Naya Diganta
সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং আফসোস!

সমকালীন প্রসঙ্গ
প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং আফসোস!

বঙ্গবন্ধুকন্যা এবং আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোরতর বিরুদ্ধবাদীরাও স্বীকার করবেন, তার মধ্যে অনেক ব্যতিক্রমী মানবিক গুণ রয়েছে। আশপাশের লোকগুলো যদি প্রধানমন্ত্রীর সে গুণাবলির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতেন তবে সবারই উপকার হতো। প্রধানমন্ত্রীর সৎ গুণজাত ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আশা-আকাক্সক্ষা এবং আফসোসকে যদি তার লোকেরা যথাযথ মূল্যায়ন এবং লালন করতেন তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে ভালো কিছু সৃষ্টি হতো। আমি নিজে কর্মজীবনে তাকে যেভাবে দেখেছি তাতে মনে হয়েছে যে, তিনি তার সহকর্মী ও নেতাকর্মীদের দুর্বলতা খুব ভালো করে বুঝতে পারেন। চাটুকারদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- কেবল দালালি ও চাটুকারিতার যোগ্যতা নিয়ে তার কাছ থেকে এ যাবৎ কেউ একটা পুঁটি মাছের লেজ কিংবা চিংড়ি মাছের ঠ্যাংও হাসিল করতে পারেননি। তার পরও কেন যে নিত্যনতুন চাটুকারেরা একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে জনগণের ঠাট্টা-বিদ্রুপের পাত্র-পাত্রী হচ্ছেন তা বোধগম্য হচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কেমন প্রশাসন চান এবং তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে কী ধরনের লোকদের কাছে টানেন, তার বাস্তব ও দালিলিক কিছু তথ্য দেয়ার আগে ব্যক্তি হাসিনার রুচিবোধ ও বিচক্ষণতা নিয়ে সুদূর অতীতের একটি কাহিনী বলে নেই। ঘটনাটি ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসের। আমি তখন দৈনিক ভোর নামক সেই সময়ের বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকের বার্তা বিভাগের শিফট ইনচার্জ ছাড়াও মফস্বল ও ফিচার বিভাগের প্রধান ছিলাম। পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষ ১৫ আগস্ট উপলক্ষে চার রঙের একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল, যার সার্বিক দায়িত্ব পড়ল আমার ঘাড়ে। বর্তমান সিইসি কে এম নুরুল হুদার একমাত্র শ্যালক কাম্বার শৌখিন ফটোগ্রাফার হিসেবে ভোর পত্রিকার জন্য ছবি তুলত। কাম্বারের মা অর্থাৎ সিইসির শাশুড়ি কলাবাগান থানা আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত ছিলেন বিধায় কাম্বার নেত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে চিনত। সে আমার কাছে আবদার করে বসল, আমি যেন তাকে ক্রোড়পত্রের জন্য নেত্রীর ছবি তোলার অ্যাসাইনমেন্ট দেই।

আগেই বলেছি, কাম্বার ছিল শৌখিন ফটোগ্রাফার। প্রধানমন্ত্রীর ছবি তোলার ব্যাপারে তার যে আবেগ আর আগ্রহ ছিল সে তুলনায় অভিজ্ঞতা ছিল নেহায়েত কম। প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন বাসভবন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে কাম্বার নেত্রীকে রাজি করিয়ে ফেলল ফটোসেশনের জন্য। কিন্তু ছবি তুলতে গিয়ে নেত্রী টের পেলেন, ফটোগ্রাফারের নিপুণতা কাক্সিক্ষত মানের নয়। এই পরিস্থিতিতে তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে আলো, ব্যাকগ্রাউন্ড, ড্রেস ইত্যাদির সমন্বয় ঘটিয়ে কাম্বারকে শুধু ক্লিক করার দায়িত্ব দিয়ে অসাধারণ কতগুলো ছবি উপহার দিলেন। প্রায় একই ঘটনা ঘটল তার একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়ে। মরহুম সাংবাদিক নেতা সাইফুল ইসলাম তালুকদার আমাদের পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আওয়ামী লীগ বিটে কাজ করতেন। তিনি নেত্রীর সাক্ষাৎকার গ্রহণের দায়িত্ব পাওয়ার জন্য আমাকে ধরলেন। কাম্বারের ঘটনা শোনার পর সাইফুল তালুকদারকে দায়িত্ব না দিয়ে চিফ রিপোর্টার ফিরোজ ভাইকে বললাম। কিন্তু সাইফুল সাহেব সম্পাদককে রাজি করিয়ে নেত্রীর সাক্ষাৎকার গ্রহণের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন।

সাইফুল ইসলাম তালুকদার সাংবাদিক নেতা হিসেবে বেশ পরিচিত ও কর্মঠ হলেও তার লেখার হাত ততটা যুৎসই ছিল না। তিনি পরপর দু’দিন নেত্রীর সাক্ষাৎকার নিলেন, তার প্রশ্নের ধরন দেখে নেত্রী বললেন, সাক্ষাৎকারের দরকার নেই। বরং নিজ হাতে ১৫ আগস্ট সম্পর্কে আমার বক্তব্য লিখে দেবো। তিনি যথাসময়ে সেটা করে দিলেন। আমরা ১৫ আগস্ট নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় করা আকর্ষণীয় একটি ক্রোড়পত্র বের করলাম, যা সম্ভবত পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে কোনো জাতীয় দৈনিকের প্রথম উদ্যোগ ছিল। ক্রোড়পত্রটি দেখে নেত্রী এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি তার সব প্রটোকল বাদ দিয়ে একদিন রাতে হঠাৎ দৈনিক ভোর পত্রিকায় চলে এলেন কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই। তারপর প্রাণ খুলে সাংবাদিকদের সাথে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলেন এবং দেশ-জাতি ও রাজনীতি নিয়ে অনানুষ্ঠানিক অনেক কথা বললেন। ঘটনাটি এখানে উল্লেখ করলাম ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার তিনটি অনুপম বৈশিষ্ট্যের কথা বলার জন্য। তার মতো অবস্থানে থেকে তিনি ফটোগ্রাফার কাম্বার বা প্রতিবেদক সাইফুল ইসলাম তালুকদারের সাথে যে আচরণ করেছিলেন তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের শীর্ষ নেতাদের কাছে আশাই করা যায় না। অন্য দিকে ১৫ আগস্ট নিয়ে সর্বপ্রথম একটি বর্ণাঢ্য, তথ্যবহুল এবং আকর্ষণীয় রঙিন ক্রোড়পত্র প্রকাশের কারণে তিনি স্বয়ং পত্রিকা অফিসে এসে নিজের কৃতজ্ঞ মনের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন।

উপরিউক্ত ঘটনার মতো শত-সহস্র ঘটনা ব্যক্তি শেখ হাসিনার জীবনে ঘটেছে। তিনি তার কাছে আগত লোকজনের দুর্বলতা ও অক্ষমতাকে ভর্ৎসনা করার পরিবর্তে তাদের আবেগ ও ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করেছেন। ফলে তার প্রতিপক্ষরা তার সম্পর্কে যাই ভাবুন না কেন, তিনি সবার অলক্ষ্যে এমন কিছু মানুষকে আপন করে নিয়েছেন যারা অতীতে কেবল তার জন্য এবং তাকে বাঁচানোর জন্য বন্দুকের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছেন। মানুষকে আপ্যায়ন করার অসাধারণ গুণের পাশাপাশি কারো ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদ এবং ঝক্কি ঝামেলার সময় তিনি সর্বোচ্চ মাত্রার শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে সবার পাশে দাঁড়ান। তার এসব কাজকর্মের বেশির ভাগই অতি গোপনে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে হয়ে থাকে। কত অনাথ, কত অসহায় এবং কত দরিদ্রজন যে, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত অনুদানে গত ৪০ বছরে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন সে সংখ্যা জানলে অবাক না হয়ে পারবেন না। আপনারা হয়তো অনেকে ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডির শিকার, দুটো অসহায় মেয়ের অভিভাবকত্ব গ্রহণ এবং তাদের বিয়ের ঘটনা জানেন। কিন্তু সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সংঘটিত, চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের শিকার কিশোরী পূর্ণিমার ঘটনা জানেন না।

বঙ্গবন্ধুকন্যা সে দুর্ঘটনার পর থেকেই পূর্ণিমা এবং তার পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। লেখাপড়া শিখিয়ে নিজ সন্তানের মতো বড় করেছেন তাকে। চাকরি দিয়েছেন এবং সেই থেকে আজ অবধি সপ্তাহ বা মাসের নির্দিষ্ট দিনে পূর্ণিমাকে নিজ বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে এনে আপন হাতে খাবার খাইয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সংবেদনশীল মন সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আরো বেশি কার্যকর। ১৯৯২ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মুখে একটি কথা শুনে যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিলাম। তিনি বেশ দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং মমতার দরদ মাখিয়ে বলেছিলেন- ‘শেখ হাসিনা আমার বোন। রাজনীতির স্বার্থে আমি বিএনপিতে যোগ দেবো কিন্তু তাতে কী! ভাই-বোনের সম্পর্ক তো নষ্ট হবে না।’ প্রায় একই কথা আমাকে বলেছিলেন যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রয়াত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা। ২০১৩ সালের ঈদুল ফিতরের দিন ভোরে ঢাকার কাশিমপুর জেলে তিনি বলা নেই কওয়া নেই- আমার রুমে এসে আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন এবং প্রথম কথাতেই স্বভাবসুলভ হাসিমাখা মুখে বলেন, ‘তুমি জানো! তোমার নেত্রীর সঙ্গে আমার কত ভালো সম্পর্ক।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রিমাত্রিক জীবনে উল্লিখিত গুণাবলির সুফল আমরা হয়তো অনেক বেশি মাত্রায় পেতাম যদি ব্যক্তি শেখ হাসিনা, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চার পাশের লোকজন তার সুলক্ষণগুলোকে শ্রদ্ধা করে সেগুলোর আলোকে আচরণ করতেন। ব্যক্তিজীবনে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য ও ভদ্রতা রীতিমতো অবাক করার মতো এবং তার দলের অনেক লোক তার সৌজন্য বোধকে পুঁজি করে নিজেদের অনেক কুকর্ম জায়েজ করে নেন। তিনি হয়তো কোনো নেতাকর্মী, মন্ত্রী, এমপি বা কর্মকর্তার প্রতি বিরক্ত হলেন; তখন সেই ব্যক্তি সাধারণত যে কর্মটি করেন তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সবাই কমবেশি জানেন। লোকটি একদিন বিনা নোটিশে স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাদের নিয়ে গণভবনে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের কাছে ডেকে নেবেন, আপ্যায়ন করবেন এবং তাদের সাথে হাসিমুখে ছবি তুলবেন। এ ধরনের ‘বিশ্বাসী’দের সফলতার মাত্রা শতভাগ হলেও সংশ্লিষ্ট ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর মনের ওপর কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা তার লোকেরা কখনো ভেবেছেন- এমন কথা আমি শুনিনি।

আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় তাকে একজন পরিশ্রমী, বিদূষী এবং ধর্মপরায়ণা মানবী হিসেবেই দেখেছি। তিনি জ্ঞানী, চরিত্রবান, সৎ ও বুদ্ধিমান মানুষজনের প্রতি যারপরনাই দুর্বল। তিনি যতটা আগ্রহ নিয়ে এ ধরনের লোকদের কাছে টানার চেষ্টা করেন, তার আশপাশের লোকেরা তার চেয়েও বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ওই সব লোক যেন দ্বিতীয়বার তার কাছে যেতে না পারেন সেই ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে রাখেন। ফলে সাধারণ মানুষ ব্যক্তি শেখ হাসিনার মানবিক সত্তা ও মূল্যবোধ খুব কমই অনুধাবনের সুযোগ পায়। সাধারণ মানুষ তাদের সাধারণ বোধবুদ্ধির কারণে ব্যক্তি শেখ হাসিনা, তার দলীয় পদ এবং প্রধানমন্ত্রিত্বের সত্তাকে গুলিয়ে ফেলেন। রাজনীতি, প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল কাজ করতে গিয়ে একজন মানুষকে যে কতটা বেশি দায়-দায়িত্বের বেড়াজালে জড়াতে হয় এবং অসহায়ত্বের মধ্যে পড়তে হয়, তার বাস্তব একটি বর্ণনা শুনেছিলাম পরলোকগত বেনজির ভুট্টোর একটি সাক্ষাৎকারে। স্টার প্লাসের সিমি গাড়োয়ালকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি তার সাধারণ জীবন, ‘রাজকুমারী’ হয়ে ওঠার গল্প, প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং উদ্বাস্তু জীবনের উপাখ্যান এত চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন, যার মাধ্যমে পৃথিবীর সর্বকালের অসহায় রাজনীতিবিদদের জীবনচিত্র বাস্তবভাবে ফুটে উঠেছে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মন-মানসিকতা, দূরদর্শিতা আর আন্তরিকতার কয়েকটি বাস্তব ঘটনা বলে আজকের নিবন্ধের ইতি টানব। ২০০৯ সালের প্রথম দিকে সংসদীয় কমিটির একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অনেকে অভিযোগ করেন, ওমুক কর্মকর্তা বিএনপি করে- তমুক কর্মকর্তা জামায়াতের কর্মী ইত্যাদি। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী সাফ সাফ জানিয়ে দেন, আমলাতন্ত্রের ছলচাতুরী তিনি খুব ভালো করেই জানেন। ভালো কর্মকর্তারা দলবাজি করে না; আর দলবাজ কর্মকর্তারা যারা মেধা যোগ্যতা ও দক্ষতায় ভালো কর্মকর্তাদের সাথে পেরে ওঠে না, তারাই রাজনৈতিক সরকারকে বিভ্রান্ত করার জন্য ওই সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দলবাজির অভিযোগ তোলে। কাজেই ওই সব বলে লাভ হবে না। প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের কথা তিনি তার ক্ষমতার বলয়ে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। গত ১০ বছরে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সংস্থাপন সচিব, কেবিনেট বা মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, অর্থ সচিব এবং পররাষ্ট্র সচিব ও প্রতিরক্ষা সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পদগুলোয় একজনও দলবাজ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেননি। বরং এমন সব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে দলবাজরা দশ গলায় জামায়াত-বিএনপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব বা পিএস, তার কার্যালয়ের মহাপরিচালক এবং তার সচিব পদে তিনি যথাসম্ভব সতর্কতার সাথে বেছে বেছে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন। অনেকে প্রথম দিকে সৎ ছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসার পরবর্তী সময়ে তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে নানা রকম অভিযোগ উত্থাপিত হতে থাকে। আমি সংসদ সদস্য থাকাকালে বাংলাদেশের নামকরা জাতীয় দৈনিকে প্রধানমন্ত্রীর দু’জন সচিবের বিরুদ্ধে দু’বার উপ-সম্পাদকীয় লিখেছিলাম। ফলে তাদের অনতিবিলম্বে বদলি করা হয়েছিল। সেই অভিযুক্ত কর্মকর্তাদ্বয় পরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে পারেননি। একইভাবে অনেক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে লেখার পর দেশবাসী তার সুফল পেয়েছেন। খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করি যে, আমাদের সংবাদপত্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বুদ্ধিজীবীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিরপেক্ষভাবে জনকল্যাণের জন্য সাধারণত কোনো কিছু উপস্থাপন করেন না। তাদের কেউ কেউ তাকে অতিমানবী বা সুপারলেডি আখ্যা দিয়ে তাকে এমনভাবে ঊর্ধ্বলোকে তুলে রাখতে চান যেখান থেকে মানবের বেদনা-দুঃখ-কষ্ট-যাতনা সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না। অন্য দিকে আরেক পক্ষ রয়েছেন যারা প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সত্তাকে স্বীকার করেন না। প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে যেকোনো ভালো বা শুভকর্ম সম্ভব, তা তারা বিশ্বাস করেন না। ফলে রাষ্ট্রক্ষমতার বিপুল সম্ভাবনাকে তারা জনকল্যাণে ব্যবহার করতে পারেন না।

প্রধানমন্ত্রীর একান্ত কাছের লোকেরা তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারলে দেশের রাজনৈতিক সম্প্রীতি, গণতন্ত্র এবং সামাজিক সংহতি আরো ভালো অবস্থায় থাকত। বঙ্গবন্ধুকন্যা তার পিতার মতোই ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। রাজনৈতিক বিরোধ এবং শত্রুতা সত্ত্বেও তিনি প্রতিপক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখতে ইচ্ছুক। প্রধানমন্ত্রীর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমরা লক্ষ্য করেছি, তিনি তার দরজা ব্যক্তিগত রাগ-ক্ষোভ, অভিমান ও স্বার্থের কারণে কারো জন্য কোনো দিন বন্ধ করেননি। ফলে ১৯৯৬-২০০১ সালে বিএনপি শাসনামলে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী সোনা নিয়ে মহাআপত্তিকর একটি মন্তব্য করার দু’তিন দিন পর সস্ত্রীক শেখ হাসিনার বাসায় উপস্থিত হয়ে যথারীতি আপ্যায়িত হয়েছিলেন। আজকের মতিয়া চৌধুরী, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, হেফাজতে ইসলাম প্রমুখ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সাথে তার রাজনীতি- এ কথাই প্রমাণ করে যে, তিনি ব্যক্তিগত ক্ষোভ রাগ-অনুরাগে তাড়িত হয়ে রাজনীতি করেন না। কাজেই বর্তমানে যাদের সাথে তার রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে, তা উল্লিখিত লোকদের সাথে সৃষ্ট অতীত বিরোধের তিক্ততার মাত্রা এখনো অতিক্রম করেনি। ফলে যারা শেখ হাসিনার সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে আশাহত অবস্থানে আছেন, তারা হয়তো তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মূল্যায়ন করতে পারেননি।

আলোচনার এ পর্যায়ে এবার প্রধানমন্ত্রীর আফসোস নিয়ে কিছু বলা যাক। তিনি প্রায়ই আফসোস করে বলেন, তার দল, সরকার এবং দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক কথা কেউ লেখে না। অথচ সাধারণ মানুষ জানে ও বিশ্বাস করে, দেশের সব মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত। সরকার সমর্থক বক্তা ও লেখকেরা দিনরাত নানা লেখনী ও বক্তব্যে সরকারের সব কর্ম ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করে যাচ্ছেন। দেশে এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, গাছের লতা-পাতা, ফসলের মাঠ এবং পাখ-পাখালি সমস্বরে ‘আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগ’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তুলছে। তার পরও কেন প্রধানমন্ত্রীর আফসোস হচ্ছে; অথবা কেন তিনি কৌতুক করে বলেন- ‘আওয়ামী লীগের পক্ষে লিখতে বললে যে করে কান্না! তার নাম মান্না!’ আমার সূক্ষ্ম বুদ্ধিতে যতটুকু বুঝি, তাতে মনে হয়, প্রধানমন্ত্রীর এই আফসোসের মধ্যেই গণতন্ত্র, শুভবুদ্ধি ও সত্যের জয়গানের বীজ লুকানো রয়েছে। কারণ এই আফসোস দিয়ে তিনি তার সরকারের অনেক প্রচার-প্রপাগান্ডাকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন তার ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে। তিনি চান বিশ্বাসযোগ্য, সৎ, চরিত্রবান এবং জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় লোকেরা সরকারের ভালোমন্দ নিয়ে নিরপেক্ষভাবে কথা বলুক, লিখুক এবং প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিক। প্রধানমন্ত্রীর এই আফসোসের মর্যাদা দেয়ার জন্য দূরবর্তীরা অগ্রসর হলে নিকটবর্তীরা যা করেন তা নিয়ম করে বন্ধ করা না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না এবং আফসোসের মাত্রা বাড়তেই থাকবে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য