Naya Diganta

পরিবেশবান্ধব মানসিক প্রশান্তি ও নিরামিষ

খ্রিষ্টের জন্মের ৫০০ বছর আগে, দার্শনিক পিথাগোরাস নিরামিষ খাবার নিয়ে দেহ-মন-শরীর উপযোগী একটি খাদ্যতালিকা দিয়েছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তা জনপ্রিয় হয়। ভূমধ্যসাগরীয় এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় নিরামিষ খাদ্যচর্চা বেশ জনপ্রিয় ছিল। আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীন সভ্যতায় সমৃদ্ধ ইতিহাসে নিরামিষ নিয়ে জনপ্রিয় মুখরোচক কাহিনী পাওয়া যায়। ‘নিরামিষ খাদ্য’ বলতে প্রধানত প্রাণিজ গোশত পরিহার বুঝায়।

অনেকে শতভাগ উদ্ভিজ্জ খাবারে ঝুঁকছে। শক্তিশালী আরেকটি পক্ষ উদ্ভিজ্জর সাথে গ্রহণ করছে দুধ, ঘি, মাখন, মধু এবং এ-জাতীয় খাবারের সংমিশ্রণ। আরেক ক্ষমতাধর পক্ষ এসবের সাথে ডিম ও সংশ্লিষ্ট সব রকম খাবার রাখার পক্ষে। কেউ কেউ নিত্য ব্যবহার্য জীবন প্রণালীর সাথে ওতপ্রোত সম্পৃক্ত পশুর চামড়া, এই জাতীয় সব জিনিসপত্র, উল বোনা, সব কাপড়-চোপড়, সাথে মুক্তা পাথর ও সংশ্লিষ্ট গহনার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

‘নিরামিষাশী’ বলতে জনসাধারণের যা ধারণা, তা হলো তারা আমিষ খান না। বাস্তবতা তা নয়। নিরামিষাশী ব্যক্তিরাও আমিষ গ্রহণ করে। তবে তা গোশতের উৎস থেকে নয়। আমিষের উৎসে। খাদ্য প্রক্রিয়ার যে ছয়টি মূল উপাদান এর প্রধানতম কিন্তু আমিষ। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য বেড়ে ওঠা, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন, মানসিক প্রশান্তি, পুষ্টির চাহিদা জোগানোর জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ অপরিহার্য। প্রত্যেকেই ভেষজ উৎস থেকে আমিষসহ খাদ্যগুণের সব পুষ্টিমান গ্রহণ করে থাকে।

বাদাম, বিভিন্ন শস্য, ডাল ও শিমজাতীয় নানা সবজিতে পর্যাপ্ত আমিষের উপস্থিতি থাকে। তিসির তেল, তিলের তেল, সূর্যমুখীসহ অনেক রকমের তেলকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেয়া হয়েছে। দুগ্ধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবারের বিকল্প হিসেবে কাজুবাদাম ও এর দুধ, নারকেল ও এর দুধ, সয়ামিল্ক, বাদাম থেকে বাটার, অলিভ ওয়েল, বিকল্প খাদ্য হিসেবে সারা বিশ্বে জনপ্রিয়। শাকসবজি, ফলমূল তো আছেই। সব দেশেই তরিতরকারি, ফলমূল, শাক-সবজি আবাদ করা হয়। পেয়ারা, লটকন, জাম, জামরুল, আমড়া, কামরাঙা, বাঙ্গি, তরমুজ, আমলকী, শালুক, কচু- এসব উৎস থেকে শরীরের যাবতীয় পুষ্টিমান আহরণ করা যায়। আর প্রচলিত আম, কাঁঠাল, লিচু, কমলা, জাম্বুরা, জলপাই, আপেলের সাথে আরো কত রকম ও ধরনের দেশী-বিদেশী ফলের আমদানি-বিক্রি এখন সর্বত্র।

গবেষণায় প্রমাণিত, প্রাণীর গোশত বিশেষ করে গরু, ভেড়া, মহিষ, ছাগলের গোশত খাওয়া অন্ত্রের নানা রোগ-উপসর্গের প্রধান কারণ। হৃদরোগ, প্রেসার, কিডনি সমস্যাসহ অনেক জটিল রোগের অন্যতম কারণ প্রাণিজ আমিষ বা গোশত। মাত্রাতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এবং স্বাস্থ্যগত মান বজায় রাখতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা ব্যবস্থাপত্রে গোশত পরিহার ও ফলমূল, শাকসবজিতে অভ্যস্ত হওয়ার নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। কিন্তু পরিকল্পিত, পরিমিত আহার ও নিদ্রায় স্বাস্থ্য সম্পদ অর্জন সম্ভব।

নৈতিকতানির্ভর জীবন-প্রণালী এবং পরিবেশ প্রকৃতি ও নিরামিষের উপকারিতা বিবেচনায় বিশ্বব্যাপী নিরামিষে বিশ্বাসীর সংখ্যা বাড়ছে। জাতিসঙ্ঘের মতে, পৃথিবীর লোকসংখ্যা এখন ৭০০ কোটি, ২০৫০ সালে তা দাঁড়াবে ৯০০ কোটিতে। এই বিপুল মানুষের চাহিদামতো গোশতের জোগান দিতে বিপুল গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি লালন-পালন করতে হয়। তাতে প্রচুর মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে জলবায়ু উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, মাত্র একজন ব্যক্তি নিরামিষভোজী হলে বছরে দেড় কেজি কার্বন নিগর্মন কমে যায়।

প্রাণীর ওপর নিষ্ঠুরতা আর শোষণের বিরুদ্ধে প্রাণীসংশ্লিষ্ট সব পণ্য পরিহার করতে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন করে যাচ্ছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। তাদের যুক্তি, পশুর চাষাবাদে- অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতি মানুষের নানা রোগের জন্য দায়ী। যুক্তরাষ্ট্র গত তিন বছরে ৬০০ শতাংশ শাকাহারীর বিস্তার ঘটেছে। বিশ্বে ২০১৮ সালে এর সংখ্যা বেড়েছে ১০০০ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ শতাংশ এবং নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ডেনমার্কসহ নর্ডিক দেশসমূহে অতিদ্রুত নিরামিষাশীর সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় সব শহর-গ্রামেও এখন জৈব রেস্তোরাঁ, নিরামিষ হোটেলে খাবারের প্রতি আকর্ষণ ব্যাপকতা লাভ করছে।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের জন্য মানসিক প্রস্তুতিই সঠিক পথে নিয়ে যাবে। স্বাস্থ্যসম্মত নিরামিষ উপভোগের সৃজনশীলতা ঘটবে। জগৎখ্যাত জনপ্রিয় অনেক রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, লেখক, অভিনেতা, গায়ক, বক্সার, মিলিয়নেয়ার তাদের স্বাস্থ্য সম্পদকে নিরামিষে সমর্পণ করে পরিশুদ্ধ জীবন ভোগ করে গেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন- এ পি জে আবদুল কালাম, মহাত্মা গান্ধী, দালাই লামা, চেলসি ক্লিন্টন, আলবার্ট আইনস্টাইন, আল গোর, বার্নাড-শ’, প্লেটো, সক্রেটিস, নিউটন, টলস্টয়, মার্ক টোয়েন, বব ডিলান, অমিতাভ বচ্চন, আমির খান, বিদ্যা বালান, কারিনা কাপুর, মোহাম্মদ আলী, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, বিরাট কোহলি, কার্ল লুইস, সেলিনা জেটলি, স্টিভ জবস, মাইকেল জ্যাকসন, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জর্জ হ্যারিসন। বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধ, জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা, স্বাস্থ্য সম্পদের মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিরামিষ ভোজন।

‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’ প্রতিপাদ্যকে হৃদয়ে ধারণ করি, লালন করি। আকৃষ্ট হই উদ্ভিজ্জ ভোজনে। আত্মার স্থিরতার সাথে নিরোগ ঝরঝরে শরীর স্বাস্থ্যের স্পন্দন উপভোগ করি।

লেখক : টেকসই উন্নয়ন কর্মী
[email protected]