Naya Diganta

তিন প্রজন্ম জাতীয় দাবায়

পয়গাম উদ্দিন আহমেদ, জিয়াউর রহমান ও তাহসীন তাজওয়ার জিয়া

গত বছর প্রিমিয়ার ডিভিশন দাবা লিগের ম্যাচ। সাইফ স্পোর্টিং ও গোল্ডেন স্পোর্টিং ক্লাবের খেলা। ওই খেলায় পিতা-পুত্রের লড়াই দিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন জিয়াউর রহমান ও তার ছেলে তাহসীন তাজওয়ার জিয়া। সাইফের জিয়াউর রহমানের বিপক্ষে খেলেন গোল্ডেনের তাহসীন তাজওয়ার।

এবার আবার এই পিতা-পুত্র ঠাঁই করে নিলেন দেশের দাবা ইতিহাসের রেকর্ড বুকে। তা একই সাথে এবারের ওমিকন জাতীয় দাবায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার করার মাধ্যমে। অবশ্য দৃষ্টান্তটা শুধু পিতা-পুত্রের মধ্যেই এখন আর সীমাবদ্ধ নেই। গ্র্যান্ড মাস্টার জিয়া তথ্য দেন, ‘এর ফলে আমাদের পরিবারের তিন প্রজন্মই অংশ নিলো জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে। এবার খেলছি আমি আর আমার ছেলে। ১৯৮৪ সালের জাতীয় দাবায় লড়েছিলেন আমার বাবা ও তাহসীন তাজওয়ারের দাদা ইঞ্জিনিয়ার পয়গাম উদ্দিন আহমেদ। একই পরিবারের তিন প্রজন্ম- দাদা, বাবা ও নাতির জাতীয় দাবায় খেলার রেকর্ড বাংলাদেশে আর কারো নেই।’ জিয়ার এ তথ্যকে সমর্থন দিলেন বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের আরবিটার হারুনুর রশীদও।

গত বছর পিতা-পুত্রের লড়াইয়ে বহু কষ্টে জিয়া জিতেছিলেন তার ছোট্ট ছেলের বিপক্ষে। তা ৭০ চালে এসে। এবার জাতীয় দাবায় দ্বিতীয় রাউন্ডে ছেলের পারফরম্যান্সের দিকে নজর দিতে গিয়ে জিয়া নিজেই হেরে বসেন। তার বক্তব্য, ওই দিন আমি একটু এক্সসাইটেড হয়ে গিয়েছিলাম। পাশের বোর্ডে ছেলের খেলায় নজর দিতে গিয়ে আমি আমার খেলায় মনোযোগ দিতে পারিনি। তাই হেরে যাই। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় রাউন্ডের সেই ম্যাচে জিয়া পরাজিত হলেও জিতেছিল তার ছেলে তাহসীন।

ছেলে তাহসীন তাজওয়ারের এবারের জাতীয় দাবায় খেলার সুযোগের জন্য দেশের এই গ্র্যান্ডমাস্টার পুরো কৃতিত্ব দিলেন দাবা ফেডারেশনকে। বলেন, ফেডারেশন এবার জাতীয় দাবার বাছাই পর্বে প্রতিযোগীর সংখ্যা ১৪ থেকে বাড়িয়ে ২৬ জন করে। খেলা হয় সুইস লিগ পদ্ধতিতে। এতে আমার ছেলেসহ পাঁচজন অনূর্ধ্ব-২০ বছর বয়সী দাবাড়ু খেলার সুযোগ পেয়েছেন জাতীয় দাবায়।

এক ফ্রেমে তিন প্রজন্ম: তাহসীনের ছোটবেলায় দাদা ও বাবার সাথে

 

উল্লেখ্য, বাছাই পর্বে ১২তম হয়ে জাতীয় দাবার ছাড়পত্র পায় জিয়াপুত্র। এবারই তিনি প্রথম অংশ নেন জাতীয় ‘বি’ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ বা জাতীয় ‘এ’ দাবার বাছাই পর্বে।

সিনিয়রদের সাথে খেলাটাকে বেশ উপভোগ করছেন তাহসীন তাজওয়ার। করছেনও ভালো। জানান, গত দুই বছর লিগ খেলার ফলে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে বহু গুণে। লিগে তো বড় বড় দাবাড়ুর বিপক্ষে লড়েছিলাম।

জিয়া নিজেই কোচিং করাচ্ছেন ছেলেকে। ভারতে তিনি যেসব টুর্নামেন্টে অংশ নেন সেখানে খেলানোর জন্য সাথে করে নিয়ে যান ছেলেকে। জিয়ার মতে, ভারতের আসরগুলো অনেক উন্নতমানের। এতে অভিজ্ঞতা বাড়ছে ছেলের।

জিয়া বাংলাদেশের পেশাদার দাবাড়ু। তার আন্তর্জাতিক রেটিং ২৪৬৮। তাহসীন তাজওয়ারের রেটিং ১৮০০ এর ওপরে। শিগগিরই তা ১৯০০ ছাড়িয়ে যাবে। তবে জিয়ার বাবা পয়গাম উদ্দিন ছিলেন শখের দাবাড়ু। এরপরও তিনি ১৯৮৪ সালের জাতীয় দাবায় পরাজিত করেছিলেন রানী হামিদ ও রেজাউল হককে। তারা ছিলেন সেই সময়ের নামকরা দাবাড়ু। তখন অবশ্য রেটিংয়ের সিস্টেম ছিল না বাংলাদেশের দাবায়।

দাদার কাছেই চার বছর বয়স থেকে দাবার হাতেখড়ি তাহসীন তাজওয়ারের। ২০১১ সালে দুনিয়া ছেড়ে চলে যান দাদা পয়গাম উদ্দিন আহমেদ। তবে নাতি এখনো মনে রেখেছেন দাদাকে। জানান, দাদার পর আমি আর বাবা জাতীয় দাবায় খেলছি এটি দাদা দেখে যেতে পারলে খুব খুশি হতেন।

জিয়ার স্ত্রী তাসমিন সুলতানা লাবণ্যও দাবাড়ু। তার রেটিং ১৩৫৩। ২০১০ সালে জাতীয় মহিলা দাবার বাছাইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে স্বামী আর সন্তানকে সময় দিতে গিয়ে তার আর দাবা খেলা হয় না এখন। অথচ তিনি দাবা খেলা চালিয়ে গেলে হয়তো তাকেও দেখা যেত জাতীয় দাবায়। তখন একই পরিবারের চারজনের জাতীয় দাবায় উপিস্থিতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতো। এই একই কারণে বিসিএস ক্যাডার হয়েও সরকারি চাকরি ছাড়তে হয়েছে জিয়ার স্ত্রীকে। লাবণ্য জানালেন, আমার সতীর্থরা তো ডিসি পর্যন্ত হয়ে গেছে।