Naya Diganta

শিশুর কাটা মস্তকের ঘটনায় স্তব্ধ নেত্রকোনা

শিশুর কাটা মস্তকসহ একজন ধরা পড়ার ঘটনায় গোটা নেত্রকোনা স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার এক শিশুর কাটা মস্তক ব্যাগে ভরে নিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়েছে এক যুবক। পরে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে সে। এ ঘটনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে নেত্রকোনার শিশু, নারী-পুরুষসহ সর্বস্থরের মানুষের মাঝে। আর এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠার জন্য শুক্রবার জুমা নামাজ শেষে মসজিদে মসজিদে মুনাজাত করা হয়।

পরে জানা যায় হতভাগ্য ওই শিশুটির নাম সজিব। তার বয়স ৭ বছর। এই ঘটনায় থানায় দুইটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একটি মামলা দায়ের করেন নিহত শিশু সজিবের বাবা রহিছ উদ্দিন। আর ঘাতক রবিন গণপিটুনিতে নিহত হওয়ায় পুলিশ বাদি হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিগের আসামি উল্লেখ করে অপর একটি মামলা দায়ের করে।

গত কিছুদিন ধরে ছেলেধরা, কল্লাকাটা আতঙ্কের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে একাধিক শিশুর নিঁখোজের ঘটনায় শহরে মাইকিংয়ের ঘটনায় সাধারন মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত ১২ জুলাই বিকেলে সদর উপজেলার বাংলা নামকস্থানে শান্তি ফিলিং স্টেশন এলাকায় অজ্ঞাত এক নারী পাশের এক বাড়ি থেকে এক কন্যা শিশুকে চুরি করে নিয়ে পালানোর সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে। গণপিটুনির এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। বিক্ষুদ্ধ জনতাকে শান্ত করতে পুলিশ আটক ওই নারীকে ‘পাগলী’ বলে জানায়।

এই ঘটনার রেশ না কাটতেই বৃহস্পতিবার শিশুর কাটা মস্তকসহ একজনের ধরা পড়ার খবরে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনার পর রক্তঝড়া শিশুর কাটা মস্তকের ছবি ও ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে পড়লে শিশুসহ নারী-পুরুষের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

একই দিন সদর উপজেলার বাংলায় অপর এক শিশুকে ছুড়ি দিয়ে গলা কাটার চেষ্টার ঘটনার কান্নারত ভিডিও ফুটেজ লোকজনকে আরো আতঙ্কিত করে তোলে। সন্ধ্যার পর পর ভয় ও আতঙ্কে শহর প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ে। উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় অনেকে বিনিদ্র রাত কাটান। যারা রাতে জ্বানালা খুলে ঘুমাতে যেতেন তারাও ভয়ে জ্বানালা বন্ধ রাখেন।

শুক্রবার নেত্রকোনা শহর ছিল কার্যত ফাঁকা। রাস্তায় কোন শিশুদের দেখা যায়নি। অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে এখন চরম আতঙ্কে সময় পার করছেন। পুলিশ ‘কল্লাকাটা’র বিষয়টি গুজব বললেও কোন কাথাই আর জনগন এখন আর বিশ্বাস করছে না।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী জানান, শিশু হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কতিপয় লোক ছেলে ধরা ও পদ্মা সেতুতে ছেলে শিশুদের মাথা দেয়ার কথা বলে যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা আদৌ সত্য নয়। নিতান্তই বিভ্রান্তিমূলক।

তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে এ ধরনের গুজব না ছড়ানোর জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানান। পাশাপাশি সকল অভিভাবকদেরকে আতঙ্কিত না হওয়ারও আহবান জানান। তবে কী কারনে কেন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়েছে তা এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানা তিনি। তবে বিষয়টি তদন্ত করে শীঘ্রই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হবে বলে সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেন।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে শহর এলাকার বারহাট্টা রোডস্থ শ্রমিক ইউনিয়ন সংলগ্ন মেথর পট্টিতে মদ্যপ অবস্থায় মাতলামি করার সময় অজ্ঞাত এক যুবকের ব্যাগ থেকে হঠাৎ একটি শিশুর সদ্য কাটা রক্তে রঞ্জিত মস্তক মাটিতে পড়ে যায়। এ সময় সেখানে উপস্থিত লোকজন তা দেখে ভয়ে আতকে উঠেন। এ সময় ঘাতক যুবক দৌঁড়ে পালানোর সময় নিকটবর্ত্তী নিউটাউন অনন্ত পুকুর পাড়ে পৌঁছলে জনতাও পেছন পেছন ধাওয়া করে ঘিরে ফেলে। এ সময় চরম উত্তেজিত জনতা লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞাত ওই ঘাতক যুবকে হত্যা করে। সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মডেল থানা পুলিশ শিশুর গলা কাটা মস্তক এবং অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার করে নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। এই সংবাদ ঝড়ের গতিতে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র, শিক্ষক অভিভাবকসহ সকলের মাঝে চরম আতঙ্ক শুরু হয়। শিশুর গলাকাটা মস্তক ও ঘাতকের লাশ দেখার জন্য পুকুর পাড়, থানা ও হাসপাতালে লোকজন প্রচণ্ড ভিড় জমাতে থাকেন। এ সময় উৎসুক জনতাকে সামাল দিতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা পুলিশের উপর চড়াও হয়।

শুক্রবার দিনভর এই নিয়ে সাধারনের মাঝে নানান ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। শান্তির শহর নেত্রকোনায় এই ধরনের অবিশ্বাস্য ও লোমহর্ষক ঘটনায় সাধারন লোকজন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েন। গলা কেটে শিশুকে হত্যা রহস্য উন্মোচিত না হওয়ায় এখন নানান ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ছে।