Naya Diganta

শি’র ভারত সফর ও দক্ষিণ এশিয়া সমীকরণ

মোদি ও শি

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অনানুষ্ঠানিক ভারত সফর দেশটির দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্ক নিয়ে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারত সফরের আগের দিন সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে চীন পাকিস্তানকে তিন শ’ অত্যাধুনিক ট্যাংক সরবরাহ করছে। এর আগেই ইমরান খান বেইজিং সফরে গেলে দুই নেতার মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পাকিস্তানের কাশ্মির নীতির প্রতি শি তার দেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। ভারত সফর শেষ করে শি নেপাল যান। সেখানে বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতা হয়।
চীন ও ভারত দক্ষিণ এশিয়া ও সন্নিহিত অঞ্চলে দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। চীনের অর্থনীতি হলো দ্বিতীয় বৃহত্তর আর ভারতের অর্থনীতি আকারের দিক থেকে এখন পঞ্চম স্থানে। দুটি দেশেরই অর্থনীতির বিকাশ হার বেশ উঁচু। ধারণা করা হয় বর্তমান হারে বিকশিত হতে থাকলে চীন বৃহত্তম এবং ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে।

চীন ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত ও ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে। ভারত তিব্বতকে চীনের অংশ মনে করে না। অন্য দিকে, চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চীনকে কাশ্মিরের অংশ হিসেবে ভারত নিজের ভূখণ্ড মনে করে। অন্য দিকে, চীন ভারতের অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বত হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এটাকে চীনের অংশ মনে করে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধ হলে অরুণাচলের বেশ কিছু এলাকা চীন দখল করে নেয়। পরে অবশ্য সে দখল ছেড়ে দেয়।

চীন ও ভারতের মধ্যকার এই যুদ্ধের ছায়া দু’দেশের সম্পর্কের ওপর পড়লেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ বিরোধ তেমন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। চীন কৌশলগত সম্পর্ক ও সীমান্ত বিরোধকে ছাপিয়ে ভারতের ১২০ কোটি মানুষের বাজার ও বিনিয়োগ সুবিধাকে একদিকে কাজে লাগাতে চেয়েছে। অন্যদিকে ‘এশিয়া শতাব্দীর’ ধারণা সামনে রেখে বিরোধের বিষয়গুলোকে এক পাশে সরিয়ে রেখে ওই অঞ্চলকে আমেরিকার প্রভাবমুক্ত করে এশীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে বেইজিং।

এর অংশ হিসেবে রাশিয়া ও ভারতের সাথে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পাশ্চাত্য মিত্র শক্তি নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিপরীতে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উদ্যোগ নেয় চীন। এর অংশ হিসেবে বিকল্প বিশ্বব্যাংকখ্যাত ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ ও ‘এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে চীনের নেতৃত্বে। দু’টি প্রতিষ্ঠানেই ভারত থাকে প্রধান উদ্যোক্তা দেশগুলোর অন্যতম। মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ইউপিআই সরকার পর্যন্ত এই উদ্যোগ বেশ গতিশীলতার সাথে এগোতে থাকে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার গঠনের পর ভারত বেশ খানিকটা আগ্রাসীভাবে যুক্তরাষ্ট্রমুখী হয়ে পড়ে। আর পুরনো উদ্যোগ হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন।

মোদি সরকারের পররাষ্ট্র কৌশলে এ সময় চীন উন্নয়ন সহযোগী দেশের পরিবর্তে অনেকটাই বৈরী সম্পর্কের দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিসহ বেশ কিছু কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। যার অধীনে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া মিলে একটি প্রতিরক্ষা অক্ষ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। এই চার দেশের মধ্যে সহযোগিতার বলয় নির্মাণে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে চলে আসে চীন। এ সময় ভারতের ঐতিহ্যগত মিত্র রাশিয়ার সাথে সম্পর্কেও কিছুটা টানাপড়েন দেখা দেয়। যার ফলে পাকিস্তানের সাথে রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্কের সূচনা ঘটে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সদস্য হিসেবে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। চীনের পাশাপাশি রাশিয়ার প্রচেষ্টা থাকে ভারতকে মার্কিন বলয় থেকে এশীয় সহযোগিতা বলয়ে নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রধান স্বার্থ থাকে তার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বাজার অক্ষুণœ রাখা। আর চীনের দৃষ্টিভঙ্গি থাকে ভারতে পণ্যের বাজার ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রগুলো বহাল রাখা।

এর বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান ঠেকাতে প্রধান মিত্র হিসেবে পেতে চায় ভারতকে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ভারত ছিল সোভিয়েত বলয়ে। দেশটির নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেভাবে বিন্যস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী দেশগুলোর প্রযুক্তিমুখী করার উদ্যোগ নেয়। এতে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়া এবং পরমাণু প্রযুক্তি রফতানিকারক দেশগুলোর গ্রুপভুক্ত হওয়ার স্বপ্নও দিল্লির সামনে চলে আসে। মোদির সরকার ভারতীয়দের সামনে ধারণা দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও সহযোগী দেশগুলোর সহায়তায় এবং রাশিয়ার ইতিবাচক ও চীনকে নিরপেক্ষ অবস্থানে দিল্লি তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। এর কোনোটাই বাস্তবে অর্জিত হয়নি।

এ ব্যাপারে এক ধরনের মোহভঙ্গ হওয়ার পর মোদির বিজেপি সরকার একতরফা মার্কিন বলয়ে অবস্থানের নীতি থেকে সরে এসে কিছুটা ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পথে চলে আসে। রাশিয়ার সাথে এস৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্রয়সহ বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করে। চীনের সাথেও বিনিয়োগ সহযোগিতার পাওয়ার পুরনো পথে ফিরে আসে দিল্লি। চীনা পণ্য বর্জনের ব্যাপারে বিজেপির অঙ্গসংগঠনগুলো যে ডাক দেয় সেটিও স্থগিত করা হয়। এভাবে ডোকলাম সঙ্কটে চীন-ভারত যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল সেটিকে নমনীয় করে আনা হয়।

ডোকলাম সঙ্কটে চীনের সামরিক শক্তির মহড়া এবং কিছুটা অনমনীয় মনোভাবে ভারতীয় নেতাদের কাছে বার্তা পৌঁছায় যে শক্তি প্রদর্শনে বৃহৎ প্রতিবেশী এই দেশটি কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে নমনীয় হবে না। ডোকলাম সঙ্কটে যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তির সিদ্ধান্তের পেছনে একটি বড় কারণ কাজ করেছেÑ কোনো দেশই যুদ্ধে জড়ানোতে নিজেদের স্বার্থ দেখেনি। এই উত্তেজনায় ভারতের সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদের দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে চীন অর্থনৈতিক কারণে এ সময়ে কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায়নি।

নরেন্দ্র মোদি বা বিজেপির যে ‘ভারত ডকট্রিন’ রয়েছে সেটি হলো পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে তার একচ্ছত্র প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসা। যার চূড়ান্ত পরিণতি মনে করা হয় অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার মধ্যে। এই ডকট্রিনের অংশ হিসেবে ২০৩০ সাল নাগাদ আফগানিস্তান পাকিস্তান মালদ্বীপ শ্রীলঙ্কা নেপাল ভূটান থেকে মিয়ানমার বাংলাদেশ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় দিল্লি নিজের হাতে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের চাবিকাঠি এবং অর্থনৈতিক নিয়ামক শক্তিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে বাদ দেয়া হলে বাকি দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে দশককাল আগ পর্যন্ত বড় ধরনের বাধা ছিল না। কিন্তু ২০১০-এর দশকে এসে চীন দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশটির ২০২০ সাল থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠার যে লক্ষ্য রয়েছে সেটি অর্জনের পথে প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বশক্তিগুলো নানাভাবে বাধা তৈরির জন্য কাজ করতে থাকে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয় ভারতকে। চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে কেন্দ্রে রেখে যুক্তরাষ্ট্র জাপান অস্ট্রেলিয়া সমন্বয়ে যে নিরাপত্তা বলয় তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয় তাকে বেইজিং নিজের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা মনে করেছে। এটি চীনকে তার প্রতিবেশী অঞ্চলে বিশেষভাবে সক্রিয় হতে উৎসাহিত করেছে। এর বাইরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এশিয়াজুড়ে যে উচ্চাভিলাষী ‘রোড ও বেল্ট’ উদ্যোগ নিয়েছেন সেটির সাফল্যও অনেকখানি এই অঞ্চলের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে।

চীন দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে তার নীতিকে দু’ভাগে ভাগ করেছে। এর একটি হলো- কৌশলগত সমীকরণ। এই সমীকরণে দেশটির প্রধান তিন মিত্র হলো পাকিস্তান, মিয়ানমার ও নেপাল। পাকিস্তানের সাথে চীনের নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ যুক্ত থাকায় দেশটির সাথে রাজনৈতিক উত্থানপতন নির্বিশেষে কৌশলগত সম্পর্ক পঞ্চাশের দশক থেকেই চলে এসেছে। মিয়ানমার দীর্ঘকাল ধরে সামরিক স্বৈরাচারের অধীনে শাসিত হওয়ার কারণে যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছিল তার সুযোগ নিতে পেরেছে চীন। এখন মিয়ানমার তার নিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য চীনের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। নেপাল ৫০-এর দশকের শুরুতে ভারতের সাথে বিশেষ সহযোগিতা চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকে ভারতনির্ভর একটি দেশ ছিল। রাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে নানা ঘটনায় বিশেষত গণতান্ত্রিক সংবিধান তৈরির পর ভারতীয় অর্থনৈতিক অবরোধের পর চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণে অগ্রসর হয় নেপাল। বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির সরকার চীনের সাথে বিকল্প সড়ক ও রেল সংযোগ নির্মাণ থেকে শুরু করে ব্যাপক ভিত্তিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামোতে প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশের সরকার প্রধানের সর্বশেষ ভারত সফর ও এ সময় সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তির পর অধিকতর দিল্লি নির্ভর হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত চীন-ভারত সম্পর্কে একটি ভারসাম্য অনুসরণ করে আসছিল ঢাকা। এখন চীনা সহযোগিতা অনেকখানি স্থবির হয়ে পড়েছে। চীনা অর্থপুষ্ট প্রকল্পে টাকা ছাড় একপ্রকার বন্ধ হয়ে আছে। বাংলাদেশে যে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন অবশ্য আবার পুরনো ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে।

শ্রীলঙ্কা এখন এক ধরনের রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যে হওয়ার কথা। এর পর পরই হতে পারে সংসদ নির্বাচন। এসব নির্বাচনে চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো সুবিধাজনক এক অবস্থানে রয়েছে। দেশটিতে চীনের ব্যাপক ভিত্তিক বিনিয়োগের কারণে বেইজিংয়ের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসা কলম্বোর জন্য বেশ কঠিন। প্রায় একই রকম অবস্থা মালদ্বীপের। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে সেখানে ভারতপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসেছে বলে মনে করা হলেও নতুন সরকার চীন ও ভারতের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

আফগানিস্তানে নর্দার্ন এলায়েন্সের শাসনকালে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থায় ভারত ভালো প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়। দেশটিতে ব্যাপক বিনিয়োগও করেছে ভারত। এটি দিয়ে ভারত দু’দিক থেকে পাকিস্তানকে চেপে ধরার এক ধরনের কৌশল নিয়েছিল। বিশেষত, খাইবার পাখতুন খোয়া ও বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী উপকরণগুলো শক্তিশালী করা ও আত্মঘাতী তৎপরতার ক্ষেত্রে এটি ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল। এ কারণে তালেবানের সাথে শান্তি চুক্তি হওয়াটাকে ভারত কখনো ইতিবাচকভাবে দেখেনি। কিন্তু শান্তিচুক্তি সম্পাদনের বাইরে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার প্রত্যাহারের কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া, সেখানে চীন ও রাশিয়া বেশি জড়িত হয়ে পড়ার কারণে শান্তিচুক্তির বিকল্প থাকছে না ওয়াশিংটনের সামনে।

এই ধরনের একটি বাস্তবতার মধ্যেই মোদি সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থাসংবলিত সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫/এ অনুচ্ছেদ তুলে দিয়ে উপত্যকা রাজ্যটিকে কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ শাসনে নিয়ে আসে। এটিকে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের রাম রাজ্য ও অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার মতবাদের বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মনে করা হয়। এর মাধ্যমে একদিকে কাশ্মিরে হিন্দু পুনর্বাসনের মাধ্যমে জনবিন্যাস পরিবর্তন করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাল্টে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে মুসলিম নাগরিকদের মর্যাদা হিন্দুত্ববাদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের অনুগত করার প্রচেষ্টা রয়েছে। ভারতের যেসব পকেটে মুসলিম প্রভাব রয়েছে সেটিকে বিলুপ্ত করার একটি প্রয়াসও রয়েছে এখানে। এর ফলে ভারত রাষ্ট্রের স্থপতিদের মধ্যে যারা বহুত্ববাদিতার অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজকাঠামো চেয়েছিলেন সেটি আর থাকবে না। এর পরিবর্তে এক ধরনের কট্টর ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদ ভারতকে সামাজিকভাবে শাসন করতে থাকবে।

প্রশ্ন হলো- দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাব কোন মাত্রার পড়বে। এর দ্বারা চীনানীতি কোনোভাবে প্রভাবিত হবে কি না। এটি ঠিক যে, ভারতের নিরাপত্তা প্রস্তুতি চীনকে সামনে রেখে সৃষ্টি করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে চীন চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে না। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নিয়ন্ত্রণমূলক প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে চীনা প্রভাবকে প্রতিহত করতে হবে। এ কারণে ভারত নিজে দেশটিতে চীনা বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে গ্রহণ এবং চীনের নেতৃত্বাধীন নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অথবা এশীয় অবকাঠামো ব্যাংকের সহযোগী অংশীদার হলেও ক্ষুদ্র প্রতিবেশীরা চীনের সাথে সম্পর্ক নির্মাণ করুক তা চায় না। চীনা প্রভাব খর্ব করার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপ মুখ্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে দিল্লি বারবার সক্রিয়তাবাদী নীতি নিয়েও শুধু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে চীনকে উপেক্ষা করতে পারছে না। এ কারণে চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বা সহায়তা দিল্লিকে নিতে হচ্ছে। যদিও প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিকল্প হিসেবে জাপান ও বিশ্বব্যাংকমুখী করার প্রচেষ্টা নিচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য ভারত ও চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণের বাস্তবতা হলো- দিল্লি প্রতিবেশীদের ওপর সর্বতো নিয়ন্ত্রণ ও ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণ কামনা করে। অন্যদিকে চীন কেবল বাজার ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চায়। এ দুয়ের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে কম ক্ষতিকর বিকল্প গ্রহণ ও বৃহত্তর বিপর্যয় প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। আর প্রচেষ্টা নিতে হয় দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কে ভারসাম্য নির্মাণের। এ প্রচেষ্টায় জাতীয় স্বার্থ অনুকূল ভারসাম্য যে দেশ যতটা নিশ্চিত করতে পারবে সে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেয়ার সার্বভৌম অধিকার ততটা নিশ্চিন্ত হবে।

আরেকটি বাস্তবতাও সামনে রাখতে হবে যে, চীন বা ভারত তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থকে সামনে রেখে নিজ নিজ কৌশল ও নীতির বিন্যাস ঘটাবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিরাসক্তভাবে সেসব নীতির বিশ্লেষণ করে নিজের কৌশল সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আবেগ ও স্পর্শকাতরতার চেয়েও জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ ও অগ্রাধিকারগুলোকে মুখ্য বিবেচনা করতে হবে।

[email protected]