Naya Diganta

ইসকন কি এখনো কৃষ্ণপ্রেম বিতরণেই আছে

বাংলাদেশের ২৪ অক্টোবর সকালটা শুরু হয়েছে আনন্দবাজারে প্রকাশিত ইসকন নিয়ে গুজবের গল্প পাঠ করে। মানে আবার সেই কোনো মিডিয়ার পেজ-বিক্রি, যেখানে এবারের মিডিয়া হলো আনন্দবাজার, আর পত্রিকার পাতার ক্রেতা হলো ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতের নামে বিশ্বাসযোগ্য নয় এমন গল্প ছড়ানো।

এবারের গল্পটা দেখে ২০১৪ সালের কথিত ‘বর্ধমানে জেএমবি বোমার গল্পটার’ কথা মনে পড়ে যেতে পারে অনেকের। তখন মোদি কেবল প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছেন, এর ছয় মাসের মধ্যকার গল্প। অভিযোগের ফোকাস ছিল, কথিত মমতা-জামায়াত-জেএমবি চক্র। আর ঘটনাস্থল সুনির্দিষ্ট বর্ধমান জেলা। অমিত শাহ খুঁটি গেড়ে কলকাতায় বসে গিয়েছেন। টার্গেট ২০১৬ কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে মমতার তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে ফেল বা পরাজিত করানো। তাই জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফেলা। এমনকি একপর্যায়ে কলকাতার সিপিএম দলও এই একই অভিযোগের বয়ানের সুরে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশ-জামায়াত-মুসলমান ও জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে কলকাতার ব্রিগেডের মাঠে জনসভায় বক্তৃতা করেছিল।

অভিযোগের প্রপাগান্ডা ডালি সাজিয়ে ভারতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রের খবর এটা। আবার পরে একই গুজব বাংলাদেশে প্রচার করা হয়েছিল ভারতের গোয়েন্দা সূত্রের খবর বলে। তাতে শামিল হয়েছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির [জনৈক অ্যাঙ্কর, যিনি এখন জার্মানিতে বসে সরকারের বিরুদ্ধে ভোকাল কাতরাচ্ছেন], চ্যানেল আই এমনকি প্রথম আলো ইত্যাদি অনেক মিডিয়া। এমনকি মোদির ভারতের নতুন সংসদে এ নিয়ে ঝড় তোলা, গায়ক নতুন প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়ের অভিযোগের ঝড় তোলা আর সর্বশেষ কলকাতায় অমিত শাহের জনসভায় মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আর আক্রমণের ডালি তুলে ধরা, সবই ঘটেছিল। কিন্তু এরপর হঠাৎ সব ফুস।

প্রধানমন্ত্রী মোদির অফিস বা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটা পারসোনাল বিভাগ বা বাংলায় আমরা বলি সরকারের প্রধান নির্বাহীর অফিসের ‘নিজস্ব বিভাগ’ আছে। আমাদের বেলায় এই বিভাগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে আর ভারতের বেলায় এর মাঝে আছেন এক প্রতিমন্ত্রী। স্মৃতি থেকে লিখছি, তাতে মনে হচ্ছে মোদির ওই প্রতিমন্ত্রীর নাম ছিল জিতেন্দ্র...। তাকে দিয়ে হঠাৎ এক বিবৃতির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যার সারকথা ছিল যে আপাতত ওই বর্ধমান মামলা স্থগিত রাখা হচ্ছে, আরো তদন্তের পরে ভবিষ্যতে এটা আবার দেখা যাবে। ইতোমধ্যে অমিত শাহ কলকাতা ত্যাগ করেন, বাবুল সুপ্রিয়ই সবচেয়ে বেকুব হয়েছিলেন। কারণ, তার ভুয়া অভিযোগ-আক্রমণই ছিল সবার শেষে মানে প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্রের ঘোষণা ঠিক আগে-পরেই। কিন্তু কেন হঠাৎ পশ্চাৎপসারণ? কারণ কোনো কারণে বিজেপি মমতার বিরুদ্ধে লড়বার নির্বাচনী কৌশল বদল করেছিল তাই। এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, পরবর্তীকালে ওই ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে মমতা আগেরবারের চেয়ে বেশি, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় দ্বিতীয়বার ফিরে এসেছিলেন। সেই ২০১৪ সাল থেকে আজো আর কখনো সেই জঙ্গিবাদের গল্প আর ঝাঁপি খোলেনি।

অতএব সাধু সাবধান। এসব পেজ বিক্রির আনন্দবাজারি গল্প আমাদের কাছে আবার আনা কি ঠিক হলো? এবারের ঘটনা ধর্মীয় সংগঠন ইসকনকে নিয়ে। অনুমান করি, বাংলাদেশে লিগ্যাল স্ট্যাটাসের দিক থেকে ইসকন এক বিদেশী এনজিও হিসেবে বাংলাদেশে তৎপর। আর বাংলাদেশের মাঠের বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সামাজিক-রাজনৈতিক জগতে ইসকন সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে, আধা সত্য-আধা গুজবে মাখামাখি এক খুবই খারাপ ইমেজ ধারণায় ভরপুর হয়ে উঠছে ক্রমাগত ও দ্রুতগতিতে। এটা খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় আছে, যা যেকোনো সামাজিক দাঙ্গা হিসেবে হাজির হওয়ার জন্য পটেনশিয়াল।

এই পটেনশিয়াল দিকটার কথা যদি মনে রাখি, তবে ভারতের বা কলকাতার এই গুজবের গল্প ছড়ানো খুবই অবিবেচক কাজ হয়েছে। অবশ্য যদি না ডেলিবারেট কোনো দাঙ্গা বাধানোর মধ্যে ভারতের কোনো খায়েশ আছে কি না, তাহলে অবশ্য ব্যাপারটা আলাদা।

ইসকন [ISKCON]
ইসকন নিজেদের ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সঙ্ঘ- এভাবে একটি হিন্দু বৈষ্ণবধর্মীয় প্রতিষ্ঠান’ বলে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত আমেরিকা ব্যক্তিবাদের ধারণাকে চরমতম অর্থের দিক থেকে নেয়ার কারণে সেখানে ব্যক্তিমাত্রই একা, এক সম্পর্কহীনতার অবস্থার দিকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হয়ে রয়ে যায় সবাই। কিন্তু স্বভাব হিসেবে মানুষমাত্রই রিলেটেড-সম্পর্কিত মানুষ তো বটেই, অন্ততপক্ষে এক জীবনসঙ্গীর ‘আকাক্সক্ষাসম্পন্ন’ মানুষ। ফলে মানুষ একা তো নয়ই, অন্তত দোকা এবং সামাজিক। তাই তার স্পিরিচুয়ালিটির আকাক্সক্ষা-চাহিদাও আছে। স্পিরিচুয়ালিটিই আসলে মানুষের নানান সম্পর্কের কামনার অর্থ তাৎপর্য ব্যাখ্যাও তুলে ধরে। এটা মানুষের ভেতরের প্রবৃত্তি ও স্বভাবে আছে, কিন্তু পশ্চিমা চরমব্যক্তিবাদের সমাজ সেই স্বভাব আকাক্সক্ষাকে চাপা দিয়ে রেখেছে। এই স্পিরিচুয়ালিটি বলতে তা সে দার্শনিক অর্থে স্পিরিট বা প্রজ্ঞা হোক অথবা থিওলজির অর্থে বা ভাষ্যে আত্মা-রুহু যে যাই আমরা বুঝি- শেষ বিচারে এটা মানুষের অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক করার আকাক্সক্ষা-চাহিদার সপক্ষেই দাঁড়িয়ে কথা বলে। বৃহত্তর অর্থে মানুষের পরমসত্তা অনুভবের দিক। মানুষ তাই রূহুর চাহিদায় সাড়া না দিয়ে পারে না। পশ্চিমের এই স্পিরিচুয়ালিটির আকাক্সক্ষা-চাহিদা এক বড় ভ্যাকুয়াম হয়ে আছে। তুলনায় এটাই এশিয়ান যেকোনো থিওলজির প্রভাব যথেষ্ট স্যাচুরেটেড বা পুষ্ট। অন্তত কোনো ভ্যাকুয়াম-শূন্যতা নেই। এখন এশিয়ান এই থিওলজিক্যাল পূর্ণতাকে এবার পশ্চিমের চাহিদার কথা খেয়াল করে এর উপস্থাপন ও ব্র্যান্ডিংয়ের হিসাবে, এক কৃষ্ণপ্রেম বিলিয়ে বেড়ানোর দিক থেকে ইসকন ভালো প্রভাব ছড়িয়ে আমেরিকায় নিজের যাত্রা শুরু বা ভিত গাড়তে পেরেছিল। আবার মানুষের সম্পর্ককে একটু ভিন্ন উপস্থাপনের দিক থেকে আর এক গুরু রজনীশও ভালোই আমেরিকান চাহিদা ধরতে পেরেছিল। এভাবে নানান উঠতি পড়তিতে ১৯৬৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠিত ইসকন আমেরিকাতে ভালোই চলছিল। তবে এগুলো সেকালে কোনোটাই ভারত-রাষ্ট্রের স্বার্থের কোনো রাজনৈতিক উপস্থাপন ছিল না। কিন্তু এই পরিস্থিতিটাই বদলে যায় ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেন হামলার পর থেকে। বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে। বুশের আমেরিকা তার ওয়ার অন টেররের পক্ষে এশিয়ার এক কুতুব হিসাবে ভারতের সমর্থন পেতে ভারতের সাথে পারস্পরিক স্বার্থের এক অ্যালায়েন্স গড়ে তুলেছিল।

বলা হয়ে থাকে, ১৯৮৭ সালের জম্মু ও কাশ্মিরের প্রাদেশিক নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ঘটানো থেকে এটা পরিণতিতে কাশ্মিরের রাজনীতিকে এর নির্বাচনী ধারা সমাজের আস্থা হারিয়ে একে সশস্ত্র রাজনৈতিক ধারার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ১৯৪৯ সাল থেকে বিভক্ত ও অমীমাংসিত কাশ্মির ইস্যু এমনই থেকে যাওয়া সত্ত্বেও এর রাজনীতি একটা নির্বাচনী ধারাতেই প্রবাহিত হয়েছিল, যেটা ১৯৮৭ সালের পরে কাশ্মিরে আর তেমন থাকেনি। আর সশস্ত্রতার রসদ তারা সংগ্রহ করেছিল সেকালে আফগানিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী আমেরিকা সমর্থিত লড়াকু মুজাহিদীনদের কাছ থেকে, পাকিস্তান হয়ে।

আর এ থেকে কাশ্মির পারস্পরিক খুনোখুনি রক্তারক্তির এক বাস্তবতায় ঢুকে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ঘটনা হলো, বড় সংখ্যায় কাশ্মিরি পণ্ডিতদের হত্যা করা হয়, পরিণতিতে তারা কাশ্মিরে নিজ ভিটা-সম্পত্তি ত্যাগ করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিজেপি নেতা বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রিত্বের আমল থেকে এরই পাল্টা সংগঠিত এক প্রপাগান্ডা শুরু হয়- ‘সীমা পাড় কা আতঙ্কবাদ’ বলে। অর্থাৎ কাশ্মিরের সমস্যার মূলে আছে আফগান বা পাকিস্তান থেকে আসা টেররিজম। মানে ভারতের রাষ্ট্র বা সরকারের দায়ে নয়, দায় হলো বাইরে থেকে আসা সশস্ত্রতার। কাশ্মির রাজনীতিকে নির্বাচনী কারচুপির দিকে ঠেলে দেয়া যে আত্মঘাতী ছিল, এটা যে মেসেজ দিয়েছিল কাশ্মিরে নির্বাচনী রাজনীতির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, ফলে সশস্ত্রতাই একমাত্র বিকল্প- এই ভাবনাই যে পরবর্তীকালে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল, তা কমবেশি সব পক্ষের কাছেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই মনমরা হিন্দুমনে ধীরে ধীরে পাল্টা নতুন মরাল জাগানোর কাজটাই করেছিলেন বাজপেয়ি এই বলে যে, সব দোষের গোড়া হলো, বাইরে মানে পাকিস্তান থেকে আসা সশস্ত্রতা।

তবু এ কথা বলাতেই শুরুতে তা তেমন পাত্তা পায়নি। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ভারতকে সাফার করতে হয়েছিল, কোনো গ্লোবাল বন্ধু-সাথী রাষ্ট্রকে পাশে পায়নি। মূল কারণ কাশ্মিরে পাওয়া সহজ হয়ে যাওয়া অস্ত্রের মূল উৎস তো আসলে আমেরিকার, আর এ ছাড়া স্বল্প কিছু ফেলে যাওয়া বা দখলি সোভিয়েত অস্ত্র। তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার, পরে আমেরিকার আফগানিস্তানকে বিশৃঙ্খলতায় ফেলে চলে যাওয়া, শেষে একমাত্র সংগঠিত শক্তি হিসেবে আফগানিস্তানে তালেবানদের আবির্ভাব, আমেরিকা তাদের সমর্থন করলেও ক্রাইসিস মেটেনি। কারণ, পরে তালেবানি শাসকেরা আলকায়েদার প্রভাবে চলে যাওয়া আর তা থেকে টুইন টাওয়ার হামলা- এই চক্র সমাপ্তি শেষ হতে দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। পরে বুশের ওয়ার অন টেরর প্রোগ্রামকে ভারত সমর্থন করে, কাশ্মিরি সশস্ত্রতা পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থানকে আমেরিকার সমর্থনের বিনিময়ে।

আর এখন থেকেই শুরু হয় শুধু প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে ভারতের লম্বা খাতির সম্পর্ক। শুধু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অফিস স্তরেই নয়, আমেরিকান এমপি (প্রতিনিধি পরিষদ) ও সিনেটেও ভারতের পক্ষে নিরন্তর লবি করার জন্য আমেরিকাতেই বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়দের সংগঠিতভাবে কাজে লাগানোর কিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। এই লক্ষ্যে ২০০৩ সালে জন্ম নেয় ‘আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশন’। যারা আমেরিকায় জন্ম নেয়া ভারতীয় বাবা-মার সেকেন্ড প্রজন্ম, যদিও তারা আমেরিকান নাগরিক, এরাই এর সদস্য। তারা গর্ব করে বলে আমরা ভারতীয় নই, আমেরিকান হিন্দু। কিন্তু বাস্তবে এরা ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার সংগঠন, ভারতীয় বিদেশনীতির বাস্তবায়ক। ১২০ মিলিয়ন ভারতের বাজারে ব্যবসা দেয়ার বিনিময়ে আমেরিকান ব্যক্তি ব্যবসায়ী আর এর সাথে এমপি ও সিনেটর মিলিয়ে এক চক্র যা লবি ও প্রেসার গ্রুপ, কোটারি গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিল। লবি ও প্রেসার গ্রুপ তৈরি আমেরিকায় বৈধ। তাই আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্রে রেখে এরা আরো সংগঠিত করেছিল এক এমপি, ভারতীয় নানান সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন [ইসকন যার মধ্যে একটা বিশেষ] বা প্রবাসী ভারতীয়-অরিজিন আমেরিকান ব্যক্তিত্বকে।

এতে স্বভাবতই আগের আমেরিকান ইসকন, আগের কৃষ্ণপ্রেম বিলানো ইসকন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের খাঁচায় বিরহ একাকিত্বে আটকে থাকা সাদা আমেরিকানদের মুক্ত করতে আসা ইসকন এমনকি তাই আগের নেতৃত্ব এক থাকেনি। সেই ইসকনের মৃত্যু হয়। ফোকাস বদলে যায়। নতুন ইসকন জন্ম নেয় যার কাজ ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার হওয়া। তাই এর তৎপরতার ক্ষেত্রে এখন আর পশ্চিমা দেশ থাকেনি, বাংলাদেশও। এ ছাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা ভৌগোলিক পকেটের হিন্দুদের উপস্থিতি থাকলেই তাদের ভারত রাষ্ট্র-সরকারের নীতি ও স্বার্থের পক্ষে জড়ো করা, হিন্দুত্ব জাগিয়ে তোলা, কমপক্ষে সহানুভূতিশীল করে তোলা- এসবই ইসকনের কাজ হয়ে ওঠে। আসলে ইসকনের বাংলাদেশে উপস্থিতিটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমেরিকায় গিয়ে ইসকনের জন্ম মূলত একাকিত্বের আমেরিকান সমাজের শূন্যতার হাহাকার পূরণে। তাহলে ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশ তার কাম্যভূমি হয়নি। ছিল না। বাংলাদেশ পশ্চিমা দেশ নয়, স্পিরিচুয়ালিটির ভ্যাকুয়ামও নেই। আমেরিকায় যে কারণে ইসকনের জন্ম, ঠিক সে কারণেই বাংলাদেশে একে দরকারই নেই। ইসকন ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার হিসেবে পুনর্গঠিত হওয়া থেকে বাংলাদেশে এর জন্ম দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব, ভারত সরকারের আমাদের সরকারের ওপর সবখানে প্রভাব বিস্তারের বিরোধী মনোভাব বাড়ছে, এ নিয়ে আমাদের সমাজের কোনো কোণে বা কোনো পক্ষের মধ্যে দ্বিমত পাওয়া যাবে না। তবে আবার দ্বিমত হবে এর মাত্রা নিয়ে। সরকারি পক্ষের হলে কেউ বলবেন ভারতের প্রভাব অনেক কম বা স্বাভাবিক। বিপরীতে অন্যরা বলবেন ভারতের প্রভাব চরম, সীমাহীন অসহ্য বা অনাকাক্সিক্ষত ইত্যাদি। আর এরই মধ্যে ইসকনের নাম ও এর বিরুদ্ধে অভিযোগ বিরূপ মনোভাব ক্ষোভ ক্রমেই চড়ছে। ইসকন সাধারণ্যে চোখে পড়া শুরু করে ২০১৬ সালে সিলেটের সঙ্ঘাত থেকে আর এ কালে চট্টগ্রাম শহরের সরকারি স্কুলগুলোতে ‘প্রসাদ খাইয়ে’ কৃষ্ণনাম গাওয়ার ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ হয়ে পড়া থেকে। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারী গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে সনদ প্রদান বা তারা ইসকনের সদস্য বলে প্রচার চলা থেকে। এগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই অনুমান করে বলা, আধা সত্য অথবা প্রপাগান্ডা বা একেবারেই গুজব হয়তো।

গুজবের আসল অর্থ হলো, সঠিক বিশ্বাসযোগ্য ও স্পষ্ট তথ্য সহজেই পাওয়া না যাওয়া বা চাইলেই পাওয়া যায় এমন করে রাখা হয়নি, এই পরিস্থিতি। তাই গুজব মোকাবেলার উপযুক্ত উপায় হচ্ছে, তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হয় এভাবে হাজির রাখা। সমাজের বিভ্রান্তি সম্পর্কে খবর রাখা আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে আগে গিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য হাজির রাখা। নিশ্চুপ থাকলে বা গুজবের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা গুজবের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা আরো বাড়তে পারে। কখনো তা ফেটে সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে।

বাংলাদেশে আইনে ইসকনের ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে অনুমোদন, বিদেশী অর্থ নিয়ে আসা ও বিতরণের অনুমোদন জোগাড় করা খুবই কঠিন। বিশেষ করে ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন অ্যাক্ট ২০১৬, যাতে বিদেশী স্বার্থ প্রতিফলিত হয় এমন তৎপরতার ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি থাকে সেজন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের আইন বিদেশী ধর্মীয় এনজিও প্রতিষ্ঠানের দেশে কোনো তৎপরতা চালানোর বিরুদ্ধে এভাবেই সাজানো। কারণ, তারা যেন কোনো ধর্মান্তকরণ বা ধর্মে প্রভাবিত করার কাজ না করতে পারে।

বাস্তবত ইসকন এখন কৃষ্ণপ্রেম বিলানোর চেয়ে ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বাস্তবায়নের পার্টনার। ওইদিকে সাধারণভাবে বললে কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো বিদেশী রাষ্ট্রে নিজ দেশের নীতি বা স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি পেতে বা চাইতেই পারে না। সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন নেয়া ছাড়াও বিদেশী অর্থ আনার অনুমোদনই পেতে পারে না। বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থ বলে কিছু নিয়ে তৎপরতা চালানো অথবা ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুনীতি নিয়ে তৎপরতা- এর কোনোটাই ইসকন বা কোনো এনজিওকে বাংলাদেশে করতেই দিতে পারে না। এটা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী হবে, তাই।
অথচ আনন্দবাজারের মাধ্যমে প্রস্তাব হলো, কথিত জঙ্গি হামলা হতে পারে এই অজুহাত তুলে যেন বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থে কাজ করতে তৎপর হয়। এতে বাংলাদেশের সরকারের কী হাল হবে? তার নিজের স্বার্থ কোথায় এতে?

আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের প্রথম কাজটি হলো নিজের হাত পরিষ্কার রাখা। সরকারকে নিজ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করা, না হতে দেয়া, যার গুজব ইতোমধ্যেই উঠেছে তা বিনাশ করা। গুজবের বিনাশ করতে যেটা করতে পারে যে ইসকন কী হিসেবে রেজিস্টার্ড তা পরিষ্কার ও সরাসরি জানাতে পারে। যেমন এটা কি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, না রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান? এ কাজটা সরকার নিজে অথবা কোনো বিশাসযোগ্য সামাজিক ব্যক্তিত্বের স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকাশ করতে পারে।

যেমন ইসকন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমতিপ্রাপ্ত হলে ‘প্রসাদ’ বিতরণ সে করতে পারে না, সেটা পুরোপুরি বেআইনি। ‘প্রসাদ’ বিলানো মানে যেটা ধর্মীয় এনজিও হিসেবে রেজিস্টার্ড (যে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার কথা নয়) কেবল সেই করতে পারে। ‘প্রসাদ’ বিলানো আর দুপুরের খাওয়ার প্যাকেট বিতরণ এক কাজ নয়। আবার যেমন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স নিয়ে এবং অর্থ ছাড় করে সেই টাকায় ইসকনের মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। এ বিষয়গুলো নিয়ে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ নিয়ে সরকারের কোনো দায় নেয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের আইন পারমিট না করলে সরকারের কিছুই করার নেই।

আবার শিক্ষকের ভাই ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারের পর দেখা যাচ্ছে সে ইসকনের সদস্য অথবা সরকারি কর্মচারী ইসকনের পদক মেডেল বা সংবর্ধনা নিয়েছে বা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এখন এই ইসকনের সদস্য হওয়া কী জিনিস? কোনো বিদেশী এনজিও এখানে কাউকে ধর্মীয় দল গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য বানানোর কার্যক্রম নিতে পারে না। এনজিও বলতে মূলত বস্তুগত জিনিসের দাতব্য হতে হবে। এটাই কাম্য।

কোনো ‘ভাব’ (ধর্মীয় বা রাজনীতির) প্রচার করতে অনুমতি দেয়া যায় না। তবে বড়জোর সেটা (ধর্মীয় নয়) সামাজিক সচেতনতা ধরনের কাজ যেমন অধিকারবিষয়ক, দক্ষতা শেখানো, স্বাস্থ্য বা পরিবেশবিষয়ক ইত্যাদি এ রকম হতে পারে। সরাসরি রাজনীতি অথবা ধর্ম প্রচার- এটা আমাদের এনজিও আইনে একেবারেই নিষিদ্ধ। আসলে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পরে কী কার্যক্রম নেবে এর বিস্তারিত বর্ণনা, কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় করবে ইত্যাদির হবু কার্যক্রমের বিস্তারিত সব কিছু আগেই এনজিও ব্যুরোতে জমা দিতে হয়। আর আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ তা সরেজমিন যাচাই করে তবেই সে বিদেশী এনজিও অর্থ ছাড়ের অনুমতি পায়। আর এর ব্যতিক্রম করলে সরাসরি রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ আইনে জেল-জরিমানার কথা লেখা থাকলে সেটিও প্রয়োগ হতে পারে।
একটা রাষ্ট্র-সরকার চালাতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে নরমে-গরমে অথবা বিশেষ খাতিরের অনেক রূপের সম্পর্ক রাখার দরকার হতে পারে। কিন্তু এসব ডিলিং বা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের যা প্রচলিত আইন তা প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকা বা আইন বাঁকা করে ফেলার তো দরকার নেই বা তা কাম্যও নয়। নিশ্চয়ই প্রতিবেশীরা যার যার দেশের আইনি সীমার কথা বুঝবে ও মান্য করবে। এনজিও প্রসঙ্গে আমাদের প্রচলিত আইন খুবই স্বচ্ছ। কাজেই রেকর্ড স্পষ্ট রেখে আর সেসব রেকর্ড পাবলিকের জন্য খুলে রাখা হলো সব কিছু জটিলতা থেকে পরিত্রাণ ও দূরে থাকার তা সবচেয়ে সহজ উপায়।
তথ্য স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য রাখার পরও কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উত্তেজনা বা বিভেদ তৈরি করার কেউ চেষ্টা করলে সরকারের তা মোকাবেলা সবচেয়ে সহজ হয়ে যায়। এ ছাড়া গুজব বিভ্রান্তি বা প্রপাগান্ডাও আসলে শুরু করাই কঠিন থাকে সে সমাজে। কাজেই স্বচ্ছতা সরকারের সবচেয়ে উপযুক্ত অস্ত্র।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]