Naya Diganta

চা বাগানের ১৫ শতাংশ নারী শ্রমিক ভুগছে জরায়ুমুখের ক্যান্সারে

বাংলাদেশের চা শিল্পাঞ্চলে মোট ১৬৪টি চা বাগানে বসবাসরত প্রায় নয় লক্ষাধিক জনসংখ্যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারী। অর্থাৎ এ নয় লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লক্ষাধিক নারী শ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ নারী শ্রমিকের শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি জরায়ুমুখে ক্যান্সার রোগ। গবেষণামূলক সংস্থা সিআইপিআরবির এক জরিপ বলছে, চা শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ নারী প্রাথমিকভাবে জরায়ুমুখে ক্যান্সারে আক্রান্ত। এর সংখ্যা আনুমানিক ৬৮ থেকে ৭০ হাজার। তাদের সুচিকিৎসা হচ্ছে না। ফলে তারা ক্রমেই ধাবিত হচ্ছে মৃত্যুর দিকে।
চা শিল্পাঞ্চলে ১৬৪টি চা বাগানে নারী চা শ্রমিকরা অনেক সময় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যেতে পারে না। তারা গর্ভাবস্থায়ও চরম শারীরিক ঝুঁকি কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। কোনো কোনো সময় কাজের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষের চাপ থাকে। বিশেষ করে বেসরকারি বা দেশীয় মালিকানাধীন চা বাগানগুলোতে শ্রমিকের পরিমাণ অপর্যাপ্ত। ফলে ইচ্ছে করলেই ছুটি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। এছাড়া চা মওসুমে কোনো নারী শ্রমিক গর্ভবতী হয়ে পড়লে তার অবস্থা হয়ে দাঁড়ায় করুণ। গর্ভকালীন সময়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানা আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে পাতা তোলা, নার্সারিতে গাছের কলম তৈরি এবং চারা সংগ্রহের মতো কঠিন কাজ চালিয়ে যেতে হয়। কোনো কোনো সময় বাগান কর্তৃপক্ষ বিনা বেতনে ছুটি মঞ্জুর করলেও সংসারের অনটনে মজুরির আশায় গর্ভবতী নারী চা শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করছে। এতে গর্ভবতী মা ও গর্ভের সন্তান উভয়েরই ক্ষতি হচ্ছে।
আমাদের দেশের প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী প্রসূতি কল্যাণের অংশ হিসেবে একজন নারী শ্রমিককে প্রসবের আগের আট সপ্তাহ ও প্রসব পরবর্তী আট সপ্তাহ ছুটি দিতে হবে। কিন্তু চা শিল্পাঞ্চলে বাস্তবতা একবারেই ভিন্ন। চা বাগান কর্তৃপক্ষ দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি তোয়াক্কা করে না। নারী চা শ্রমিকদের বা বাগানের ডিসপেন্সারির পক্ষ থেকে বাগান কর্তৃপক্ষকে নারী চা শ্রমিকের গর্ভধারণের বিষয়টি জানালে গর্ভকালীন সর্বসাকল্যে ছয় সপ্তাহের ছুটি দিয়ে থাকেন কর্তৃপক্ষ। তাও ওই ছয় সপ্তাহের বেতন দেয়া হয় না গর্ভবতী মাকে। ফলে সংসারের অনটনে বাধ্য হয়ে গর্ভবতী মা প্রসব পূর্ব সে অবস্থায় চরম ঝুঁকি নিয়ে বাগানে কাজ চালিয়ে যায়। এ কারণে চরম ঝুঁকিতে নিপতিত অনেক গর্ভবতী মা অকালে মৃত্যুবরণও করে।
চা শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চা শ্রমিক মায়েদের অনেকের গর্ভবতী অবস্থায় চা বাগানে কাজ করতে গিয়ে গর্ভপাত হয়। কারণ অনেক নারী শ্রমিকই গর্ভধারণের পর থেকে সন্তান প্রসবের আগ পর্যন্ত ছুটি পায় না। মাত্র ছয় সপ্তাহের ছুটি মেলে তাও বেতনবিহীন। তাই গর্ভধারণের পর থেকে গর্ভের সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগ পর্যন্ত দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করে তারা। শ্রমিকরা বলে কাজে না গেলে না খেয়ে মরতে হবে তাদের।
শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগানের একজন নারী শ্রমিকের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘প্রায় ২২-২৩ বছর ধরে আমি চা বাগানে পাতা তোলার কাজ করছি। এ বাগানেই আমার বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর আমি পাঁচ সন্তানের মা হয়েছি। কোনো সন্তানের সময়ই আমি গর্ভকালীন কোনো ছুটি পাইনি। সন্তান প্রসবের পরে সন্তানের পাশে থাকাও আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সন্তান প্রসবের জন্য অল্প কিছু দিন ছুটি পেয়েছিলাম। এরপর সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানকে ঘরে রেখেই প্রসবের কিছু দিনের মধ্যেই আমাকে পাহাড়-টিলায় পাতি ছেঁড়ার কাজ শুরু করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের চা শিল্পাঞ্চলে বসবাসরত নারী চা শ্রমিকদের মধ্যে স্বাস্থ্যগত সচেতনতা নেই। এর জন্য দায়ী পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব। স্বাস্থ্যগত সচেতনতা না থাকার কারণে চা শিল্পাঞ্চলে নারী শ্রমিকদের শরীরে বাসা বাঁধে মরণব্যাধি জরায়ুমুখে ক্যান্সারসহ নানা রোগ। মাতৃত্বকালীন পরিচর্যার অভাব, মাসিককালীন অসচেতনতা ও সঙ্গমকালীন অজ্ঞতার কারণে অনেক শ্রমিক ধুঁকে ধুঁকে মরছে। তাদের নিয়ে কারো যেন কোনো মাথাব্যথা নেই। এমন মন্তব্য করলেন বিশিষ্ট গাইনিকোলজিস্ট ডাক্তার ফারজানা হক পর্ণা।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মাখন লাল কর্মকার চা শিল্পাঞ্চলের নারী শ্রমিকদের গর্ভকালীন সবেতনে ন্যূনতম ছয় মাসের ছুটির দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা চা বাগান মালিকদের অনুরোধ করেছি নারীদের গর্ভকালীন সবেতন ছুটি দিতে হবে। তাও ছুটি হতে হবে ন্যূনতম ছয় মাস। এখনো চা শিল্পাঞ্চলে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নেই। আমরা নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়ে আসছি দীর্ঘ দিন ধরে। কিন্তু মালিকপক্ষের উদাসীনতার কারণে আমাদের দাবিগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।