২০ জুলাই ২০১৯

ব্রডব্যান্ড সংযোগ বৃদ্ধি পেলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে

বর্তমানে অন্তর্জালে আর সীমাবদ্ধ নেই ইন্টারনেট। গ্রাম-শহর-নগরের মধ্যে কেবল সংযোগই তৈরি করেনি, মানুষের জীবনে এনেছে বিপুল পরিবর্তন। গড়ে তুলেছে নতুন সংস্কৃতি। এটি এখন হয়ে উঠেছে জীবনের মৌলিক অনুষজ্ঞ। সময়-দূরত্ব, শ্রেণি বৈষম্যের ব্যবধান ঘুচে আজকের বিশ্বে ইন্টারনেট হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সোপান।

এর মাধ্যমে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে ডিজিটাল ইকোনোমির হাওয়া। বর্তমানে ইন্টারনেট মানে আর ব্রাউজ করা নয়। এটি এখন জীবিকারও মাধ্যম। বর্তমানে দেশের জিডিপিতেও অবদান রাখছে ইন্টারনেট। এ বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করা হলো এ লেখায়।

এটি এখন হয়ে উঠেছে জীবন যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা,ব্যবসায়-বাণিজ্য সবকিছুর চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে। ফলে ইন্টারনেটের গতি আর ব্যান্ডউইথের সীমা বাড়ানো নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন ফরম্যাটে ইন্টারনেট ব্যবহৃত হলেও তেলাপোকার মতো অটুট রয়েছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের প্রসার।

এ বিষয় বিশ্বব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, প্রতি ১০ শতাংশ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পেনিট্রেশনের মাধ্যমে ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটে। আর প্রতি ১ হাজার ব্রডব্যান্ড সংযোগের মাধ্যমে প্রায় ১০ জন কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থান হয়।

ইন্টারনেট আমাদের প্রতিদিনের কাজে শুধু গান শোনা, ছবি দেখা, অনলাইন গেম খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে ইন্টারনেট শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি জীবনের প্রতিটি মৌলিক ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখছে। ইন্টারনেট জীবনকে করছে গতিময়। জীবনের পরতে পরতে এনে দিচ্ছে স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধি।
অবশ্য অনেকেই বলে থাকেন, ইন্টারনেটের ব্যবহার এখনো বহুলাংশে বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগনির্ভর রয়ে গেছে। বিষয়টি মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও সাধারণত উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট।

বর্তমানে শিল্পভিত্তিক সমাজকে তথ্যপ্রযুক্তি ও মেধাভিত্তিক উৎপাদনশীল করতে না পারলে ছিটকে পড়তে হবে আগামীর দুনিয়া থেকে। আর ইন্টারনেট ছাড়া মেধাভিত্তিক উৎপাদনশীল অর্থনীতি বা ডিজিটাল অর্থনীতি সম্ভব নয়। এ কারণেই পৃথিবী এখন প্রথাগত ব্যাংক থেকে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সিং, টেলিকনফারেন্স, ই-ফাইলিং, ই-ট্রাকিং, ব্যবসায়ে ই-কমার্স সর্বোপরি অর্থনীতিভিত্তিক কাজের ক্লাউড নির্ভরতা দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। ইন্টারনেটভিত্তিক এই ব্যবস্থাপনা ও রূপান্তর শ্রমিককে আরো উৎপাদনশীল করে ডিজিটাল অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করছে। অনলাইনে টিকিট কাটা থেকে শুরু করে অল্পদিনের মধ্যে পুরোপুরি ইন্টারনেট নির্ভর হয়ে উঠতে যাচ্ছে গণপরিবহন খাতও।

ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত জরিপে বলা হচ্ছে, ২০২৫ সাল নাগাদ ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে সমাজ ও শিল্প খাতের যৌথ মূল্যের পরিমাণ ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আর এই রূপান্তরে ব্যক্তি, ব্যবসায় ও যন্ত্রকে একটি সুতোয় গাঁথতে ইন্টারনেট ছাড়া কোনো গতি নেই। ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন অব ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিটিআই) প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এই জরিপে মোবাইল, ক্লাউড, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সেন্সর, অ্যানালাইটিক্সসহ বিভিন্ন ডিজিটাল টেকনোলজির প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইন্টারনেট সেবা ছাড়া আজকের পৃথিবীতে আর্থিক সেবা কল্পনা করাটাই দুরূহ। ব্যাংক, বীমাসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই এখন যুক্ত হচ্ছে ইন্টারনেটে। ইন্টারনেট নির্ভর সেবা দিয়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করছে। সময় ও দূরত্বের বাধা যেমনটা দূর করেছে, তেমনি স্বচ্ছ্বতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রান্তিক ভোক্তার সঙ্গে প্রতিটি আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এখন ইন্টারনেট নির্ভর হয়ে পড়েছে।

প্রচলিত ব্যাংকের চেয়ে সাধারণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিকাশ, রকেট ও নগদ। নগদ টাকা উত্তোলন ও জমা দেয়ার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যের হয়ে উঠছে এটিএম বুথ। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড সেবা ও মোবাইল ব্যাংকিং-এ তিন মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুতই।

সামগ্রিক অর্থনীতির একটি আলাদা ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ডিজিটাল অর্থনীতি। দ্রুত বর্ধমানশীল এ অর্থনীতির আকার এখন অবিশ্বাস্য! পাশাপাশি শক্তিমত্তায়ও বাড়ছে। আর্থিক ও সামাজিক পরিবর্তনে নিয়ন্ত্রণ হয়ে উঠছে অনেক করপোরেশন। তাছাড়া এই ডিজিটাল অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকের আসনে রয়েছে মাত্র তিনটি টেক জায়ান্ট।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ই-মার্কেটারের হিসাবে, ডিজিটাল অর্থনীতির ৬৭ শতাংশই গুগল, ফেসবুক ও অ্যামাজনের নিয়ন্ত্রণে। সার্চ জায়ান্ট গুগল, জনপ্রিয় সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুক ও ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ই-মার্কেটারের উপাত্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইন মার্কেটও নিয়ন্ত্রণ করছে এ তিনটি কোম্পানি। অনলাইন বিজ্ঞাপন ব্যয়ের তিন ভাগের দুই ভাগই যায় গুগল, ফেসবুক অথবা অ্যামাজনের প্লাটফর্মে। এর মধ্যে সোস্যাল মিডিয়ার বিজ্ঞাপনের সিংহভাগ পায় ফেসবুক। পাশাপাশি মোবাইল অ্যাডের দিক থেকেও ক্রমেই গুগলের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে জাকারবার্গের এ কোম্পানি।

ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজারে উদীয়মান শক্তি অ্যামাজন। যদিও কোম্পানির প্রধান ব্যবসা ই-কমার্স বা অনলাইন খুচরা ব্যবসা। যুক্তরাষ্ট্রে বছরে অনলাইনে যে পরিমাণ কেনাকাটা হয়, তার ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশই যায় অ্যামাজনের ক্যাশ রেজিস্টারে।

মূলত দ্রুত ও তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই ছিলো ইন্টারনেটের মূল শক্তি। এই শক্তিটি এখন নানা সেবায় প্রতিদিনই পল্লবিত হচ্ছে নতুন নতুন মাত্রায়। বর্তমানে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় শুন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছে যোগাযোগ খরচ। একটি ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েই বহুমুখী যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছেন ব্যবহারকারী।

এছাড়াও ঘরের-অফিসের নিরাপত্তা, পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত সিসি ক্যামটি এখন আর ইন্টারনেট সংযোগের বাইরে থাকছে না। এই ডিভাইসটিও অনেক ক্ষেত্রেই স্থাপিত জায়গার সঙ্গে যোগাযোগেও ব্যবহৃত হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যবধান-প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ইন্টারনেট শক্তির বদৌলতে বিশ্বময় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আইপি ফোন।

গ্রাহকদের নিরাপদ ইন্টানেট প্রদান ও দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে ও সাংগঠনিকভাবে ভূমিকা রাখতে দেশে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির কার্যনির্বাহী কমিটির দ্বি-বার্ষিক নির্বাচনে টিম ক্যাটালিস্ট নিয়ে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছি আমরা। ৮ প্রার্থী নিয়ে গঠিত হয়ছে আমাদের প্যানেল ‘টিম ক্যাটালিস্ট’।

আমরা আইএসপি সংগঠনগুলোকে একটি পরিবার হিসেবে মনে করি। এই পরিবারের কোনো সদস্যই যেন পিছিয়ে না থাকেন; একইসঙ্গে আমাদের ইন্টারনেট সেবাগ্রহিতারাও যেন বঞ্চিত না হন সে বিষয়টি মাথায় নিয়েই গঠিত হয়েছে টিম ক্যাটালিস্ট। আমরা কল্যাণের লক্ষ্যে পরিবর্তনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমরা আইএসপির জন্য কাজ করি, আমরা দেশের জন্য নিবেদিত।

লেখক: সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আইসিসি কমিউনিকেশন লি.


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi