Naya Diganta

ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি বনাম প্রিজনারস ডকুমেন্ট

ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি বনাম প্রিজনারস ডকুমেন্ট

গত ২৭-২৯ এপ্রিল ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন প্যালেস্টাইন’। তিন দিনের এই সম্মেলনে তুরস্ক ও তুরস্কের বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে অংশ নেন অনেক বক্তা, শত শত শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সক্রিয়বাদী ও শিক্ষার্থী। এ সম্মেলনটি ছিল ফিলিস্তিন সমস্যা নিয়ে নানা মতবাদ ও বিতর্ক সম্মিলনের এক অনন্য বিরল সুযোগ। এ সম্মেলনটি ছিল ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনাকে এগিয়ে নেয়ার এক প্রয়াস।

সম্মেলনে প্রায় ঐকমত্যে পৌঁছা গেছে : ইসরাইলবিরোধী ‘বয়কট, ডিভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাঙ্কশন’ (বিডিএস) মুভমেন্টের প্রতি অবশ্যই পরিপূর্ণ সমর্থন জানাতে হবে, যাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’কে অবশ্যই পরাজিত করা যায় এবং এ চুক্তির মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণের নামে ফিলিস্তিনিদের ধ্বংসের অপচেষ্টা পরিহার করা যায়। যখন এই সম্মেলনে ফিলিস্তিনি সংগ্রামের লক্ষ্য নির্ধারণের প্রশ্ন আসে, তখন এ সম্পর্কিত বর্ণনায় কিছু সিদ্ধান্তহীনতা ও অস্পষ্টতা লক্ষ করা গেছে। যদিও সম্মেলনে কোনো বক্তাই ‘টু-স্টেট সলিউশন’-এর বিষয়টি সামনে আনেননি, তবে তাদের সবাই ইস্তাম্বুলের এই সম্মেলন থেকে আহ্বান জানিয়েছেন একটি গণতান্ত্রিক ধরনের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে। এর একটি কারণ হতে পারে, বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিন-বান্ধব আন্দোলনগুলোর এক-রাষ্ট্রিক সলিউশনগুলোর লক্ষ্যের সাথে মিলে যাওয়া দরকার বলে তারা মনে করছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের আহ্বান আসা দরকার ফিলিস্তিনি নেতাদের কাছ থেকেও, কেননা এটি হচ্ছে বর্তমানে ফিলিস্তিনি জনগণের সত্যিকারের প্রত্যাশা।

একের পর এক বক্তা সম্মেলনে কাকুতি-মিনতি করে আহ্বান জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনি জনগণের ঐক্য গড়ে তোলার জন্য। তাদেরকে আহ্বান জানানো হয়েছে ফিলিস্তিনিদের ন্যাশনাল ডিসকোর্স নির্ধারণে সারগর্ভ বক্তব্য রাখার জন্য। সম্মেলনের অনেক শ্রোতাই বক্তাদের বক্তব্যের সাথে সহমত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু শোতাদের মধ্যে একজন অনেকটা হঠাৎ করেই বোকার মতো একটি প্রশ্নটি রেখে বলেন : ‘ডযবৎব রং ঃযব চধষবংঃরহরধহ গধহফবষধ?’ সুখের কথা নেলসন ম্যান্ডেলার গ্র্যান্ডসন তবিষরাবষরষব ‘গধহফষধ’ গধহফবষধ নিজেও সেখানে ছিলেন একজন বক্তা। তিনি বাধ্য হয়ে উত্তর দেন : গধহফবষধ ধিং ড়হষু ঃযব ভধপব ড়ভ ঃযব সড়াবসবহঃ, যিরপয বহপড়সঢ়ধংংবফ সরষষরড়হং ড়ভ ড়ৎফরহধৎু সবহ ধহফ ড়িসবহ, যিড়ংব ংঃৎঁমমষবং ধহফ ংধপৎরভরপবং ঁষঃরসধঃবষু ফবভবধঃবফ ধঢ়ধৎঃযবরফ। তার উত্তরের সারকথা হচ্ছেÑ ম্যান্ডেলা ছিলেন আন্দোলনের চেহারা মাত্র। আর এ আন্দোলনের চারপাশ ঘিরে ছিল লাখ লাখ সাধারণ নারী-পুরুষ, যাদের আন্দোলন-সংগ্রাম চূড়ান্ত পর্যায়ে পরাজিত করেছিল বর্ণবাদকে। সন্দেহ নেই, তার এই বক্তব্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলসূত্র। এর সারকথা হচ্ছে, নেতারা নয়, ফিলিস্তিনি জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই পারে তাদের স্বাধীন সত্তা প্রতিষ্ঠা করতে। বিচ্ছিন্নতা কোনো সমাধান সূত্র নয়।

সে সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলন ড. রামজি বারোদও। আমাদের অনেকের জানা, তিনি একজন সাংবাদিক, গ্রন্থ প্রণেতা ও ‘প্যালেস্টাইন ক্রনিকল’-এর সম্পাদক। তার লেখা সর্বশেষ বই হচ্ছে : ঞযব খধংঃ ঊধৎঃয : অ চধষবংঃরহরধহ ঝঃড়ৎু’ (চষঁঃড় চৎবংং, খড়হফড়হ)। তিনি প্যালেস্টাইন স্টাডিজের ওপর পিএইচডি করেছেন ‘ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটার’ থেকে। তিনি আবার শান্তা বারবারার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অরফেলিয়া সেন্টার ফর গ্লোবাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর একজন নন-রেসিডেন্ট স্কলারও। তিনি এই সম্মেলনে বক্তব্য রাখার পর কথা বলেছেন এমন অনেকের সাথে, যারা ফিলিস্তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেছেন। তিনি তাদের সাথে কথা বলেছেন তার প্রকাশিতব্য একটি বইয়ের মাল-মসলা জোগাড় করার অংশ হিসেবে। এসব কারামুক্ত বন্দীর মধ্যে কেউ কেউ চিহ্নিত হামাস হিসেবে, আবার কেউ কেউ চিহ্নিত ফাতাহ হিসেবে। রামজি বারোদ তাদের সাথে আলাপ করে যা জানতে পারলেন তা হলো- তাদের বক্তব্য ছিল বিবদমান ফিলিস্তিনি বিভিন্ন পক্ষকে পরস্পরের ওপর কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে মুক্ত হতে হবে। যেমনটি আমরা গণমাধ্যমে প্রায়ই দেখতে পাই, তা থেকে আলাদা ছিল এদের বক্তব্য। তাদের বক্তব্যের সাথে মিল ছিল না, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের বক্তব্যের। একজন করামুক্ত হামাস সদস্য রামজি বারোদের কাছে বলেন, ‘যখন ইসরাইল গাজা দখলে নিলো এবং আমাদের স্বজনদের সাথে দেখা করতে দিতে অস্বীকৃতি জানাল, তখন ফাতাহ ভাইয়েরা সব সময় কাজ করেছেন আমাদের সহায়তায়। আর যখন ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষ ফাতাহসহ আমাদের যেকোনো ফ্যাকশনের যেকোনো ভাইয়ের সাথে খারাপ আচরণ করেছে, আমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি একসাথে মিলে।’ আরেকজন কারামুক্ত ফাতাহ সদস্য রামজি বারোদকে জানান, ‘যখন ২০০৭ সালের গ্রীষ্মে হামাস ও ফাতাহ গাজায় যুদ্ধরত ছিল, তখন কারাবন্দীদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। আমাদের এই দুর্ভোগের কারণ, আমরা অনুভব করেছিলাম, যেখানে লড়াই করা উচিত আমাদের স্বাধীনতার জন্য, সেখানে আমরা নিজেরা লড়াই করছি একে অপরের বিরুদ্ধে। এর মাধ্যমে একে অপরকে প্রতারিত করেছি। আমাদের প্রতি এটি ছিল বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণা।’

তখন অনৈক্যকে কার্যকর রাখার জন্য ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ হামাস ও ফাতাহর কারাবন্দীদের আলাদা আলাদা কারাগারে কিংবা আলাদ আলাদা ওয়ার্ডে রাখতে শুরু করে। এরা সক্রিয় ছিল বন্দীদের নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ চরম খারাপ অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। ইসরাইলিরা সতর্ক ছিল, যাতে বন্দীরা জাতীয় ঐক্যের কোনো অভিন্ন ক্ষেত্র বা সূত্র খুঁজে না পায়। ইসরাইলিদের এই সিদ্ধান্ত এলোপাতাড়ি কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। এর এক বছর আগে ২০০৬ সালের মে মাসে বন্দী নেতারা একটি প্রিজন সেলে মিলিত হন ফিলিস্তিনি প্রশাসন ও ফাতাহর মূল দলের মধ্যকার দ্বন্দ্বের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য। তখন হামাস অধিকৃত ভূখণ্ডের লেজিসলেটিভ ইলেকশনে জয়লাভ করে। বৈঠকে হাজির নেতাদের মধ্যে ছিলেন : ফাতাহর মারওয়ান বারঘুতি, হামাসের আবদুল খালেক আল-নাটশে এবং ফিলিস্তিনি প্রধান প্রধান গ্রুপের প্রতিনিধিরা। এই বৈঠকের ফলাফল ছিল ‘ন্যাশনাল কনসিলিয়েশন ডকুমেন্ট’। যুক্তির দিক থেকে মানতে হয়, এটি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি পরিচিতি পায় ‘প্রিজনারস ডকুমেন্ট’ নামে। এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ কারণে যে, কোনো আরব দেশের রাজধানীর কোনো বিলাসবহুল হোটেলে অনুষ্ঠিত নিজেদের স্বার্থ আদায়ের কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল না এটি; বরং এর বদলে এটি ছিল ফিলিস্তিনিদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণীত একটি খাঁটি দলিল। আর দলিলটি প্রণীত হয় ফিলিস্তিনি সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় নেতাদের প্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়ে।

ইসরাইল তাৎক্ষণিকভাবে দলিলটির নিন্দা জানায়। এই ডকুমেন্টকে ঘিরে থাকা ফিলিস্তিনিদের বিবদমান বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সংলাপে সংশ্লিষ্ট করার পরিবর্তে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বিরোধী পক্ষগুলোর প্রতি আলটিমেটাম দিয়ে বলেন, হয় ডকুমেন্টটিকে পরিপূর্ণ সমর্থন দিতে হবে, নয়তো তা প্রত্যাখ্যান করত হবে। কারাবন্দীদের এই ডকুমেন্টের উদ্যোগের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণাপূর্ণ আচরণ করেন মাহমুদ আব্বাস ও বিবদমান গোষ্ঠীগুলো। পরিণামে, পরের বছর গাজায় ফাতাহ ও হামাস পরস্পরবিরোধী লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে তাদের নিজেদের কৌশল অবলম্বন করে।

লেখার শুরুতেই উল্লিখিত সম্মেলনে শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সক্রিয়বাদীদের বক্তব্য শোনার পর কারামুক্ত বন্দীদের সাথে কথা বলে সাংবাদিক রামজি বারোদ একটি বিষয় বুঝতে সক্ষম হন, তৃণমূলের ফিলিস্তিনিদের বক্তব্য ও বাইরের লোকদের বক্তব্যের মধ্যে একটি সংযোগহীনতা বা বিচ্ছিন্নতা বিদ্যমান। কারাবন্দীরা তাদের বক্তব্যে ঐক্যের বিষয়টি প্রকাশ করে। তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ আন্দোলনের পক্ষে। অপর দিকে এরা নিজেদের চিহ্নিত করে কোনো-না-কোনো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে। এরপর রামজি বারোদ সাক্ষাৎকার নেন এমন একজন বন্দীর, বিনি গোষ্ঠীগত স্বার্থকে স্থান দেন জাতীয় স্বার্থের ওপরে। এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই।

ফিলিস্তিনিদের অনৈক্য ও অক্ষমতার বিষয়টি পুরোপুরি ইসরাইলদের উদ্ভাবন, যার সূচনা হয়েছিল হামাসের সৃষ্টির আগেই এবং এমনকি ফাতাহ সৃষ্টিরও আগে। এই জায়নবাদী নোশনটি আলিঙ্গন করেছিলেন বর্তমান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার অভিমত ছিল : ‘ওংৎধবষ যধং হড় ঢ়বধপব ঢ়ধৎঃহবৎ’। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ রামাল্লায় রক্তক্ষরণের মতো ছাড় দিলেও নেতানিয়াহুর এই দাবি আজকের দিনের ইসরাইলি রাজনীতিতে স্থায়ী উপাদান হিসেবেই রয়ে গেছে। রাজনৈতিক ঐক্য একপাশে সরিয়ে রাখলেও ফিলিস্তিনি জনগণ ঐক্য উপলব্ধি করে ইসরাইল থেকে ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে। সত্যি বলতে কি, ফিলিস্তিনের বাইরেও আমাদের অনেকেই এই ঐক্য অনুভব করেন।

‘আল-উইহদা আল-ওয়াতানিয়া’ বা ‘জাতীয় স্বার্থ’ হচ্ছে কতগুলো নীতিমালাকেন্দ্রিক প্রজন্মের পর প্রজেন্মর চাওয়া বা প্রত্যাশা। এর মধ্যে স্বাধীনতা অর্জনের কৌশল হিসেবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরে আসতে দেয়ার অধিকার এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অন্তর্র্ভুক্ত। এগুলোই ফিলিস্তিনিদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এসব অর্জনের জন্য প্রয়োজন ঐক্য। এ কথাটিরই খসড়া তৈরি করেছিলেন ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনি কারাবন্দীরা তাদের প্রণীত ‘প্রিজনারস ডকুমেন্টে’। তাদের লক্ষ্য ছিল সঙ্ঘাত এড়ানো। তাদের যাবতীয় কাজ হবে ইসরাইলি দখল অবসানে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।
বর্তমানে গাজায় চলছে, ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে চলমান এই গ্রেট মার্চ হচ্ছে ফিলিস্তিনি জনগণের সেই একই ঐক্যের আরেকটি সাম্প্রতিক উদাহরণ। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী ফিলিস্তিনিরা এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে দাবি তুলেছে, তারা স্বদেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার অর্জন করতে চায়। সেই সাথে সাথে চায় ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান।

কিন্তু এরপরও আমরা দেখছি ফিলিস্তিনিরা এখনো সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে পারছে না। কারণ, ফাতাহ ও হামাস অভিন্ন দাবি নিয়ে জাতীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলে একই প্ল্যাটফরমে দাঁড়াচ্ছে না। আজকের এই দিনে এই ঐক্য অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। আবার নতুন করে প্রতিটি ফিলিস্তিনিকে পড়তে হবে প্রিজনারদের সেই ‘ন্যাশনাল কনসলিয়েশন ডকুমেন্ট’। এটি সেদিন লিখেছিলেন ফিলিস্তিনের নেলসন ম্যান্ডেলারা, যাদের মধ্যে ছিলেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি, যারা এখনো দিন কাটাচ্ছে ইসরাইলি কারাগারে। এই ডকুমেন্টের চেতনা বাস্তবায়ন নেই বলেই এখন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনি নিধনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে শিগগিরই মাঠে নামছে তথাকথিত ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নিয়ে। ফিলিস্তিনিদের অনৈক্যের সুযোগ নিয়েই এরা সাহস পাচ্ছে তথাকথিত এই চুক্তির মাধ্যমে তথাকথিত ‘নিউ প্যালেস্টাইন’ গঠন করতে।

কী ভয়াবহ এই ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা? এই পরিকল্পনার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি, বলা হচ্ছে আগামী জুনে এই চুক্তি প্রকাশ করা হবে। তবে ফাঁস হয়ে যাওয়া তথ্য মতে- এই চুক্তির মাধ্যমে ‘নিউ প্যালেস্টাইন’ গঠন করা হবে। এই পরিকল্পনা অনুসারে ফিলিস্তিনকে এর ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুসালেমের দাবি পরিত্যাগ করতে হবে। ইসরাইল জেরুসালেমের পূর্ব ও উত্তরের কয়েকটি গ্রাম থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবে, কিন্তু পুরনো জেরুসালেম নগরীর ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরাইলের হাতে। প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে বেসামরিকীকরণ করতে হবে।

কিন্তু ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে গড়ে তোলা অবৈধ ইহুদি ইসরাইলি বসতিগুলো যথাস্থানেই থেকে যাবে, যার ওপর ফিলিস্তিনিদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। জর্ডান উপত্যকা থাকবে ইসরাইলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। ফিলিস্তিনিরা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তাদের স্বদেশে ফিরে আসার দাবি পরিত্যাগ করতে হবে। তথাকথিত এই পরিকল্পনা যেকোনো ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেবে এবং অস্বীকার করবে ফিলিস্তিনিদের যাবতীয় অধিকার। ফিলিস্তিনের যেসব নেতা এই চুক্তি মানবে না, ইসরাইল তাদের হত্যা করতে পারবে, এমন অমানবিক শর্তও যোগ করা হবে এই চুক্তিতে। মোট কথা, এই পরিকল্পনা ফিলিস্তিনি জাতিকে ধ্বংস করার নতুন এক মহাপরিকল্পনা, যা কোনো ফিলিস্তিনি মেনে নিতে পারে না। এই ডিল ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিত সংক্ষুব্ধ করে তুলবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিংবা জাতিসঙ্ঘ স্বাধীন ফিলিস্তিন বাস্তবায়ন করবে, সে আশা সুদূরপরাহত। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের একমাত্র ভরসা প্রিজনারস ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন ডকুমেন্ট অনুযায়ী নিশ্চিদ্র জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে প্রতিরোধ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কায়েম করা। এর কোনো বিকল্প আপাতত দৃশ্যমান নয়।