Naya Diganta

ফটোগ্রাফার : চারাগল্প

আমি এসেছি কক্সবাজার। সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে। সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে আমার চোখ একেবারে ছানাবড়া। কী সুন্দর সমুদ্রের নীল পানির ঢেউ ! দেখেই হৃদয় জুড়িয়ে যায়। মনে প্রশান্তি আসে। আমি গোড়ালি পানিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে মুখ করে মুগ্ধভরে সমুদ্রের ঢেউ দেখতে লাগলাম। ক দূর থেকে পাহাড় সমান ঢেউগুলো ভেসে আসছে ! আস্তে আস্তে ছোট হয়ে তীরে আছড়ে পড়ছে। বাতাস বইছে। ঝিরিঝিরি বাতাস। বাতাসে আমার চুল উড়ছে। আবেশে আমি চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকি।
আপা, ছবি তুলবেন?
ঘোর কাটে আমার। সম্মিত ফিরে পেছনে তাকাই। দেখি পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একজন ফটোগ্রাফার। মুখে হাসি। গলায় ঝুলছে ক্যামেরা। সত্যিই তো ছবি তোলার কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম আমি।
ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলাম। থ্যাংক ইউ।
ছেলেটি হতভস্ব। সরি!
ধন্যবাদ দিলাম আপনাকে। সমুদ্র দেখে ফিদা হয়ে গিয়েছিলাম। তাই ভুলে গিয়েছিলাম ছবি তোলার কথা। আপনি আমাকে ছবি তোলার কথা মনে করিয়ে দিলেন। সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ওহ। ফিক করে হেসে দিলো ফটোগ্রাফার। ধন্যবাদ আপনাকেও।
হাসিতে গালে টোল পড়ল তার। সাধারণত ছেলেদের হাসিতে গালে টোল পড়ে না। এই ছেলেটার পড়ল। আর পড়েছিল মাহাবুবের। ছোটবেলায় দেখেছি মাহাবুবের ছোটো গালের টোল হাসি। কী মায়াবী, কী স্নিগ্ধ সেই হাসি! আজো মনে পড়ে আমার। হাসিটা গেঁথে আছে বুকে। লেপ্টে আছে হৃৎপিণ্ডে।
হাসিটার দিকে তাকাতেই চমকে উঠি আমি। হাসিটাকে বড্ড চেনা আর পরিচিত মনে হলো। মাহাবুব কী? একটু খুঁটিয়ে লক্ষ করতেই চিনতে পারলাম। হুম, মাহাবুবই তো! ওই তো তার ডান গালে কাটা দাগটা। ছোট বেলায় খেলা করার সময় আমি চাকু দিয়ে তার গাল কেটে দিয়েছিলাম। আমাদের বাড়িতে ভাড়া থাকত তারা। ওর বাবা চাকরি করতেন ব্র্যাক এনজিওতে। তখন আমি ছোট। মাহাবুব ছোট। থ্রি কি ফোরে পড়ি। দু’জন একসাথে স্কুলে যেতাম। পুতুল নিয়ে বর কনে খেলতাম। কানামাছি খেলতাম। কুতকুত খেলতাম। আরো কত্ত কী খেলা করতাম। হঠাৎ একদিন মাহাবুবের বাবার বদলি হয়ে গেল। তারপর থেকে মাহাবুবের সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ ও কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল।
মাহাবুব! কাঁপা কাঁপা গলায় অস্ফুট স্বরে আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো শব্দটা।
চমকে উঠল ফটোগ্রাফার। কে আপনি?
রিমঝিম।
রিমঝিম!
হুমম, আমি রিমঝিম। মনে পড়ে তোমার দিনাজপুরের কথা। আমাদের ছোটবেলার কথা। আমরা একসাথে কত খেলা করতাম। আমি চাকু দিয়ে তোমার গালটা কেটে দিয়েছিলাম। মনে পড়ে? ওই তো কাটা দাগটা তোমার গালে আজো আছে।
চট করে ডান হাত দিয়ে গালের কাটা দাগটা চেপে ধরল মাহাবুব। রিমঝিম তুমি ? তুমিই রিমঝিম!
হুমম।
কত বদলে গেছ তুমি। চিনতেই পারিনি আমি।
তুমিও বদলে গেছ মাহাবুব।
তবুও তো তুমি চিনতে পারলে।
তোমার টোল পরা হাসি আর গালের কাটা দাগ দেখেই চিনতে পেরেছি। কী সুন্দর তোমার হাসি! আজো গেঁথে আছে আমার বুকে। আমার কথা কী তোমার মনে আছে মাহাবুব?
মনে আছে রিমঝিম। সব মনে আছে আমার। এই দাগ আমি মুছে যেতে দিইনি। এটা তোমার দেয়া স্মৃতি। তোমার দেয়া স্মৃতি মুছে যেতে দিই কী করে? পুষে রেখেছি। পুষে রাখতে চাই চির জীবন। জনম জনম ধরে।
আমি বড় হয়ে তোমাকে অনেক খুঁজেছি মাহাবুব, পাইনি।
হেসে উঠল মাহাবুব। আবারো গালে টোল পড়ল তার। তার টোল পড়া গালের হাসি দেখে আমি ফিদা হয়ে গেলাম। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। কতদিন দেখিনি এই হাসি!
চলো রিমঝিম।
আমি অবাক। কোথায়?
খেলতে।
খেলতে!
হুমম, খেলতে। আগে খেলতাম ছোটদের অনেক খেলা। আজ খেলব সেলফি তোলা খেলা।
ফিক করে হেসে দিলাম। তুমি আজো ছোটবেলার সেই মাহাবুবটিই রয়ে গেছ মাহাবুব।
মাহাবুব ততক্ষণে অনেক ছবি তুলে ফেলেছে আমার।
সেতাবগঞ্জ, দিনাজপুর