হয়েছে। কিন্তু এই কৃষি খাতই তথাকথিত অর্থনৈতিক সংস্কারকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
সূত্র : আলজাজিরা

 


আরো সংবাদ