Naya Diganta
ধ্বংসের পথে নজরুল-নার্গিসের স্মৃতিচিহ্ন

কবিতীর্থ দৌলতপুরে দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা শুরু হচ্ছে আজ

ধ্বংসের পথে নজরুল-নার্গিসের স্মৃতিচিহ্ন
আলী আকবর খাঁ’র দ্বিতল বাড়ি, যেখানে নজরুল থাকতেন : নয়া দিগন্ত

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত কবিতীর্থ দৌলতপুরে কবির ১২০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারো দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা হাতে নেয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে গ্রামটিতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ, শুরু হয়েছে নজরুল গ্রামীণ মেলা। প্রথম দিনের কর্মসূচি হিসেবে আজ সকাল ১০টায় নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সঙ্গীত, হামদ-না’ত, গান, গজল, কবিতা আবৃত্তি ও নজরুল চেতনায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ রচনা প্রতিযোগিতা। কাল সকাল ১০টায় হবে ‘দৌলতপুরে নজরুল’ শীর্ষক আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আলহাজ ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন এমপি। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আজিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন উপজেলা চেয়ারম্যান আহসানুল আলম সরকার কিশোর। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিতু মরিয়ম।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিতু মরিয়ম জানান, জাতীয় কবির স্মৃতি রক্ষার্থে দৌলতপুরে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে। শুধু নজরুল জয়ন্তীতে নয়, সারা বছর ধরে যেন নজরুল চর্চা অব্যাহত থাকে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া নার্গিস-নজরুল বিদ্যানিকেতনের বিষয়ে আন্তরিকতার সাথে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। নজরুল আমাদের জাতীয় চেতনার উৎস এবং জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামসহ সব গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নজরুলের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়। নজরুলের মানবতাবোধ, প্রেম এবং দ্রোহ বর্তমান অস্থির সময়ে জাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে।
কুমিল্লার ৪ নম্বর বিচার আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট এইচ টি আহম্মেদ ফয়সাল কবি নজরুলের নামে দৌলতপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবি জানান। তিনি বলেন, আলী আকবর খানের সুনিপুণ কারুকাজে শোভিত দ্বিতল বাড়িটিকে জাদুঘর বানিয়ে কবিপতœী নার্গিসের ব্যবহার করা কাঠের সিন্দুক ও বাসরখাটটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তিনি আরো জানান, প্রতিবছর এখানে জেলা ও উপজেলাপর্যায়ের সাদামাটা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। আমরা কবিতীর্থ দৌলতপুরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদাপূর্ণ স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চাই।
কবিপতœী নার্গিসের বংশের উত্তরসূরি বাবলু আলী খান জানান, এ বাড়ির পুকুর ঘাটের আম গাছতলায় কবি দুপুরে শীতল পাটিতে বসে গান ও কবিতা লিখতেন। খান বাড়ির ছেলেমেয়েদের নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখাতেন। পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটতেন। শখ করে পুকুরে জাল আর পলো দিয়ে মাছ শিকার করতেন। কবির ওই স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখার জন্য দৌলতপুরে বানানো হয়েছে নজরুল মঞ্চ।
নজরুল-নার্গিস স্মৃতি সংরক্ষণ ফোরামের সভাপতি হুমায়ূন কবীর খান জানান, ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার দরিরামপুর গ্রামে কবির নামে অনেক কিছু হয়েছে। অথচ দৌলতপুরে কিছুই হলো না। কবি দুই মাস ১১ দিন দৌলতপুর ছিলেন। এখানে তিনি যৌবনে প্রেম ও বিয়ে করেছেন। অনেক কবিতা ও গান রচনা করেছেন। দৌলতপুরে কবির নামে বড় ধরনের স্থাপনা ও নজরুল চর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
নার্গিস-নজরুল শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক নুরুল ইসলাম মাস্টার জানান, নজরুল মঞ্চের মাঠটি কাদাযুক্ত থাকায় অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হয়। জরুরি ভিত্তিতে মাটি ভরাটসহ মাঠটির সংস্কার প্রয়োজন। মাঠে স্থায়ী শেড নির্মাণ করা দরকার। তা বাস্তবায়ন হলে নজরুলভক্তরা রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাবে। বিষয়টির দিকে নজর দেয়ার জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানান। কুমিল্লার কো¤পানীগঞ্জ-নবীনগর সড়ক ধরে আট কিলোমিটার সামনে এলেই কবিতীর্থ দৌলতপুর গ্রাম। এ গ্রামে ঢুকতেই হাতের ডান পাশে চোখে পড়বে নজরুল তোরণ। তোরণের দুই পাশে ইট-সিমেন্টের তৈরী কালো রঙের টুকরো টুকরো ব্লকে সাদা কালিতে লেখা কবির পঙ্ক্তিমালা। ওই পথ ধরে আধা কিলোমিটার ভেতরে গেলেই খান বাড়ি। যে বাড়িটিকে কেন্দ্র করে নজরুলময় হয়ে ওঠেন ভক্তরা। ওই বাড়ি আর গ্রাম দীর্ঘ দিন থেকে পরিচিত হয়ে ওঠে নজরুল-নার্গিসের গ্রাম হিসেবে। এখানে রয়েছে আলী আকবর খানের সুনিপুণ কারুকাজে শোভিত দ্বিতল বাড়ি। এ বাড়িতেই থাকতেন কবি নজরুল। দীর্ঘ দিন ধরে কোনো প্রকার সংস্কার না করায় বাড়িটির পলেস্তারা খসে পড়ছে। এ ভবনের পেছনে বাঁশঝাড় পার হলেই কবির বাসরঘর। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত কবির বাসরঘরটি আটচালা ছিল। পরে চৌচালা করা হলেও আয়তন ও ভিটির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। ওই ঘরেই ছিল নার্গিসের ব্যবহার করা কাঠের সিন্দুক। সিন্দুকটি বর্তমানে কোথায় আছে তা কেউ বলতে পারে না। এক সময় ওই ঘরে বাসর খাটটিও ছিল। সেটি পাশের একটি আধা পাকা ঘরে রাখা হয়েছে।
শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনুপম লীলাভূমি কবিতীর্থ দৌলতপুর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যে নান্দনিক মাত্রা দিয়েছে। এখানেই ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য’ এর ঝঙ্কার বেজেছিল নার্গিসের সুপ্ত ভালোবাসার সংস্পর্শে। এখানেই নার্গিসের ভালোবাসার আগুনের পরশমানিকের ছোঁয়ায় বেজেছিল নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’। ১৯২১ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বন্ধু আলী আকবর খানের সাথে দৌলতপুর গ্রামে আসেন। এখানকার সবুজ-শ্যামল পরিবেশ কবিকে দারুণভাবে আচ্ছন্ন করেছিল। এখানে কবি রচনা করেছেন ১২০টি কবিতা অসংখ্য গান ও ছড়া। কিন্তু সেই দৌলতপুর আজো অবহেলিত ও উপেক্ষিত। এখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে কবির নামে হয়নি কোনো প্রতিষ্ঠান। এমনকি ১৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত নার্গিস-নজরুল বিদ্যানিকেতন আজো এমপিওভুক্ত হয়নি।
অবহেলিতই থেকে গেল দামুড়হুদার নজরুল স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি
দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম পরপর দুইবার এসেছিলেন দামুড়হুদার কারপাসডাঙ্গা খ্রিষ্টান পল্লীতে। তৎকালীন জমিদার মহিম সরকারের আমন্ত্রণে এবং স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিতে ১৯২৬ ও ২৭ সালে তিনি সপরিবারে এখানে আসেন। এ সময় কবির সাথে ছিলেন স্ত্রী প্রমিলা, শাশুড়ি গিরিবালা ও শিশুপুত্র বুলবুল। কবি এখানে এসে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের মাটির তৈরি আটচালা ঘরে থাকতেন। যে ঘরটি আজো দাঁড়িয়ে আছে। রাতে সেই ঘরে বসে জমিদার মহিম সরকারের দুই মেয়ে শিউলি রানী সরকার ও আভারানী সরকারকে গান শেখাতেন এবং দিনের বেলায় স্বদেশী আন্দোলন নিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে আলোচনা করতেন। বিকেলে অবসর সময়ে কারপাসডাঙ্গার ভৈরব নদীর পাড়ে সিড়িতে বসে গান, গল্প, কবিতা ও নাটক লিখতেন। গল্প লিচুচোর, নাটক পদ্মাগোখরো, মৃত্যুক্ষুধা ও নজরুলের বিখ্যাত গান ‘আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী এ কোনো সোনার গায়’ সহ বেশ কিছু রচনা এখানে বসে করেছিলেন।
ভৈরব নদের সেই সিঁড়ি এখন ধ্বংসের পথে। বন জঙ্গলে ঢেকে রয়েছে। হয়তো আর কিছুদিন পর হারিয়েই যাবে। কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটিকে নজরুল নগর, নজরুল একাডেমি, নজরুল পর্যটনকেন্দ্র করার দাবি এলাকাবাসী ও নজরুলপ্রেমীদের দীর্ঘ দিনের। এলাকাবাসীর অভিযোগÑ প্রতিবছর ১১ জ্যৈষ্ঠ তারিখটি এলে ফুল দিয়ে নজরুল জন্মজয়ন্তী পালন ও নজরুলের কিছু গান করার পরেই সব শেষ হয়ে যায়।
নজরুল স্মৃতি সংসদের সভাপতি ও দর্শনা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ. গফুর মিয়া জানান, প্রতিবছরের মতো এবারো কারপাসডাঙ্গায় কবির জন্মবার্ষিকীতে হামদ, নাত, গজল ও পুষ্পমাল্য অর্পণ এবং আলোচনার মধ্যে দিয়ে নজরুল জন্মজয়ন্তী পালন করা হবে এবং রোজার পরে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে।