Naya Diganta

উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা

উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা

উদ্বিগ্ন ঢাকার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। বিশেষ করে যারা কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে ঢাকায় যাদের পরিবার-পরিজন থাকেন না তাদের অনেকেই ঢাকা ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। যারা ঢাকায় এখনো অবস্থান করছেন তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে ঢাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিশেষ করে রাজধানীর তেজগাঁও ও মহাখালী থেকে বেশ কিছু ছাত্রকে আটকের পর অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে তেজগাঁও এবং মহাখালীর বিভিন্ন মেস ও ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে অন্তত ৪০ জন শিক্ষার্থীকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ছাত্রকে আটকের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেন তাদের সহপাঠী ও রুমমেটসহ অনেকেই। কিন্তু আটকের পর বিষয়টি এড়িয়ে যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঘটনার পরপরই আটক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যরা থানায় যান। কিন্তু থানা থেকে বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। থানা পুলিশ এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরিও গ্রহণ করেনি। পরে অভিভাবকেরা জানতে পারেন তাদের সন্তানরা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে রয়েছেন। পরদিন তারা আসেন মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ের সামনে। সেখানে এক এক সময় এক এক কথা বলা হয় অভিভাবকদের। অভিভাবকেরা অভিযোগ করেন, কখনো শিক্ষার্থীদের আটকের বিষয়টি তারা স্বীকার করে। আবার কখনো অস্বীকার করা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। ৪০ জনের মধ্যে ২৮ জনকে পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর ছেড়ে দেয়া হয়। বাকি ১২ জনকে রেখে দেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সে থেকে ওই ১২ জনের পরিবারের সদস্যরা ডিবি কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে থাকেন। কখনো তাদের কাছে আটকের বিষয়টি স্বীকার করে, আবার কখনো অস্বীকার করে।

এভাবে কেটে যায় ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ৯ সেপ্টেম্বর এই শিক্ষার্থীদের সন্ধান চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। এর পরেও ওই শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি পুলিশ বা ডিবি পুলিশ। গতকাল তাদের আদালতে হাজির করে পুলিশ। এর মধ্যে ৯ সেপ্টেম্বর তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়। সেই মামলায় অভিযোগ করা হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় এই শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ ও ভাঙচুরসহ নানা অপরাধ করেছে। এই শিক্ষার্থীরা হলো ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কেমিক্যাল বিভাগের অষ্টম পর্বের ছাত্র ইফতেখার আলম, তিতুমীর কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র জাহাঙ্গীর আলম, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল বিভাগের সপ্তম পর্বের ছাত্র রায়হানুল আবেদিন জুয়েল, মেকানিক্যাল পঞ্চম পর্বের ছাত্র তারেক আজিজ, ঢাকা পলিটেকনিকের মেকানিক্যাল বিভাগের পঞ্চম বর্ষের ছাত্র তারেক আজিজ (২), বোরহান উদ্দিন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মুজাহিদুল ইসলাম, ঢাকা পলিটেকনিকের কম্পিউটার বিভাগের তৃতীয় পর্বের ছাত্র মাহফুজ আহমেদ, অটোমোবাইল পঞ্চম পর্বের ছাত্র মেহেদী হাসান রাজিব, করোটিয়ার সরকারি সা’দাত কলেজের অনার্স ফলপ্রার্থী সাইফুল্লাহ মানসুর এবং ভার্সিটিতে ভর্তিইচ্ছুক জহিরুল ইসলাম হাসিব ও আল আমিন। এরা ছাত্র আন্দোলনের সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড ব্যবহার করে বলে পুলিশ উল্লেখ করে। সেই আইডি কার্ডের ছবিও প্রকাশ করা হয়।

তাতে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা যে পোশাকে গ্রেফতার হয়েছে, ওই একই পোশাকে তাদেরকে আদালতে নেয়া হয়েছে; ওই পোশাক পরিহিত ছবি দিয়েই তাদের আইডি কার্ড তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, তাদের সন্তানদের আটকের পর পুলিশ তাদের ছবি তুলে নিজেরাই ওই আইডি কার্ড তৈরি করেছে। তা না হলে ওই একই পোশাকে আইডি কার্ড হওয়ার কথা নয়। 

অভিভাবকদের প্রশ্ন এতদিন তাদের সন্তানরা কোথায় ছিলেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর তাদের আটক করা হলেও কোনো এতদিন সে বিষয়টি স্বীকার করা হয়নি। টানা ছয় দিন এভাবে কাউকে আটক রাখা আইনের লঙ্ঘন কি না ইত্যাদি। তবে মামলার এজাহারে পুলিশ গত ৯ সেপ্টেম্বর গ্রেফতারের বিষয়টি উল্লেখ করেছে। অভিভাবকেরা বলেছেন, পুলিশ এখানেও মিথ্যা তথ্য দিয়েছে।

এর আগেও কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাথে জড়িত অনেক শিক্ষার্থীকে আটক করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তাদের মধ্যে অনেকেই জেল খেটেছেন। এসব কারণে অভিভাবকেরা এখন উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে যারা কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের অভিভাবকেরা কোনোক্রমেই তাদের সন্তানদের এখন আর ঘরের বাইরে বের হতে দিতে রাজি নন। যাদের পরিবার ঢাকায় থাকে না তাদের গ্রামে চলে যাওয়ার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে পীড়াপীড়ি চলছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, পরিবার কোনোভাবেই চাইছে না তিনি এখন ঢাকায় থাকেন। এর মধ্যে একাধিকবার পুলিশের জেরার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। অপর একজন বলছেন, পুলিশ তাদেরকে চোখে চোখে রাখছে বলে জানতে পেরেছেন।