Naya Diganta

আরেকটি বিরাট পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে ভারত

আরেকটি বিরাট পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে ভারত

বিদায়ী টেস্টে শতরানের আলো ছড়ালেন অ্যালিস্টার কুক। তাকে দুরন্ত সঙ্গ দিয়ে সেঞ্চুরি করলেন অধিনায়ক জো রুটও। সেই সুবাদে ভারতের বিরুদ্ধে পঞ্চম টেস্টেও জয়ের পথ প্রশস্ত করে ফেলল ইংল্যান্ড। চতুর্থ দিন চায়ের বিরতির আগে ৮ উইকেটে ৪২৩ রান তুলে দ্বিতীয় ইনিংস ডিক্লেয়ার করেন রুট। ফলে ভারতের সামনে জয়ের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ৪৬৪ রান। আর তাতেই থরহরি কম্পমান দশা টিম ইন্ডিয়ার। বড় কোনো অঘটন না ঘটলে সিরিজের শেষ টেস্টেও হার বাঁচানো কঠিন কোহলিদের। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ২ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে রীতিমতো ধুঁকতে থাকে ভারতীয় দল। তৃতীয় ওভারে জেমস অ্যান্ডারসনের বলে পরপর এলবিডব্লু হয়ে বসেন শিখর ধাওয়ান (১) ও চেতেশ্বর পূজারা (০)। স্টুয়ার্ট ব্রডের পরের ওভারেই উইকেটকিপার বেয়ারস্টার হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন অধিনায়ক বিরাট কোহলি। রানের খাতাই খুলতে পারেননি তিনি। চতুর্থ দিনের শেষে ৩ উইকেট হারিয়ে ভারতের স্কোর ৫৮। লোকেশ রাহুল ৪৬ ও অজিঙ্কা রাহানে ১০ রানে ব্যাটিং করছেন। এখনও ৪০৬ রানে পিছিয়ে রয়েছে ভারত। হাতে ৭টি উইকেট নিয়ে শেষ দিন ম্যাচ বাঁচাতে লড়বেন রাহানেরা।

তবে সোমবার যাবতীয় ফোকাস ছিল অ্যালিস্টার কুকের ওপর। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে জীবনের শেষ ইনিংসেও ইংল্যান্ড সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটান ৩৩ বছর বয়সী বাঁহাতি ওপেনারটি। ইনিংসের ৭০তম ওভারে হনুমা বিহারীকে কাট করেছিলেন ৯৬ রানে দাঁড়িয়ে থাকা কুক। বুমরাহর ওভার-থ্রোয়ের সৌজন্যে সীমানা পেরিয়ে যায় বল। কুকের স্কোরে যোগ হয়ে যায় পাঁচ রান। সেই সঙ্গে তাঁর নামের পাশে লেখা হয়ে যায় কেরিয়ারের ৩৩তম টেস্ট সেঞ্চুরি। প্রথম ইনিংসে করেছিলেন ৭১। বড় রানের লক্ষ্যেই এগোচ্ছিলেন কুক। কিন্তু পারেননি। সেই আক্ষেপ মেটালেন সোমবার, প্রথম সেশনেই সেঞ্চুরি পূর্ণ করে। ক্রিকেট কেরিয়ারে শেষবারের মতো উঁচিয়ে ধরলেন ব্যাট। গ্রহণ করলেন কেনসিংটন ওভালের ভরা গ্যালারির ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’। ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট উলটোদিক থেকে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরেন কুককে। পরিবারের উপস্থিতিতে বিদায়ী টেস্টকে যথার্থ অর্থেই স্মরণীয় করে তোলেন তিনি। কেরিয়ারের প্রথম ও শেষ টেস্টে সেঞ্চুরিকারী মাত্র পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের নাম ইতিহাসে খোদাই করে নেন তিনি।

কুক ও জো রুটের চওড়া ব্যাটে ভর করে চালকের আসন মজবুত করে ফেলে ইংল্যান্ড। ভারতীয় বোলারদের কার্যত ক্লাব স্তরে নামিয়ে আনেন এই দুই ইংলিশ ব্যাটসম্যান। আগের দিনের ১১৪/২ নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করা কুক ও রুটের দাপটে তরতরিয়ে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ডের স্কোরবোর্ড। কুকের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে স্বমহিমায় ব্যাটিং করে যান অধিনায়ক রুট। তিনিও পূর্ণ করেন কেরিয়ারের ১৫তম সেঞ্চুরি। শেষ পর্যন্ত হনুমা বিহারীর স্পিনে কিছুটা নিস্কৃতি পায় কোহলি ব্রিগেড। দ্রুত রান তোলার চেষ্টায় সুইপ করতে গিয়ে ডিপ-মিড উইকেটে পরিবর্ত ফিল্ডার হার্দিক পান্ডিয়ার হাতে ধরা পড়েন রুট। প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে ফিরিয়ে জীবনের প্রথম টেস্ট উইকেটের স্বাদ পান হনুমা। ১৯০ বলে ১২৫ রান করে প্যাভিলিয়নে ফেরেন রুট। মারেন ১২টি বাউন্ডারি ও একটি ছক্কা। তার আগে কুকের সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে তিনি গড়ে তোলেন বিশাল ২৫৯ রানের জুটি। আর তাতেই নিশ্চিত হয়ে যায় ভারতের আরও একটা বিপর্যয়।

রুট ফিরে যাওয়ার পর মনঃসংযোগ হারিয়ে হনুমার পরের বলেই আউট হয়ে বসেন কুক। কাট করতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বল তার ব্যাটের কানায় লেগে উইকেটরক্ষক ঋষভ পন্থের গ্লাভসে জমা পড়ে। নবাগত হনুমার হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে ক্রিকেট ইতিহাসের এক মহান অধ্যায়ের। ২৮৬ বলে ১৪৭ রান করার পথে কুক মারেন ১৪টি বাউন্ডারি। ড্রেসিং রুমে ফেরার সময় এগিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে হাত মেলান ভারতীয় ক্রিকেটাররা। আরও একবার উঠে দাঁড়িয়ে কুককে অভিনন্দন জানান দর্শকরা।

এরপর দ্রুত আরও চারটি উইকেট পড়ে গেলেও ইংল্যান্ডের বড় রানের লিড আটকায়নি। বেয়ারস্টো (১৮), স্টোকস (৩৭), কুরান (২১), আদিল রশিদরা (অপরাজিত ২০) চালিয়ে খেলে চায়ের বিরতির আগেই দলের স্কোর চারশোর গণ্ডি পের করে নিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ৮ উইকেটে ৪২৩ রানের মাথায় ইনিংস ডিক্লেয়ার করে দেন অধিনায়ক জো রুট।

আরো পড়ুন
বিদায়বেলায়ও সুস্বাদু মেনু উপহার শেফে’র
ইংল্যান্ডের সর্বাধিক টেস্ট রানের মালিক অ্যালিস্টার কুকের অভিষেক ও অন্তিম টেস্ট মিলে গেল একই বিন্দুতে। ইংরেজ শিবিরের আদরের ‘শেফ’ পূর্ণ করলেন তার সাফল্যের বৃত্ত। ২০০৬ সালে নাগপুরে ভারতের বিরুদ্ধে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে হাফ-সেঞ্চুরি (৬০) করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিলেন অপরাজিত ১০৪ রান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১২ বছর কাটানোর পর বিদায় বেলায় ওভাল টেস্টেও নাগপুরের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন কুক। প্রথম ইনিংসে ৭১ রানের ছন্দ বজায় রেখে দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি উপহার দিয়েছেন দুরন্ত ১৪৭ রানের ইনিংস। জীবনের অভিষেক ও অন্তিম টেস্টে সেঞ্চুরি করা মাত্র পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখলেন কুক। তাঁর আগে এই অনন্য কীর্তির স্বাদ পাওয়া ৪ ব্যাটসম্যান হলেন রেগি ডাফ (১০৪ ও ১৪৬ রান/ ১৯০২-১৯০৫), উইলিয়াম পন্সফোর্ড (১১০ ও ২৬৬ রান/ ১৯২৪-১৯৩৪), গ্রেগ চ্যাপেল (১০৮ ও ১৮২ রান/ ১৯৭০-১৯৮৪) ও মহম্মদ আজহারউদ্দিন (১১০ ও ১০২ রান/ ১৯৮৪-২০০০)। এবার সেই তালিকায় জায়গা করে নিলেন অ্যালিস্টার কুকও।

অনবদ্য এই রেকর্ডের পাশাপাশি টেস্ট ইতিহাসে সর্বকালের সর্বাধিক রান সংগ্রহকারীদের তালিকায় শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারাকে পেছনে ফেলে পাঁচ নম্বরে উঠে এসেছেন কুক। নামের পাশে ১২ হাজার ৪০০ রান নিয়ে কেরিয়ার শেষ করেছিলেন সাঙ্গাকারা। আর ১৬১ টেস্ট খেলে কুক থামলেন ১২ হাজার ৪৭২ রানে। টেস্টে সর্বাধিক রান সংগ্রহকারীদের তালিকায় তার ওপরে রয়েছেন শচিন টেন্ডুলকর (১৫ হাজার ৯২১), রিকি পন্টিং (১৩ হাজার ৩৭৮), জ্যাক ক্যালিস (১৩ হাজার ২৮৯) ও রাহুল দ্রাবিড় (১৩ হাজার ২৮৮)। তবে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড আপাতত কুকেরই দখলে।

নিজের শেষ ইনিংসের দুই ইনিংসে তিনি এতটাই ভালো ব্যাটিং করলেন যে, কমেন্ট্রি বক্সে বসে কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকার তো বলেই ফেললেন, এখনই অবসর না নিলেই পারতেন কুক। সানির কথায়, ‘বিদায় লগ্নেও এমন অসাধারণ ব্যাটিং ভাবতেই পারছি না। একজন ক্রিকেটারের জীবনে এর চেয়ে মধুর পরিসমাপ্তি আর কী হতে পারে! সাব্বাস কুক, তোমাকে অনেক অভিনন্দন।’ এরপর ভারতের সাবেক ওপেনারটি যোগ করেন, ‘আমার মনে হয়, নিজের সিদ্ধান্তটা ওর পুনর্বিবেচনা করে দেখা উচিত। প্রয়োজনে কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার তরতাজা হয়ে খেলায় ফিরুক কুক। তবে এটা ওর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।’ গাভাসকারের পাশে বসে কুকের ব্যাটিং দেখতে দেখতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন তারকা গ্রেম সোয়ানও। তাহলে কী ইংল্যান্ড ক্রিকেটের বিশ্বস্ত ‘শেফ’ একটু তাড়াতাড়ি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। বিদায়ী টেস্টে অ্যালিস্টার কুকের ধ্রুপদী পারফরম্যান্স অদ্ভুত ধাঁধায় ফেলে দিয়েছে ক্রিকেট দুনিয়াকে।