Naya Diganta

বাংলাদেশের প্রধান সামাজিক সমস্যা ও করণীয়

বাংলাদেশের প্রধান সামাজিক সমস্যা ও করণীয়

বাংলাদেশের প্রধান প্রধান সামাজিক সমস্যাগুলো আলোচনা করছি। এসব সমস্যা বেশির ভাগ দেশেই আছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও। সামাজিক সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা ও রাজনৈতিক সমস্যার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর সমান এবং এমনকি অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১। ধূমপান- এটা একটি ভয়াবহ সমস্যা। এর ফলে জনগণের বিরাট অংশের স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য খাতে খরচ বাড়ছে। অথচ বেশির ভাগ বিশিষ্ট আলেমের মতে, ধূমপান করা হারাম। যারা এ কথা বলেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ আলেম ও চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ আল কারজাবি। সিগারেট উৎপাদকেরা এটা বন্ধ করতে চান না। এ প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আমাদের সিগারেট উৎপাদন ও আমদানি বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার ও আলেমদের দায়িত্ব অনেক।
২। মাদকদ্রব্য-এর ব্যবহার ইসলামে হারাম। কুরআন সরাসরি এটি হারাম ঘোষণা করেছে। মদ, গাঁজা, চরস, মারিজুয়ানা ও ইয়াবাসহ নানা নামে মাদক ব্যবহার চলছে। এটা বন্ধ করতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩। গৃহে স্ত্রীকে প্রহার। এটি একটি বড় সমস্যা। পুরুষেরা যেহেতু তুলনামূলক শক্তিশালী, তাই তাদের অনেকে আজো স্ত্রীদের প্রহার করে। এ ব্যাপারে ইসলামি শরিয়তের অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। অথচ আল্লাহর রাসূল সা: স্ত্রীদের প্রহার করতে নিষেধ করেছেন। কিছু আলেম বলেছেন, স্ত্রীরা যদি নৈতিক অপরাধ করেন, তবে বেশি হলে মিসওয়াক দ্বারা ‘প্রহার’ করা যায়। অন্য আলেমদের মতে ‘দারাবা’ শব্দের অর্থ ‘দূরে চলে যাওয়া’ ধরে নেয়া যেতে পারে; যেমন রাসূল সা: স্ত্রীদের সাথে মতবিরোধের কারণে কিছু দিনের জন্য অন্য বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন।

৪। যৌতুক- পুরুষদের স্ত্রীর পক্ষ থেকে যৌতুক গ্রহণ করা বৈধ নয়। ইসলামে স্ত্রীকে মোহরানা দেয়া এবং ভরণপোষণ দেয়া স্বামীর দায়িত্ব। অথচ আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে অনেক বেশি যৌতুক নানা অজুহাতে নেয়া হয়। আলেমদের এ ব্যাপারে সঠিক নির্দেশনামূলক খুতবা দেয়া এবং ওয়াজ করা উচিত।

৫। ইভটিজিং বা রাস্তাঘাটে নারীদের বিরক্ত করা। বিশেষ করে কিশোরী-তরুণীদের গায়ে হাত দেয়া ও অশ্লীল মন্তব্য করা একটি বড় সমস্যা। এখন এর ব্যাপকতা খুবই বেশি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা গড়ে তোলার ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি সর্বপ্রকার অশ্লীলতার প্রচারও বন্ধ করা উচিত। প্রত্যেক এলাকায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উচিত এ জন্য শক্ত পদক্ষেপ নেয়া। দেশের আইনও সুষ্ঠুভাবে কার্যকর করা দরকার।

৬। প্রত্যেক শহরে কম বা বেশি শিশু-কিশোরী-নারী মানসিক ভারসাম্যহীন প্রভৃতি ধরনের ব্যক্তি পথে থাকে। তাদের উপযুক্ত পুনর্বাসনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদের নেয়া কর্তব্য। সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিদের দুইজন বা কয়েকজন একত্র হয়ে অনেককে পুনর্বাসন করতে পারেন।
৭। ঘরে যেসব লোক কাজ করেন, যাদের বেশির ভাগ কিশোরী বা নারী, তাদের মৌলিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা করা দরকার। তাদের কাজের সময় দিনে ১০ ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়। তাদের বিশ্রাম নেয়ার সময় দেয়া উচিত। এ গৃহকর্মীদের বেতন শ্রম আইনের মোতাবেক হওয়া উচিত। তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব গৃহকর্তাকেই নিতে হবে। এ ব্যাপারে যে আইন আছে, তা কার্যকর করা উচিত।

৮। শহরাঞ্চলে যেসব মহিলা কাজ করেন, তাদের মধ্যে যারা অবিবাহিতা বা যাদের পরিবারের সাথে থাকার সুযোগ নেই, তাদের জন্য থাকার হোস্টেল স্থাপন করা উচিত। এ ব্যাপারে মহিলা মন্ত্রণালয় এবং এনজিওগুলোর ব্যাপক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এখন এ ধরনের হোস্টেল সুবিধা খুবই কম।

৯। আমাদের দেশে মামলা অনেক বেশি। মামলার খরচ বহন করতে গিয়ে অনেক মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। তাই সারা দেশে ঋৎবব ষবমধষ ধরফ বা বিনামূল্যে আইনগত পূর্ণসহায়তা (কোর্ট ফিসহ) দেয়ার ব্যবস্থা আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে করা উচিত।
১০। নদীভাঙনে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ লোক গৃহহীন হচ্ছে। তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য অর্থ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় মিলে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা উচিত।

আশা করি সরকার, এনজিও এবং সচ্ছল ব্যক্তিরা এসব বিষয়ে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেবেন।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার