Naya Diganta

বেকারের গ্লানি দূর করতে হবে

জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। গুরুত্বটি উপলব্ধি করে তাকে জনসম্পদে উন্নীত করার যে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা থাকার কথা, তা কোথায়? অথচ বিপুল জনশক্তিকে সম্পদে পরিণত করে বহু দেশই সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছেছে; কিন্তু আমরা দেশের এই জনশক্তিকে বোঝা হিসেবে আজো টেনে চলছি। কেননা, তারা কর্মক্ষম হলেও সমাজ-রাষ্ট্র কর্মের সংস্থান করতে না পারায় তারা এখন বোঝা হয়ে আছে। প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলে এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মের সংস্থান করে এসব নাগরিকের জীবনকে অর্থপূর্ণ করা ও গ্লানিমুক্ত করা যায়। সেই সাথে দেশের সমৃদ্ধির সোপান তৈরি হবে। এর জন্য প্রয়োজন সক্ষম নেতৃত্ব ও উপযুক্ত নীতির। নেতাও যেমন দেশ থেকেই তৈরি হতে হবে, তেমনি নীতি-পরিকল্পনা আমদানি করে তৈরি করা হবে না। এ জন্য দেশের মৌলিক ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য খুব জরুরি হলেও আমাদের দেশে এমন ঐক্য যেন দুর্লভ। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সব ক্ষেত্রে মতপার্থক্য এত ব্যাপক যে, তাদের কোনোভাবেই এক টেবিলে বসে আলোচনা করার পরিবেশ নেই। দলগুলোর পথ ও মতের ভিন্নতা থাকবেই, কিন্তু যার সাথে একান্ত জাতীয় স্বার্থ জড়িত, সেসব বিষয়ে মতবিনিময় এবং পরামর্শ করার পরিবেশ থাকা দরকার। এমন পরিবেশ রচনায় শাসক দলের ভূমিকা থাকতে হবে অগ্রগণ্য। কিন্তু শুধু এখন নয়, সব সময়ই দেখা গেছেÑ ক্ষমতাসীনেরা তাদের প্রতিপক্ষকে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেন না। পরস্পর এমন বৈরিতার কারণে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাহীন বিভক্তির দেয়াল উঠে গেছে। এমন পরিস্থিতির জন্য বহু ক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ-সঙ্ঘাতের ঘটনা ঘটে থাকে। এ কারণে সহাবস্থানের পরিবেশ পর্যন্ত থাকে না, সমাজে বিদ্বেষ-বিসংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। এমন সব কারণে সুনীতির স্বাভাবিক চিন্তার বিকাশ ঘটতে পারে না।
যে প্রেক্ষাপটে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা হয়েছে, তাতে দুটো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ : বিপুল বেকারত্ব এবং তা দূর করতে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। পৃথিবীতে যেসব দেশ বেকারত্ব বিবেচনায় শীর্ষপর্যায়ে রয়েছে, সেই তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে। বেকারত্ব দূর করার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেয়ার দিক থেকেও আমরা অনেক পিছিয়ে। অথচ এই সঙ্কট দূর করতে তথা বিনিয়োগ করে বেকারত্ব কমানোর ক্ষেত্রে এ দেশের মানুষ অক্ষম, তা বলা যাবে না। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে এই দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা লোপাট করা হয়েছে। এ বিপুল অর্থ এভাবে নষ্ট না হলে দেশে শিল্প গড়ার জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অভাব হতো না। অপর এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি ব্যবসায়ী। ইতঃপূর্বে দশম সংসদের সদস্যদের মধ্যে ৫৯ শতাংশই ছিলেন ব্যবসায়ী। এসব তথ্য থেকে সহজেই বলা যায়, বর্তমান আইনপ্রণেতাদের মধ্য থেকে বহু বিনিয়োগকারী এগিয়ে এলে দেশে অনেক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হতে পারত এবং বেকারত্ব হ্রাসে বড় অবদান রাখা সম্ভব হতো; কিন্তু কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত না হওয়ায় অন্তত একটি কারণ হিসেবে বলা যায়, এই গুরুত্ববহ ইস্যুতে তাদের প্রতিশ্রুতির অভাব রয়েছে।
সংসদ সদস্যদের বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসার পাশাপাশি এই সমস্যার গুরুত্ব উপলব্ধি করে এর সমাধানের পথ নিয়ে তাদের আলোচনা-পর্যালোচনায় এ থেকে দেশ বেরিয়ে আসতে পারে। সে জন্য সরকারকে পরামর্শ দেয়ার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এই সংসদের মধ্যে শুধু এ বিষয়েই নয়, অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও তাদের নির্লিপ্ততা দেখা যায়। সংসদের এই ভূমিকা দেখে চরম হতাশ হতে হয়। রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান একটি অঙ্গের এমন দায়িত্ববোধহীনতা থেকে কি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না যে, এখন জনপ্রতিনিধি হিসেবে যারা সংসদে বসেছেন; তারা তাদের পদের যে কর্তব্য, তা আদায় করছেন না। অথচ সংসদ এবং এর সদস্যদের জন্য এ দেশের দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এই বিপুল অর্থ অপচয়ের জবাব দেবে কে? সেই সাথে, তাদের ভূমিকার অভাবে জনগণ ও রাষ্ট্রের যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তা পূরণ করা যাবে কিভাবে?
বেকারত্ব নিয়ে আরো দেখা যায়, এখানে হু হু করে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। এর কয়েক গুণ বেশি বাড়ছে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা। সম্পদের কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত সমস্যা, জ্বালানির সঙ্কট এবং উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতায় বাড়ছে না বিনিয়োগ। এসব কারণে সৃষ্টি হচ্ছে না নতুন কর্মক্ষেত্র। এ দিকে, দ্রুত বেড়ে চলেছে বেকারত্ব। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিশ্বে বেকারত্বÑ বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় ১২তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, দেশে গত এক দশকে বেকারত্ব বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। আর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার হ্রাস পেয়েছে ২ শতাংশ। প্রতি বছর দেশে লাখ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে ঢুকছে। আরো তথ্য হচ্ছে, সরকারি বা বেসরকারিভাবে কাজ পাচ্ছে মাত্র এক লাখ ৮৯ হাজার জন। ফলে প্রতি বছর বিপুল মানুষ বেকার থেকে যেতে হচ্ছে। এতে জাতীয় উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং এর বিপরীতে, সার্বিকভাবে ভোগের মাত্রা বাড়ছে। তাতে জাতীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে কর্মহীন বিশাল জনগোষ্ঠী। বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যতিরেকে এই নেতিবাচক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। গত কয়েক বছরে তা বেড়ে ৩০ লাখের বেশি হয়ে গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এই বিপুল বেকারত্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি সামাজিক জীবনেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলছে। বেকার জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে যেসব দেশে আমাদের শ্রমবাজার রয়েছে সেখানে কর্মের সংস্থান করতে পারলে ওদের পারিবারিক সচ্ছলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যেত। বিপুল জনশক্তিকে প্রশিক্ষিত করে যদি বিদেশে পাঠানো যায়, তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদে নগরের সুযোগ-সুবিধা পৌঁছানোর যে সরকারি নীতি ও কর্মসূচি, তাকে সহজ করে দিত। এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন সম্ভব হলে মানুষের শহর অভিমুখী স্রোত কমে আসত। প্রতিদিন বিভিন্ন শহরে যে হারে গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষ আসে, তাতে নগরজীবনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়ে থাকে। তা ছাড়া, বাংলাদেশের মৌলিক জাতীয় নীতিতে গ্রামীণ জনপদে শহরের সুবিধাগুলো পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার রয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়েছে এবং সব উপজেলা জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার জন্য বিধান করা হয়েছে। আর জনগণের ভোটে নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বে আসবেন; কিন্তু এসব নির্বাচন যদি স্বচ্ছ, প্রশ্নমুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক না হয়; তবে সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বে আসা সম্ভব হবে না। তাই এই ব্যবস্থার যে সুফল তা জনগণ ভোগ করতে পারবে না। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এখন যে নির্বাচন উপজেলায় হচ্ছে, সেখানে নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। সর্বোপরি যে ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের কথা বলা হয়, তা বাস্তবে হচ্ছে না। ফলে এই ভোট নিয়ে আর জনগণের মধ্যে কোনো উৎসাহ ও আগ্রহ লক্ষ করা যায় না। উপজেলাপর্যায়েও যদি সংসদের মতো জনপ্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, তবে প্রশাসনের সব পর্যায়ে সত্যিকার জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে সাংবিধানিক নির্দেশ রয়েছে তার কী হবে? আর এ কথা সবাই স্বীকার করবেন, যাদের নির্বাচিত হওয়ার জন্য জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয় না, তাদের কারো কাছে জবাব দেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। এভাবে যদি প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহির ঘাটতি দেখা যায়, তবে রাষ্ট্রের ভবিতব্য নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ থাকবে না।
বেকারত্বের উল্লেখযোগ্য অভিশাপগুলোর দু’টি হচ্ছে, ব্যাপক মাদকাসক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বিনষ্ট করার প্রয়াস। বেকার যুবকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হলে তাদের মধ্যে বহু মন্দ অভ্যাসের বিস্তার ঘটে। এর মধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়া অন্যতম। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ ঘটেছে মাদকের ব্যাপক ব্যবহারে। এটি দমনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাগাতার অভিযান চালাচ্ছে, কিন্তু মাদকের প্রাপ্যতা ও প্রয়োগ হ্রাস করা যায়নি। মাদকের ব্যাপক ব্যবহার দেশের বেকার তরুণসমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে চলেছে। মাদকের ব্যাপক ব্যবহার বন্ধ করতে যে পথ বেছে নেয়া হয়েছে, এর প্রকোপ কিছুটা হ্রাস করতে পারবে বটে, কিন্তু নির্মূল করা সম্ভব হবে না। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে বহুমুখী পথ বেছে নিতে হবে। সমাজে নৈতিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের জাগরণ ঘটাতে হবে। এর সবচেয়ে বড় প্রতিকার হলো যুবসমাজের হাতে কাজ তুলে দিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে। তাদের বৈধ আয়রোজগারের ব্যবস্থা করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশা দূর করে আশাবাদী করে তুলতে হবে।
মাদকসেবীরা মাদকের অর্থ জোগানোর জন্য পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে আসছে ইচ্ছামতো। মাদকসেবীরা বিশেষ করে অর্থের জন্য নানা অপরাধে জড়িত হয়। মাদকাসক্ত মানুষকে এত বেশি বেপরোয়া করে তোলে যে, তারা সব রকম ঝুঁকি উপেক্ষা করে থাকে। মাদকসেবীরা ভয়াবহ রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে সমাজে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে মাদকের চাহিদা বাড়ছে এবং এর ব্যাপক সরবরাহ রয়েছে। এটা বন্ধ করতে না পারলে মাদক ব্যবহারকারীদের সংখ্যা কমানো যাবে কি? দেশের মাদক ব্যবসায়ীরা এখন আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ রাখছে। বাংলাদেশকে মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অপরাধীর হাতে অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে। এরা সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতি এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার ক্ষমতাও রাখে।
বেকারত্বের যে বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো তার পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা উন্নয়নকে আসলে খুবই বিপরীতধর্মী বলে মনে হচ্ছে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী বেকার, তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে; তাদের এ অবস্থার পরিবর্তন না ঘটিয়ে এ দাবির যথার্থতা নিয়ে কথা বলা যাবে না। উন্নয়ন বলতে যদি মুষ্টিমেয় মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনকে বোঝানো হয়, তবে তা বাস্তবতাকে অস্বীকার করা মাত্র। তা ছাড়া, উন্নয়নের অনেক সূচক রয়েছে; তার দু-একটা পূরণ হলেই তা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। তা ছাড়া, বিশ্বের বহু গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করে। সেসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উন্নয়ন প্রমাণিত হওয়ার যে শর্তগুলো রয়েছে, তার সবগুলো বাংলাদেশ পূরণ করতে পারেনি। শুধু দারিদ্র্যবিমোচন নয়, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা পাওয়া উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। সেগুলো কি বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে? হ
[email protected]