Naya Diganta

লাল শাপলার গ্রাম

প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই মাতৃভূমি বাংলাদেশ। মায়ের মমতা ও ভালোবাসার মতোই যেন এই প্রকৃতি। আমাদের দেশের একেক অঞ্চলের প্রকৃতির রূপ ও সৌন্দর্য ধরা পড়ে একেকভাবে। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ রয়েছে প্রকৃতি। যেখানে রয়েছে মানুষের আয়ের উৎস। আর এই সম্পদ আহরণ করে দেশে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে অনেক পরিবার। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা বরিশাল। বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার দক্ষিণ সাতলা গ্রামের বিলে শরতের অসংখ্য লাল শাপলা প্রাকৃতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য। এই গ্রামের সাতলা বিলে গেলে চোখে পড়বে লাল-সবুজের হাতছানি। লাল-সবুজের সমারোহ দেখে রীতিমতো অবাক হতে হবে আপনাকে। দেশের সব জেলাতেই কমবেশি প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় শাপলা, কিন্তু লাল শাপলার জন্য বিখ্যাত এ সাতলার বিল। দূর থেকে এই গ্রামটি দেখতে খুবই চমৎকার আর খুব কাছ থেকে দেখলে মনে হবে কেউ লাইনে লাইনে রোপণ করেছে এই শাপলা। জলজ উদ্ভিদ হিসেবে লাল শাপলা এ অঞ্চলের মানুষের সৌন্দর্যের পাশাপাশি খাদ্যের জোগান দিচ্ছে।
সাতলা গ্রামে লাল শাপলার বিলে গেলে চোখ জুড়িয়ে যাবে জাতীয় ফুল শাপলার বাহারি সৌন্দর্যে। আগাছা আর লতাগুল্মে ভরা বিলের পানিতে ফুটে আছে হাজার হাজার লাল শাপলা। সূর্যের সোনালি আভা শাপলাপাতার ফাঁকে ফাঁকে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এই বিলের সৌন্দর্য। নৌকা কিংবা হাঁটুপানি মাড়িয়ে বিলের মধ্যে প্রবেশ করলে একপর্যায়ে মনে হবে শাপলার স্বর্গরাজ্যে বন্দী হয়ে গেছেন আপনি। মনে হবে মৃদু বাতাসের সাথে সাথে লাল শাপলা আপনাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। লাল শাপলার হাসি বিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে পরশমাখা ভালোবাসায়। বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলা। উজিরপুর সদর থেকে আরো ২০ কিলোমিটার দূরে সাতলা গ্রাম। গ্রামের নামেই বিলের নাম সাতলা বিল। ইতোমধ্যে বরিশাল বিভাগের গণ্ডি পেরিয়ে বিলের সৌন্দর্যের গল্প ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য স্থানে। বিশেষ করে শহরে ইট-পাথরের বন্দিশালা থেকে একটু উন্মুক্তভাবে জীবন কাটানো মানসিক প্রশান্তির জন্য এখানে ছুটে আসছেন অনেকে।
পর্যটকদের বিনোদন ছাড়াও এই বিলের শাপলা স্থানীয়দের অন্নের জোগান দিচ্ছে। মনোমুগ্ধকর ঐতিহ্যবাহী এ বিলের মোট আয়তন সম্পর্কে স্থানীয়দের কারোরই জানা নেই। তবে স্থানীয় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, প্রায় ১৬০০ হেক্টর জমি নিয়ে বিস্তীর্ণ এ বিল। শাপলার বিলে ঠিক কত বছর আগ থেকে এভাবে শাপলা জন্মাতে শুরু করেছে সে তথ্যও সঠিকভাবে দিতে পারেননি কেউ। তবে স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব কয়েকজন জানালেন, তাদের জন্মের পর থেকেই এ বিলে এভাবে শাপলা ফুটতে দেখছেন তারা। তা ছাড়া শাপলার বিল শুধু সৌন্দর্য নয়, বিল থেকে শাপলা তুলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে এ অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার। বিল সংলগ্ন গ্রামের শাপলা বিক্রেতা মো: ফজর খান জানান, বছরের ছয় মাস তারা এই বিলের শাপলার ওপর নির্ভরশীল। বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ ও মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে শতাধিক পরিবার। সাতলা গ্রামের আরেক যুবক মো: কলিমুল্লাহ জানিয়েছেন, সবজি হিসেবে এই লাল শালপার অনেক চাহিদা রয়েছে। যে কারণে বাজারে বিক্রি করে ভালো উপার্জন করছেন তারা। শাপলার মাটির নিচের অংশে থাকে শালুক ও ফুল থেকে সংগৃহীত দানা দিয়ে তৈরি করা হয় এক প্রকার মুড়ি যা খেতে খুবই সুস্বাদু। বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত শাপলা তিন প্রকারের হয়ে থাকে। এর মধ্যে সাদা, বেগুনি ও অন্যটি লাল রঙয়ের। সাদা ফুলবিশিষ্ট শাপলা সবজি হিসেবে ও লাল রঙের শাপলা সবজি ও ঔষধি কাজে ব্যবহৃত হয়। শাপলা খুবই পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি। সাধারণ শাকসবজির চেয়ে এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। শাপলায় রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম। শাপলায় ক্যালসিয়ামের পরিমাণ আলুর চেয়ে সাতগুণ বেশি। যা মানবদেহের জন্য খুবই উপকারী।
সম্প্রতি বিল ঘুরে দেখা যায়, বিলের পাশর্^বর্তী বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো না কোনো কাজে ব্যয় করছেন। ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকার সাহায্যে বিল থেকে কেউ শাপলা তুলছেন আবার কেউ মাছ শিকারে ব্যস্ত। আবার কেউ কেউ এই বিল থেকে গো-খাদ্য সংগ্রহ করছেন। বিল থেকে শাপলা তুলে অনেকেই বিক্রি করেন স্থানীয় বাজারে। স্থানীয়দের অনেকে জীবিকার জন্য বছরের একটা সময় বিলের শাপলা ও মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল। বাগদা গ্রামের আসলাম পাটোয়ারী জানান, জন্মের পর থেকেই বিলে এভাবে শাপলা ফুটতে দেখছেন তারা। সাধারণত আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিলে শাপলা থাকে। সাতলা গ্রামের আবু রায়হান শেখ বলেন, শাপলা দেখার জন্য প্রতিদিন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন এখানে ঘুরতে আসে। যে কারণে সাতলা গ্রাম দিন দিন সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে। এখানে দর্শনার্থীদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা করা গেলে একসময় পর্যটন নগরীতে পরিণত হবে সাতলা গ্রাম।
দণি বাগদা গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন তার ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে প্রতিদিনই শাপলা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেন। তিনি জানান, বিকেলে এ বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরের দিন স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে উপার্জিত আয় দিয়ে চলে তার সংসার। বছরের অন্য সময়গুলোতে দিনমজুরের কাজ করলেও এই মওসুমে শাপলা বিক্রি করে চলে তার সংসার। ১৫ থেকে ২০টি শাপলার একটি আঁটি বিক্রি হয় পাঁচ থেকে ১০ টাকায়। শাপলা বিক্রি করে প্রতিদিন আয় হয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এ বিলের শাপলা বরিশাল, পিরোজপুর ও ফরিদপুরের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যেই আলোচনায় উঠে এসেছে লাল শাপলার নানা দিক।
যে কারণে লাল শাপলার কথা শুনে ভ্রমণপিপাসু দর্শনার্থীরা ছুটে যান উজিরপুরে। অনেক পর্যটন গ্রুপ কাজ করছে সাতলা বিলের সম্ভাবনা নিয়ে। বেড়াই বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী মাহমুদ হাসান খান বলেন, আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান অযতেœ অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
এগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মওসুমি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। জানা গেছে, এ বিলের লাল শাপলা ঘিরে নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন চিত্র, যা থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ জমা হচ্ছে। ফলে দিন দিন দর্শনীয় স্থান হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে রবিশাল জেলার উজিরপুরের সাতলার লাল শাপলা বিল। লাল শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আপনাকে সকাল ৮টার মধ্যে পৌঁছতে হবে সেখানে। লাল শাপলার বিল ঘুরে দেখানোর জন্য রয়েছে ছোট ছোট অসংখ্য নৌকা।