Naya Diganta

ফ্রান্স-ইতালির প্রতিযোগিতায় প্রকট হচ্ছে লিবিয়া সঙ্কট

ফ্রান্স-ইতালির প্রতিযোগিতায় প্রকট হচ্ছে লিবিয়া সঙ্কট

উত্তর আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ লিবিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে ইউরোপের দুই শক্তিশালী রাষ্ট্র ফ্রান্স ও ইতালি। এর ফলে লিবিয়ার বিবদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জোর ভূমিকা রাখতে সমর্থন জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেছেন, লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে ইতালির নেতৃত্বকে আমরা সমর্থন জানাই।

এ বক্তব্যের মাধ্যমে আফ্রিকা অঞ্চলে ফ্রান্সের প্রভাব খর্ব করে সেখানে ইতালিকে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের উদ্দেশ্য প্রকাশ পেল। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠার ছদ্মবেশে ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় ফ্রান্স বা ইতালি যে দেশই পেরে উঠুক না কেন, শেষ পর্যন্ত লিবিয়ার জনগণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। কেননা, ২০১১ সালের অক্টোবরে সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে সঙ্ঘাত এক দিনের জন্যও থামেনি বরং তা আরো ছড়িয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিকে ঘিরে প্রাণঘাতী হামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে সব পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব ও চার পশ্চিমা দেশ। মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত অস্ত্রবিরতি চুক্তির ভিত্তিতে দেশটিতে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালির যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈধ লিবীয় কর্তৃপক্ষকে দুর্বল ও চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে পশ্চাৎমুখী করার যে চেষ্টা চলছে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে লিবিয়ায় বিদ্রোহী সৈন্যদের মধ্যে সংঘর্ষে এক সপ্তাহে ৫০ জনের বেশি নিহত ও প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছেন। গত সোমবার ত্রিপোলির দক্ষিণাঞ্চল সুবারবর্সে এ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। জাতিসঙ্ঘ সমর্থিত একটি সরকার লিবিয়ার রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও দেশটির বেশির ভাগ অংশই বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনীর দখলে।

এ দিকে, লিবিয়ায় সশস্ত্র প্রতিপক্ষরা শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে দেশটিতে অবস্থিত জাতিসঙ্ঘ মিশন। গত মঙ্গলবার ত্রিপোলিতে এক সমঝোতায় পৌঁছায় দুই গ্রুপ।

২০১১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার পর ত্রিপোলিতে জাতিসঙ্ঘের সমর্থনে একটি মনোনীত সরকার রয়েছে। ওই কর্তৃপক্ষকে জাতীয় চুক্তির সরকার বা জিএনএ নামে অভিহিত করা হয়। তবে দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হাতে রয়ে গেছে। লিবিয়ায় জাতিসঙ্ঘের মিশন জানায়, ‘জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত জিহাসান সালামের উপস্থিতিতে সবরকম সহিংসতা বন্ধ, জনগণের নিরাপত্তা ও বেসামরিকদের সুরক্ষায় একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।

তবে একটি আশার কথা হলো, লিবিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী নেতারা প্যারিস বৈঠকে আগামী ১০ ডিসেম্বর দেশে পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানে সম্মত হয়েছেন। লিবিয়ার প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলো ইউরোপীয় শক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ২০টি দেশের এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা এ বৈঠকে যোগ দেয়। দেশে চলমান সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান ও অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্যারিসে গতকাল বৈঠক করেছেন লিবিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী নেতারা। জাতীয় নির্বাচন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়াসহ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে একটি রাজনৈতিক রোডম্যাপ প্রণয়ন ছিল এ বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিসি প্রাসাদে এ বৈঠকে লিবিয়ার প্রতিবেশী দেশ, আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় শক্তি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোসহ ২০টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং সম্ভব হলে ২০১৮ সালের শেষের দিকে নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা করা এ সম্মেলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। প্যারিসে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে জাতিসঙ্ঘের সমর্থন রয়েছে।

বর্তমানে লিবিয়া পূর্ব ও পশ্চিমে দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারের নিয়ন্ত্রণে বিভক্ত এবং উভয় সরকারের পেছনে সুসজ্জিত মিলিশিয়া বাহিনীর সমর্থনও রয়েছে। লিবিয়ার জাতিসঙ্ঘ সমর্থিত প্রধানমন্ত্রী ফয়েজ সাররাজ ও পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী লিবিয়ার সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডার পশ্চিমাপন্থী জেনারেল খলিফা হাফতার এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন।
সম্মেলনে জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত গাসসান সালামের পাশাপাশি ফয়েজ সাররাজের প্রতিদ্বন্দ্বী হিফতারকে সমর্থন জানানো মিসর, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরাও অংশ নিয়েছেন। উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে ২০১১ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর সৃষ্ট অরাজকতা নিরসনে জাতিসঙ্ঘ ও সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ইতালি অনেক বছর ধরে মধ্যস্থতা করে এলেও সেখানে স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি।