Naya Diganta

অস্থির সমাজ : রাষ্ট্রের করণীয়

বাংলাদেশের দিকে তাকালে মনে হয় নিদারুণ বিশৃঙ্খলার মধ্যে আমরা জীবন যাপন করছি। ১৮ মার্চ ২০১৯ রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে ব্রাশ ফায়ারে নিহত সাতজন, গুলিবিদ্ধ ২৫। পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় এসে দেশবাসীকে দেখতে হলো মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা। অনেকটা একদলীয় ও ভোটারবিহীন নিরুত্তাপ এ নির্বাচনে ১৮ মার্চ সোমবার পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় ভোট গ্রহণ শেষে ফেরার পথে অস্ত্রধারীদের ব্রাশ ফায়ারে নিহত হয়েছেন পোলিং অফিসার ও আনসার ভিডিপির নারী সদস্যসহ সাতজন। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়েছেন প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশসহ নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারী আরো ২৫ জন। নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার সাথে কথা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন- বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো এ আক্রমণ চালিয়েছে। ওখানে পাহাড়ি সংগঠনগুলো ভোট বর্জন করেছে। এর কিছু দিন আগে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে প্রায় শতাধিক মানুষের প্রাণ হারিয়েছিল ঢাকার চকবাজার এলাকা।

২০১৯ সালের শুরু থেকে বড় ধরনের যে তিনটি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হলো- তার সবগুলোই মানব সৃষ্ট। মৃত্যু এখানেই থেমে থাকেনি- অস্বাভাবিক মৃত্যু প্রতিদিনই বেড়ে চলছে। এ দিকে, গত ২০ মার্চ বিশ্ব সুখী দিবস উপলক্ষে জাতিসঙ্ঘ সুখী-অসুখী দেশের তালিকা প্রকাশ করে। বিশ্বজুড়ে সুখী দেশের তালিকায় ১০ ধাপ পিছিয়ে ১২৫তম অবস্থানে বাংলাদেশ। এ তালিকায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো শীর্ষে রয়েছে ফিনল্যান্ড। বিশ্বের ১৫৬টি দেশের জনগণের আয়, স্বাধীনতা, বিশ্বাস, গড় আয়ুর সম্ভাব্যতা, সামাজিক সহায়তা এবং উদারতা এই ছয়টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সুখী দেশের তালিকা প্রণয়ন করেছে জাতিসঙ্ঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্ক বিভাগ। এসব দেশের ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ শেষে এবারের রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে।

২০১৮ সালের এ জরিপে বাংলাদেশ ১১৫তম সুখী দেশ থাকলেও এ বছর তালিকায় স্থান হয়েছে ১২৫তম। অন্য দিকে, বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে থাকা ভারতের অবস্থান ১৩০তম এবং শ্রীলঙ্কার অবস্থান ১৪০তম। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান সবচেয়ে ভালো। তারা ৬৭তম অবস্থানে আছে। এ ছাড়া ভুটান ৯৫তম, নেপাল ১০০তম। এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বেশির ভাগই ইউরোপীয় দেশ। তালিকাটিতে সবচেয়ে অসুখী বা সুখী দেশের একদম নিচে অবস্থান (১৫৬তম) করছে আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ সুদান। ২০১৩ সাল থেকে জাতিসঙ্ঘ ২০ মার্চকে বিশ্ব সুখী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। একই সাথে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টও করে আসছে। এ বছরের তালিকায় ৯৫তম অবস্থান দখল করেছে বিশ্ব সুখী দিবস পালনের প্রস্তাবকারী দেশ ভুটান (সূত্র : জাতীয় দৈনিক- ২২ মার্চ ২০১৯)। দেশের চলমান বিষয় নিয়ে লিখতে হয় কিছু।

আমাদের দেশের শাসকেরা বহু দিন পর স্বীকার করেছে- সড়ক ব্যবস্থাপনায় আমরা সত্যিকার অর্থে ব্যর্থ হয়েছি। প্রতিদিন যে হারে মানুষ সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিএমপি কমিশনার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনগণের সহযোগিতা কামনা করছেন। এটা যে সার্বজনীন ব্যবস্থা ছাড়া নিরসন সম্ভব নয়- তা বুঝতে পারার জন্য তাদের সাধুবাদ জানাই। পরিবহনে যে নৈরাজ্য চলছে তা বড় আকারে উপলব্ধি আসে ২৯ জুলাই ২০১৮ বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর থেকে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত নিরাপদ সড়ক দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ করে আসছে শিক্ষার্থীরা।

কিছু দিন আগে সুপ্রভাত পরিবহনের চাপায় পিষ্ট হয়ে বিইউপি শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীর (২০) মৃত্যুর প্রতিবাদ এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত ২১ মার্চেও আন্দোলনে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা। উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের সাথে বৈঠক করে ২৮ মার্চ পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করে তারা। সড়কে নামলেই দুর্ঘটনার ভয়, ২৪ ঘণ্টায় ১৮ জনের মৃত্যু। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বিগত ৪৮ বছরে সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে সড়ক ও জলপথে। বিশ্বে অন্য কোনো দেশে সড়কপথে এত মানুষ প্রাণ হারায়নি। দেশের নগরবিদদের এসব বিষয় চিন্তা করা দরকার। কিভাবে যানবাহনে মানুষের প্রাণহানির লাগাম টেনে ধরা যায় তার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং তা বাস্তবায়নে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রেখে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে। অন্যথায় মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকবে- কমার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। আমাদের দেশে সুশাসনের এবং সুবিচারের অভাব প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের চিন্তাভাবনা করা সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মালিক ১৮ কোটি মানুষ। ব্যক্তি চিন্তায় দেশ পরিচালনা করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। দেশে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার থাকলে তো নদীগুলো দখল হয়ে যেতে পারে না। সড়কপথ দখল হয়ে যেত না। পাহাড় পর্বত-এগুলোও দখল হয়ে যাচ্ছে। গত ২৩ মার্চ বণিক বার্তা পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার লিড নিউজ ছিল- শুধু সাভার অংশেই বংশী নদী দখল করেছে ৬৫ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। শীর্ষ ১০ দখলদারের মধ্যে স্বয়ং রয়েছেন সাভার পৌরসভার মেয়র মো: আবদুল গণি। তালিকায় নাম রয়েছে মেয়রপুত্র কামরুর হাসান শাহীনেরও।

সাভার ভূমি অফিস পরিচালিত জরিপে উঠে এসেছে নদী দখলদারদের নাম। গোটা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক নদী এলাকার প্রভাবশালী মহলের দখলে। আমরা দেশকে ভালোবাসি- এ কথার যথার্থ প্রমাণ মিলবে যখন আমরা জাতীয় স্বার্থের পক্ষে যারা কাজ করে তাদের সহযোগিতা করা এবং বিরুদ্ধে যারা কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তা হলেই দেশটা সুন্দর হবে এবং আমরাও ভালো থাকব।

লেখক : গ্রন্থকার
ইমেইল : [email protected]