Naya Diganta

শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা

দেশে অপরাধপ্রবণতা, অনিয়ম, লাগামহীন দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা যেভাবে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে তাতে রাষ্ট্রের ক্রিয়াশীলতা, কার্যকারিতা ও উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ ক্রমেই বাড়ছে। সারা দেশে ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতার সাথে সাথে নারী নিগ্রহ ও ধর্ষণের মহোৎসব চলছে। এই নিগ্রহ ও ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না অবুঝ শিশুরাও। যাদের নারীত্বের প্রকাশ বা বিকাশই ঘটেনি তাদের সাথেও মধ্যযুগীয় কায়দায় নারকীয় ও বীভৎস পৈশাচিকতা আত্মসচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।
সচরাচর ১৮ বছরের কম বয়সী ছেলে বা মেয়ে শিশু হিসেবে চিহ্নিত। প্রত্যেক জাতিরাষ্ট্রে শিশুদের অধিকারগুলো অধিকতর গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। জাতিসঙ্ঘেরও শিশু অধিকার সনদ রয়েছে। আমাদের দেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের সংবিধানে শিশু অধিকারবিষয়ক অনুচ্ছেদ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ খুবই গৌণ। বস্তুত, শিক্ষার সুযোগ লাভ করা শিশুর অন্যতম মৌলিক অধিকার। বেশির ভাগ দেশেই সামাজিক দায়দায়িত্বের অংশরূপে এবং অভিভাবকের দিকনির্দেশনায় কিংবা রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক শিক্ষানীতির আলোকে শিশুরা বিদ্যালয়ে গমন করে। কিন্তু অনুন্নত দেশে মাঝে মাঝে কিংবা প্রায়ই বাবা-মার সাথে শ্রমকার্যে অংশগ্রহণ করে অর্থ উপার্জনে জড়িয়ে পড়তে হয় শিশুদের। তার সাথে যুক্ত হয়েছে আমাদের দেশে লাগামহীন শিশু ধর্ষণের ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে এ অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি ‘শিশু অধিকার সুরক্ষা ও অগ্রগতি শীর্ষক’ সেমিনারে জানানো হয় যে, গত সাড়ে ৪ মাসে ৩৪৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়। প্রতিবন্ধী শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২২টি এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৮টি। ১০ শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর আত্মহত্যাও করেছে। এ ছাড়া ৩৮ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ১৫টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে দেয়া তথ্যে আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রের এমন ভয়াবহ চিত্রই উন্মোচন হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলন্ত বাসে নারী ধর্ষণের ঘটনা আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে জেনেছি। কিন্তু সে ঘটনাকে ম্লান করে দিয়েছে আমাদের দেশে সংঘটিত বীভৎসতা। চলন্ত বাসে নারী ধর্ষণের পর নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে আমাদের দেশে। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে যৌন নিগ্রহ ও পরে পুড়িয়ে মারার ঘটনার রেকর্ডও এখন আমাদের করায়ত্তে। দেশে দুর্নীতি সর্বাগ্রাসী রূপ নেয়ার প্রেক্ষাপটে খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, দেশে দুর্নীতি দমন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের সাগরচুরিবিষয়ক প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে। সে প্রকল্পে বালিশ ও এর বহন খরচ নিয়ে যে তেলেসমাতির খবর পাওয়া গেছে তা আমাদের অবক্ষয় ও দৈন্যদশার স্বরূপ উন্মোচন করেছে।
সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতনবিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪৪১। এর মধ্যে হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনাই সবচেয়ে বেশি। ২০১৮ সালে প্রকাশিত তথ্য মতে, নারী ও শিশু হত্যার বিচার হয়েছে মাত্র ৪১টি ও ধর্ষণের বিচার হয়েছে মাত্র ১৮টি। সংঘটিত হত্যা ও ধর্ষণের তুলনায় বিচারপ্রাপ্তির হার হতাশাব্যঞ্জক। শাস্তির ধরনও রীতিমতো প্রতীকীই বলা যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরাধপ্রবণতাসহ নারী ও শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেলেও এসব অপরাধের প্রতিবিধানে রাষ্ট্র ও সরকার সফলতা দেখাতে পারেনি বলেই জোরালো অভিযোগ রয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, নির্যাতন রোধে বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী ও নারীবান্ধব করার তাগিদ এলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবের কারণে পুলিশ ধর্ষণসহ অপরাধের আলামত নষ্ট করে, চিকিৎসক ভুল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেন, জনপ্রতিনিধিরা অনেক-সময় নির্যাতিতদের ভয়ভীতি দেখান। বর্তমান সরকার দুর্নীতি ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধেও জিরো টলারেন্স অবস্থান দাবি করে আসছে। বাস্তবে তার প্রতিফলনটা খুবই গৌণ।
সম্প্রতি বাংলাদেশের ছয়টি জাতীয় দৈনিকের শিশুবিষয়ক সংবাদগুলো পর্যালোচনা করে ২০১৮ সালের বাংলাদেশের শিশু পরিস্থিতির একটি চিত্র তৈরি করেছে একটি বেসরকারি সংস্থা। বছর শেষে পুরো বছরের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ বলছে, ২০১৮ সালে শিশুদের নিয়ে ১,০৩৭টি ইতিবাচক সংবাদের বিপরীতে নেতিবাচক সংবাদ ছিল ২,৯৭৩টি।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে মোট ২৭৬টি শিশু হত্যা ও হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ২২৭ জন। এসব ঘটনার কারণ হিসেবে যেগুলো উঠে এসেছে তার মধ্যে আছেÑ পারিবারিক কলহ, সম্পদের জন্য, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে, চাঁদা না দেয়া, মেয়ে হয়ে জন্মানোসহ বিভিন্ন কারণ। মূলত আমরা আমাদের কন্যা, জায়া ও জননীদের নিরাপত্তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছি। সংবাদপত্রে নারী ও শিশু নির্যাতনবিষয়ক যেসব সংবাদ প্রকাশ হয় প্রকৃত ঘটনা তার চেয়েও অনেক বেশি বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু এগুলো জানা যায় না, কারণ মানুষ সহজে মামলা করে না কিংবা পুলিশের কাছে যায় না। অপরাধীরা মনে করে না যে তাদের শাস্তি হবে। ফলে এখন নারী ও শিশু নির্যাতন প্রায় অপ্রতিরোধ্যই হয়ে উঠেছে বলা যায়। মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই আমাদের দেশের নারী ও শিশু নিগ্রহসহ অপরাধপ্রবণতা ক্রমবর্ধমান। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দোষী ব্যক্তির শাস্তি নিয়ে আস্থা নেই মানুষের। বিচারহীনতা বা দায়মুক্তির সংস্কৃতি এর বড় কারণ। মূল্যবোধের অবক্ষয় আমাদের একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরেছে। আর আমরা এই অশুভ বৃত্ত থেকে কোনোভাবেই বেরিয়ে আসতে পারছি না।
ঐতিহাসিকভাবেই নারীর পথচলা সব সময়ই ছিল সমস্যাসঙ্কুল। এই সমস্যা সমাধানে কাজ হয়েছে দেশে দেশে। কিন্তু আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি বরং গোটা বিশ্বেই নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। সম্প্রতি তার সাথে যুক্ত হয়েছে শিশু ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা। আমাদের দেশে এই প্রবণতাটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু রাষ্ট্র শিশুদের জানমাল ও সম্ভ্রম রক্ষার দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
[email protected]