Naya Diganta

রোহিঙ্গা গণহত্যা, গাম্বিয়া এবং কাশ্মির ইস্যু

বিশ্ব মানচিত্রের ছোট্ট মুসলিম দেশ গাম্বিয়াকে নিয়ে গর্ববোধ করছি। রোহিঙ্গাদের গণহত্যার ব্যাপারে অং সান সু চিকে প্রথম লিগ্যাল অ্যাকশন তথা মামলার মুখোমুখি করে দেশটি গোটা মুসলিম সম্প্রদায়কেই গৌরবান্বিত করেছে। আশা করি, একদিন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ভারতের গুজরাট এবং কাশ্মিরে মানবতার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অপরাধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করবে।

আফ্রিকার এই ক্ষুদ্র দেশটি নির্যাতিত নিপীড়িত রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ও গণহত্যা চালানোর বিষয় আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থাপন করেছে। রোহিঙ্গাদের কাশ্মিরিদের মতোই নৃশংসভাবে হত্যা করে গণকবরে মাটিচাপা দেয়া হয়। গাম্বিয়া জাতিসঙ্ঘের সর্বোচ্চ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। পাকিস্তানের বর্তমান সরকারকেও একই পরামর্শ দিয়েছিলাম। কাশ্মিরে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার দায়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করার জন্য আমি সরকারকে মোদির বিরুদ্ধে মামলা করতে আহ্বান জানিয়েছিলাম। পাকিস্তান সরকারকে এ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না দেখে হতাশ হয়েছি।

রোহিঙ্গাদের থেকে সাত হাজার মাইল দূরে অবস্থিত, গাম্বিয়ার শাসক রোহিঙ্গা মুসলিমদের বেদনা অনুভব করতে পেরেছেন। তাদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালানোর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক আদালতের দরজায় কড়া নেড়েছেন। আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হয়ে তাদের উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে এসেছেন। রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালানোর জন্য তিনি আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে বিচার চেয়েছেন। কিন্তু ভারত অধিকৃত কাশ্মির থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে থেকেও আমাদের শাসকরা এ ধরনের উদ্যোগ নেয়ার সাহস দেখাতে পারেননি।

এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, আমার নিজের দেশ পাকিস্তানসহ মুসলিম উম্মাহর কেউ ভারতের সর্বশেষ বাড়াবাড়ি ও ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ নিতে পারেননি। আমি পার্লামেন্টে বেশ কয়েকবার, সরকারের প্রতি এ ধরনের অপশন গ্রহণের পরামর্শ দিলেও সে ব্যাপারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরে বিগত ২৬ সেপ্টেম্বর কাশ্মির ইস্যুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কাছে একটি চিঠি লিখি। এতে আমি রোম সংবিধি বা বিধিবদ্ধ আইনের আওতায় বিষয়টি আইসিসির কাছে উপস্থাপন করার বিধিবিধান উল্লেখ করেছি। এতে বলা হয়, ‘আদালতের এখতিয়ার বা বিচারব্যবস্থার আওতায় পড়ে এ ধরনের অপরাধের ব্যাপারে যেকোনো ব্যক্তি বা গ্রুপ বা রাষ্ট্র ওটিপির কাছে তথ্য পাঠাতে পারে। এ পর্যন্ত ওটিপি ১২ হাজারেরও বেশি এ ধরনের অভিযোগ পেয়েছে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা তথা তদন্ত শুরু করতে পারে।

অধিকন্তু ওই চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছি, ‘আমি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই- নির্যাতিত কাশ্মিরিরা আজাদ কাশ্মিরের প্রতিনিধি অথবা পৃথিবীর অন্য অংশ থেকে এগিয়ে এসে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যুদ্ধাপরাধী প্রমাণ করার জন্য রোম বিধি অনুযায়ী কাশ্মির ইস্যুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কাছে পেশ করতে পারে।’ আপনি যথার্থভাবে তাকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ইতোমধ্যে পররাষ্ট্রবিষয়ক সিনেট কমিটিতে বিষয়টি উত্থাপন করেছি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে মিলিত হয়েছি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশির কাছে পাঠানো অপর এক চিঠিতে, ভারত অব্যাহতভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে বেসামরিক লোকদের টার্গেট করে যে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তা জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে তুলে ধরার জন্য তার প্রতি আহ্বান জানিয়েছি।

এ ছাড়াও ১৬ সেপ্টেম্বর সিনেট স্ট্যান্ডিং কমিটিতে কাশ্মির ও গিলগিট বাল্টিস্তান-বিষয়ক একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। আমি রোম বিধির আওতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানাচ্ছি। কাশ্মিরি নেতারা সরাসরি ভিক্টিম বা ভুক্তভোগী তথা নির্যাতিত হিসেবে এই বিচারের জন্য নিজেরাই রোম বিধি অনুযায়ী মামলা করতে পারেন। নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে আইসিসি বা আইসিজে’র কাছে আবেদন জানানোর দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রবিষয়ক সিনেট স্ট্যান্ডিং কমিটিতে অনেক প্রস্তাব পাস হয়েছে।

গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল আবু বকরমারি তামবাদো সাহস দেখিয়েছেন। মিয়ানমারের সৈন্যরা কী নৃশংসভাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমনাভিযান চালাচ্ছে, গ্রাফিকের (নকশার) মাধ্যমে তার বিস্তারিত বিবরণসহ জাতিসঙ্ঘের কাছে পেশ করা একটি রিপোর্ট সংযুক্ত করে বিচারের আবেদন জানানো হয়েছে। ২০১৭ সালে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার কী নিষ্ঠুরভাবে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা, নারীদের নির্বিচারে ধর্ষণ এবং তাদের সম্পদ ধ্বংস করে দিয়েছে, তার প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন তারা। পাশবিক নির্যাতনে আট লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এবং আরও অনেকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। মি. তামবাদো ২০১৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশে একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছিলেন এবং বাস্তুহারা রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সাথে কথা বলেছেন। তার গবেষণায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নৃশংসতার অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এসব হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে এবং কাহিনী শোনার পর তিনি এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হন।

এটা সত্য যে, রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের নিষ্ঠুর সৈন্যদের গণহত্যার মতোই কাশ্মিরেও ভারতীয় সৈন্যরা একই ধরনের গণহত্যা ও নৃশংসতা চালাচ্ছে। গণহত্যা, গণকবর, পেলেট গুলিবর্ষণ, ধর্ষণ, নির্যাতন, জোরপূর্বক গায়েব বা গুম করে দেয়া, রাজনৈতিক নির্যাতন এবং কার্ফু জারির মাধ্যমে গোটা কাশ্মির উপত্যকাকে অবরুদ্ধ করে ভারতীয় সৈন্যরাও নির্যাতিত কাশ্মিরিদের বিরুদ্ধে একই ধরনের যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত। ভারত ও মিয়ানমার উভয় সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ করে যাচ্ছে। আশা করি, মিয়ানমারের সৈন্যদের ব্যাপারে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে উল্লেখ করেছে ভারতীয় সৈন্যদের কর্মকাণ্ডকেও ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করবে। মিয়ানমার আইসিজে এবং আইসিসির কাছে যেভাবে গণহত্যার অভিযোগে মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেভাবে মোদিকেও অবশ্যই একই অভিযোগের মোকাবেলা করতে হবে।

হেগের আন্তর্জাতিক আদালত এবারই প্রথম বসনিয়া কমিশনের মতো অন্যান্য ট্রাইব্যুনালের ফাইন্ডিংসের ওপর নির্ভর করা ছাড়াই নিজেদের পক্ষ থেকে গণহত্যার দাবির ব্যাপারে তদন্ত করছে।

গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট ইমাতো তোরাই তার দেশকে ‘মানবাধিকারের ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠের একটি ছোট দেশ’ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে গাম্বিয়া অন্যান্য মুসলিম দেশের চেয়ে এবং মানবাধিকারের তথাকথিত সব চ্যাম্পিয়নের চেয়ে বজ্রকণ্ঠে সুউচ্চ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ভারতীয় সৈন্যরা ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কাশ্মির উপত্যকায় কার্ফু জারি করার মাধ্যমে ‘জাতিগত মুসলিম নির্মূল অভিযান’ শুরু করেছে। কার্ফু জারি করে তারা তাদের সব বর্বরতা ও নৃশংসতাকে গোপন রাখতে চেয়েছিল। ভারতীয় সৈন্যরা গুম, ধর্ষণ, দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, ডিটেনশন, নির্যাতন, বাড়িঘর, মসজিদ, মাদরাসা এবং দোকানপাট ধ্বংস করে দেয়া ছাড়াও কাশ্মিরিদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করছে। ভারতীয় সৈন্যদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে রয়েছে, দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ এবং প্রায় আট হাজার থেকে ১০ হাজার লোককে গুম করা। অপর দিকে, গত তিন দশকে ভারতীয় সৈন্যরা ৭০ হাজার কাশ্মিরিকে হত্যা করেছে।

আর ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী প্রায় ২৪ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করেছে। ৩৪ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে এবং ১৮ হাজার রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়। এই পরিসংখ্যান বর্বরতার প্রমাণ। কাশ্মিরিদের ওপর পরিচালিত বর্বরতা রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত হত্যা, নির্যাতন ও নৃশংসতার চেয়ে কম নয়। আইসিজে ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের গণহত্যাকে এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না। ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে)। মিয়ানমারের মুসলিম গণহত্যার বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার প্রতিনিধিরা যেমন নীরব থাকতে পারেননি, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কাশ্মিরে ভারতীয় বাহিনীর বর্বরতা ও গণহত্যার বিরুদ্ধেও গর্জে উঠতে হবে।

‘দ্য ন্যাশন’ থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার