Naya Diganta

দারিদ্র্য বিমোচনের বিকল্প মডেল ‘সবুজ হাট প্রকল্প’

বাংলাদেশের মতো বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশে অনুন্নয়নের কারণ বা উৎস হচ্ছে এক নব্য দ্বৈতবাদ কাঠামোর উত্থান। যেখানে একদল নব্য এলিট বা অভিজাত গোষ্ঠী শিল্পোন্নত দেশগুলোর দাতাদের সাথে আঁতাত করে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বা উন্নয়নমুখী পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই দলটি পশ্চিমা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত, কিন্তু স্বদেশের তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি উদাসীন। দুঃখজনক হলো, এদের দৃষ্টিতে দারিদ্র্য হলো ব্যবসায়ের একটি উপকরণ। এর মাধ্যমে বিদেশী ঋণ, অনুদান ও মঞ্জুরি আনা যায়। আমাদের দেশে যে বিদেশী সাহায্য আসে তার বেশির ভাগ অনার্জিত আয়ে পরিণত হয়।

এই অনার্জিত আয় ব্যাপক দুর্নীতি ও রাজনীতির জন্ম দেয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশ নেয়ার পথে একটি বড় বাধা। বিদেশী মানসিকতার স্থানীয় এলিট বা বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিশ্রেণী, উভয়ের স্বার্থে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা জরুরি। বড় ধরনের সংস্কারমূলক যেকোনো কাঠামোগত পরিবর্তন এই বৈশ্বিক স্বার্থবাদীদের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে প্রকৃত গরিবদের উপযোগী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও আয় বৃদ্ধিমূলক সংস্থা গড়ে তোলা কঠিন। তা ছাড়া ব্যাপকভাবে গ্রাম থেকে শহরে সম্পদ স্থানান্তরের ফলে যে কাঠামোগত ক্রটি ও ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে, তা প্রচলিত কোনো উন্নয়নচিন্তা দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড উন্নয়নশীল বিশ্বে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সমস্যা দূর করতে পারেনি। তাই নতুন করে এ বিষয়ে ভাবার সময় এসেছে। প্রচলিত ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে নতুন শতাব্দীর আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য চাই বিকল্প চিন্তাধারা। চাই বিকল্প উন্নয়ন মডেল। এমন একটি বিকল্প উন্নয়ন মডেল হিসেবে ‘সবুজ হাট প্রকল্প’ উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলা হয়েছে। যৌক্তিক এবং সুচিন্তিত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই উন্নয়ন মডেল।

এটা আসলে একটি নতুন ধারার ব্যাংক ব্যবস্থা, যেখানে আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক ও স্বেচ্ছামূূলক ব্যাংক কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটেছে। এই ধারণায় উন্নয়নকে শহরমুখী না করে গ্রামমুখী করার কথা ভাবা হয়েছে। অর্থের প্রবাহ গ্রাম থেকে শহরমুখী না করে শহর থেকে গ্রামমুখী করার এই ভাবনা প্রচলিত উন্নয়ন ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো। আমাদের দেশে যে হাজার হাজার ওয়াকফ বা জনকল্যাণে দান করা সম্পত্তি অযতœ-অবহেলা ও অনুৎপাদনশীল অবস্থায় পড়ে আছে, সেগুলোকে উৎপাদনশীল ধারায় ফিরিয়ে আনাও এ প্রকল্পের লক্ষ্য। এতে যেমন সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে, তেমনি দেশীয় পুঁজি সমাবেশের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নের দুয়ার উন্মুক্ত হবে। একই সাথে বিদেশী সাহায্যনির্ভরতা কমবে।

যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই সবুজ হাট প্রকল্পের উদ্যোগ নিতে পারে। এই প্রকল্পের সাধারণ ধারণা হলো : দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে ১০ বা ১৫টি দোকান তৈরি করে একটি ছোট গ্রামীণ হাট বা বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে সে এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সূচনা করা। এই হাট স্থাপনের জন্য ওয়াকফ বা এ ধরনের সম্পত্তিকে অগ্রাধিকার দেয়া। ব্যাংকের একটি পল্লী শাখা, কমিউনিটি সেন্টার ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র হবে এই প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রামীণ পরিবারগুলোকে ঋণদান কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে এসে ও সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে সেই ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করবে এই সবুজ হাট উন্নয়ন মডেল।

একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে অবস্থিত একগুচ্ছ পরিবারকে ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির আওতায় আনার মাধ্যমে এই প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হবে। যারা এই ঋণদান কর্মসূচিতে সফল হবে বা যারা ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধিমূলক কাজ সৃষ্টি করতে পারবে, তারা হবে প্রথম প্রজন্মের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তাদেরকে সবুজ হাটে স্থাপিত দোকান ভাড়ায় বরাদ্দ দিয়ে আর্থিকভাবে আরো অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হবে। তাদের ব্যবসায় ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে সহায়তা করবে সবুজ হাট ব্যাংক। তারা ব্যাংকের ম্যানেজারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকবেন। গ্রামীণ জনগণের প্রয়োজন, চাহিদা, আয়, জীবিকা নির্বাহের উপায় ইত্যাদি বিবেচনা করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি হবে এসব দোকানে। এভাবে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নের চাকা ঘুরতে শুরু করবে এবং ক্রমে তা উপরের দিকে উঠে আসবে।

এই প্রকল্পে ব্যাংক কর্মকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক ও স্বেচ্ছামূলক খাতের সমন্বয় ঘটবে বলে দারিদ্র্যের ওপর আঘাতটিও হবে সমন্বিত। এর মাধ্যমে স্থানীয় সুপ্ত অর্থনৈতিক তৎপরতার বিকাশ ঘটবে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাস্তচ্যুতির ঘটনা কমে যাবে এবং প্রান্তিক চাষি ও অভিবাসী শ্রমিকের ভূমিহীন হওয়ার প্রবণতা কমবে।

এই প্রকল্পের সূচনা হবে ব্যাংক খাতের স্বেচ্ছাধীন খাত থেকে। এর সূচনায় থাকবে দৃঢ় সামাজিক ও নৈতিক অঙ্গীকার। পারিবারিক ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্র ঋণ ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান কর্মসূচির মাধ্যমে ক্রমেই তা অনানুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবসায়ের দিকে এগিয়ে যাবে। এই প্রকল্প বাজারবিমুখ ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ দেয়া হবে। ঔপনিবেশিক ধ্যানÑধারণার ওপর ভিত্তি করে আমাদের দেশে যে ব্যাংক কার্যক্রম চলছে, সেখানে গ্রাম থেকে আমানত সংগ্রহ করে তা শহুরে ধনীদের ব্যবসায় প্রসারের জন্য বিনিয়োগ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এ দেশের ব্যাংকগুলোর মোট তহবিলের ৬০ শতাংশ বিনিয়োগ হয় শুধু ঢাকা শহরে এবং আশপাশের এলাকায়। ২০ শতাংশ চট্টগ্রামে এবং বাকি ২০ শতাংশ সারা দেশে। সবুজ হাট প্রকল্পে উন্নয়নের এই ধারাকে বদলে দেয়ার কথা বলেছে। যেখানে বিনিয়োগ শুরু হবে গ্রাম থেকে এবং ক্রমেই তা শহরে এসে ঠেকবে। তখনই সত্যিকার অর্থে দারিদ্র্য বিমোচন হবে।

সবুজ হাট প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত ছয়টি ধাপ বা পর্যায় বিবেচনা করা হয়েছে -
প্রথম পর্যায়ে, প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা। ওয়াকফ সম্পত্তি চিহ্নিত করা, সম্পদ সমাবেশ ও পরিকল্পনা ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বাছাই।
দ্বিতীয় পর্যায়ে, স্বোচ্ছাধীন ব্যাংক খাত। ক্ষুদ্র ঋণ ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরুর জন্য সবুজ হাট কমপ্লেক্স নির্মাণ করা যায় এমন ওয়াকফ সম্পত্তি চিহ্নিত করা।

তৃতীয় পর্যায়ে, মাঠ জরিপ ও সামাজিক উদ্যোগ। তৃণমূল পর্যায় তথা ঘরে ঘরে গিয়ে জরিপ, অভ্যন্তরীণ আয়ের প্রকৃতি যাচাই ও ভোক্তা চাহিদা নির্ণয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য চিহ্নিতকরণ, পরিবারগুলোর পেশাগত প্রকৃতি ও তাদের কী ধরনের ঋণ প্রয়োজন তা চিহ্নিত করা। ব্যক্তি ও পারিবারিক গ্রুপ কাঠামো গঠনের প্রস্তুতির পাশাপাশি সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া শুরু।

চতুর্থ পর্যায়ে, ব্যাংকবহির্ভূত কার্যক্রম ও লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন। পুরোপুরি ব্যাংক কার্যক্রম শুরুর আগে সবুজ হাট কমপ্লেক্সটিকে সদর দফতর বা নিকটস্থ কোনো শাখার পরিচালনাধীনে ন্যস্ত করা। সুবিধাজনক স্থানে লিয়াজোঁ অফিস খোলা বা স্থানীয় প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া।
পঞ্চম পর্যায়ে, অনানুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবসায়। ব্যাংকের পল্লী শাখা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় ধরনের ব্যাংক কার্যক্রম চালাতে পারে।

ব্যাংক যেমন গ্রামের ধনীদের লাভজনক বিনিয়োগের পথ দেখাবে, তেমনি গরিবদের জন্যও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করবে। আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবসায় থেকে ফেরত আসা গ্রাহকদের যোগ্য করে গড়ে তুলবে অনানুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবসায়। ব্যাংকের কর্মকর্তারা গ্রাহকদের কাছে গিয়ে তাদের উদ্ধুদ্ধ করবে। ভবিষ্যতে যাতে তারা সঞ্চয়কারী বা বিনিয়োগকারীতে পরিণত হয় সে চেষ্টা চালাবে। এর ফলে শহরমুখী অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের প্রবণতা কমবে এবং পরিবারের গুণগত মানের উন্নয়ন ঘটবে। ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে যারা সাফল্যের পরিচয় দেবে তারা আরো উপরে ওঠার সুযোগ পাবে। সবুজ হাট কমপ্লেক্সে ভাড়ায় দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

শেষ পর্যায়ে, আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবসায়। সবুজ হাট কমপ্লেক্সের যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যবসায় সফল হবে, তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত করা হবে। এদেরকে লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ দেখাবে ব্যাংক।

বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা সবুজ হাট প্রকল্পগুলো আকারে একরকম না হলেও সেগুলোকে একটি চেইন মার্কেটের মতো বিবেচনা করা যায়। অকৃতগত ক্ষুদ্রতার কারণে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য সবুজ হাট প্রকল্পের ছোট ছোট বাজারগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্বেও কারণে একটি সবুজ হাট প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এর আওতায় ৩০-৪০ লাখ মানুষ চলে আসতে পারে। সবুজ হাট প্রকল্পের আওতাধীন এলাকার ভোক্তা প্রকৃতি হবে সমজাতিক। তাই এদের নিত্যব্যবহার্য দ্রব্য পাইকারি বাজার থেকে কিনে ভোক্তাদের কাছে ছাড় দামে বিক্রি করা যায়। একইভাবে স্থানীয়ভাবে ছাড় দামের ওষুধের দোকানও দেয়া যেতে পারে। মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদকদের ঋণ দিতে পারে সবুজ হাট ব্যাংক। কিছু কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য অংশগ্রহণমূলক অর্থায়নও করা যেতে পারে।

ক্ষুদ্র ঋণকে পরিবারের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া সবুজ হাট প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এই ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার করে গ্রহীতারা ক্রমে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন। এ প্রকল্পে কৃষি খাতে উদ্বৃত্ত শ্রম কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হবে। কৃষিভিত্তিক, কুটির বা ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নে ঋণ দেয়া হবে। এতে গ্রামীণ অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার মান যেমন উন্নত হবে, তেমনি গোটা গ্রাম একটি উৎপাদন ক্ষেত্র বা কারখানায় পরিণত হবে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যার দেশে গ্রামীণ জনগণের একটি বড় অংশ যদি কৃষিকাজ থেকে সরেও আসে, তারপরও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে না। এই বাড়তি শ্রমশক্তিকে উৎপাদনশীল অন্যান্য কাজে লাগানো যায়। ঘনবসতিপূর্ণ এবং শিক্ষার নিম্নহারসম্পন্ন দেশগুলোতে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে স্কুলচ্যুতির ঘটনা শুরু হয়। সবুজ হাট প্রকল্প চালুর পর যখন গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করবে এবং সব জনবল শ্রমক্ষেত্রের সাথে যুক্ত হবে, তখন অকালে স্কুল থেকে ঝরে পড়ার প্রক্রিয়া থেমে যাবে।

উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও নিম্ন উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড থেকে উচ্চ উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে শ্রমশক্তি স্থানান্তরের উপায় উদ্ভাবন অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রধান সমস্যা। এটা কৃষি ও কৃষিবহির্র্ভূত খাত নির্বিশেষে হতে পারে। এ সমস্যা সমাধানের অন্যতম উপায় হলো অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এর জন্য চাই উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তির দোরগোড়ায় উপযুক্ত ঋণ সুবিধা পৌঁছে দেয়া। তাই সবুজ হাট প্রকল্পের ঋণদান কর্মসূচি এমনভাবে প্রণয়ন করা হবে, যাতে কোনো গ্রাম বা গ্রামের একাংশ জনগণ তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী বা নতুন কোনো অর্থনৈতিক তৎপরতায় পেশাদারি দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এভাবে একটি গ্রাম এক দিকে যেমন কারখানায় পরিণত হবে, তেমনি হবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

সমাজের রূপ পাল্টে দেয়াই হলো এই প্রকল্পের চেতনা। তাই এখানে যেসব পণ্য বিক্রি হবে তার গায়ে শুধু মূল্যই লেখা থাকবে না, সেখানে সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক ও নৈতিক শিক্ষা সম্পর্কিত বক্তব্য উল্লেখ থাকতে পারে। বাজার অর্থনীতিতে পণ্যের গায়ে এর দাম ও বস্তুগত উপাদানের তালিকা উল্লেখ থাকে। সবুজ হাট প্রকল্পে ঋণের সাথে সামাজিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা থাকবে বিধায় পণ্যের গায়ে বস্তুগত উপাদান ও নৈতিক শিক্ষা দুটিই উল্লেখ থাকা বাঞ্ছনীয়। সমাজসচেতন কোনো বিক্রেতা বিক্রিত পণ্য থেকে লাভের একটি অংশ কোনো সামাজিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য আলাদা করে রাখতে পারেন।

এর মধ্য দিয়ে সমাজ কল্যাণের আরেকটি দিক উন্মোচিত হতে পারে। একজন উৎপাদকের এ ধরনের আচরণের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক পছন্দেও বিষয়গুলো প্রকাশ পেতে পারে। এটা তখনই হবে যখন কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান তার সামাজিক দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে এবং তার লাভের একটি অংশ সামাজিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য ব্যয় করবে। জনগণের মধ্যে সমাজ সচেতনতা যখন বাড়বে, তখন সে অন্য কোম্পানির একই পণ্য না কিনে এ কোম্পানির পণ্য কিনবে। ফলে সামাজিক খাতে অর্থ ব্যয়কারীর পণ্য বিক্রিও বাড়বে। সবুজ হাট প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলোÑ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও নৈতিক পছন্দের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদন ও ভোগের প্রক্রিয়াকে নীতি-নৈতিকতার সাথে যুক্ত করা। সবুজ হাট উৎপাদন ও ভোগ প্রক্রিয়াকে মানবিকীকরণ করবে।

বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে যাত্রা শুরু করেছে, তখন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উচিত হবে দারিদ্র্যকে টার্গেট করা। আর সেটা আমি করেছিলাম সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে থাকাকালে সবুজহাট প্রকল্পের ধারণা বাস্তবায়নের চেষ্টা করার মাধ্যমে। ব্যাংকের পঞ্চম বার্ষিক প্রতিবেদনে বিষয়টির বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। তখন হয়তো কোনো সঙ্গত কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এর অনুমতি পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখনো এই ধারণা বাস্তবে রূপ দিয়ে জনগণের মধ্য থেকে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্যের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানা যেতে পারে। এই ধারণা হতে পারে সোনার বাংলা গড়ার একটি বৈপ্লবিক হাতিয়ার।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড; সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক, জেদ্দা
[email protected]