Naya Diganta

আমাদের ঈদ সংস্কৃতি

ঈদ এলেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসা একটি গান কানের কাছে এসে গুন গুন করে ‘ঘুরেফিরে বারবার ঈদ আসে ঈদ চলে যায়, ঈদ হাসতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়, ত্যাগের মহিমা শেখায়।’ ওই সময়ে গানের কথাগুলোর মর্মার্থ সেভাবে বুঝতে না পারলেও যখন বড় হলাম, তখন স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে পারলাম। সেই সাথে এটাও বুঝলাম, শেখানো কিংবা শেখাতে চাওয়া আর শেখা বা শিখতে চাওয়া এক কথা নয়। ঈদ আমাদের ভালোবাসতে শেখায়, ত্যাগের মহিমা শেখায়। কিন্তু আদৌ কি আমরা ভালোবাসতে শিখি? ত্যাগের মহিমা শিখি? এর উত্তর কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ‘না’। যদি তা-ই না হতো, তাহলে ঈদে আমাদের সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত না হয়ে এক ভাগই থাকত। ঈদ আমাদের ভালোবাসতে শেখায়, সেই সুবাদে ধনীরা গরিবকে ভালোবাসে ঠিকই, তবে সেটা জাকাতের কাপড় বিতরণের মাধ্যমে। জাকাত গরিবের প্রতি ধনীর দয়া বা করুণা নয়, বরং এটা গরিবের অধিকার। তবু ঈদ এলেই দেখা যায় শাড়ির দোকানগুলোতে আলাদা স্টিকার লেগে যায়Ñ ‘এখানে জাকাতের শাড়ি পাওয়া যায়।’ খোঁজ নিলে দেখবেন জাকাতের শাড়ি মানেই সস্তা আর অতি নিম্নমানের কাপড়। তার মানে বেশির ভাগ ধনীরই এই মনোভাব থাকে, কাপড় আমি দিচ্ছি, তুমি সেটা ব্যবহার করতে পারবে কি পারবে না তোমার ব্যাপার। আমার দায়িত্ব শেষ। গরিবের প্রতি ধনীদের এই দায়সারা মনোভাব যত দিন না দূর হবে, তত দিন জোর দিয়ে বলা যাবে না ঈদ সত্যি সত্যি আমাদের ভালোবাসতে শেখাতে পেরেছে। আর ত্যাগের মহিমা? না, ত্যাগের মহিমাও শেখাতে পারেনি। আমরা শিখিনি। শিখতে চাইনি, চাই না। ঈদুল আজহার কথাই ধরা যাক। এই ঈদকে কেন্দ্র করে আমাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের কথা ছিল। যেখানে ত্যাগ স্বীকার করতে গিয়ে ইবরাহিম আ: তার নিজ পুত্রকে কোরবানি করতে চেয়েছিলেন, সেখানে পশু কোরবানি করতে গিয়েও আমরা নিজেদের জড়িয়ে ফেলি বিভিন্ন আপত্তিকর কাজে। বিশেষ করে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। প্রতিবেশী এক লাখ টাকার গরু কোরবানি দিচ্ছে, তাই আমাকে দিতে হবে দুই লাখ টাকারটা। নিদেনপক্ষে দেড় লাখ টাকারটা তো চা-ই চাই। নইলে ‘প্রেস্টিজ’ থাকে না। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা কোরবানিকে প্রেস্টিজ ইস্যু বানিয়ে ফেলেছে কিছু মানুষ। ত্যাগের নয়। কেউ কেউ আবার মওসুমভর গোশত খাওয়ার কুমতলব নিয়েও কোরবানি দেয়। ফলে ত্যাগের বিষয়টা একেবারেই অধরা থেকে যায়। আমাদের ঈদ সংস্কৃতির একটা বড় অংশজুড়ে মতান্তরে পুরোটাই থাকে নাড়ির টানে একাত্ম হওয়ার বিষয়টি। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে হয়তো আমরা প্রিয়জন আর প্রিয়স্থানকে ছেড়ে দূরে থাকি। কিন্তু ঈদ এলে সেই দূরত্ব ঘুচে যায়। যেকোনো মূল্যে আমরা সেটি ঘুচিয়ে ফেলি। ঈদের মওসুমে যানবাহনের টিকিট পাওয়া যুদ্ধজয়ের সমান। তবু আমরা এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হই এবং জিতেই তবে ক্ষান্ত হই। কারণ আমাদের চোখে তখন ভাসতে থাকে মায়ের মুখ, প্রিয়তমার লাজুক অবয়ব আর গ্রামের অবারিত সবুজ প্রান্তর। ঈদের দুই বা তিন দিনের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া কিংবা ফিরে আসার পথে আমরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হই। কিন্তু কোনো দুর্ভোগকেই আমরা দুর্ভোগ মনে করি না, স্মরণে রাখি না।
যদি স্মরণে রাখতাম বা দুর্ভোগ মনে করতাম, তাহলে প্রতিবার বাড়ি যাওয়ার কথা হয়তো কল্পনায়ও আনতাম না। ঈদের ছুটি কাটিয়ে দিতাম ঘুমিয়েই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এখন হাজারটা উপলক্ষ। এসব উপলক্ষকে কেন্দ্র করে প্রিয়জনকে উপহার দেয়াই যায়। দেয়ার প্রচলন আছেও বটে। তবে ঈদকে উপলক্ষ করে প্রিয়জনকে উপহার দেয়ার যে আনন্দ, এই আনন্দের সমতুল্য আর কোনো কিছুই হতে পারে না।
ঈদুল আজহায় ধনী-গরিব নির্বিশেষে আমরা সবাই ঈদগাহে মিলিত হই। ঈদের নামাজের মাধ্যমে এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং তার বিধিবিধান জানার মাধ্যমে এক ভ্রাতৃসমাজ গড়ার প্রেরণা লাভ করি। নামাজ শেষে আমরা হাসিমুখে কোলাকুলির মাধ্যমে ভেদাভেদ পরিহার করে মিলনের মালা গাঁথি। এরপর আল্লাহর উদ্দেশে পশু কোরবানি করে গোশত বণ্টনের সময়ও আমরা মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে থাকি। কোরবানিদাতা শুধু নিজেই কোরবানির গোশত ভোগ করেন না, আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে তা বণ্টন করে তিনি কোরবানির ইবাদতকে পূর্ণ করেন। কোরবানির এই চেতনা এক দরদি সমাজগঠনে আমাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কিন্তু এ পথে আমরা কতটা এগিয়েছি, বর্তমান সমাজ-বাস্তবতায় বোধ হয় সেই প্রশ্ন করাই যায়।
কিন্তু কিছু দিন আগে আমার এক বন্ধুকে আমাদের পাড়ার ঈদগাহ সম্পর্কে বলছিলাম। বলছিলাম, একটা সময় পুরো এলাকার এমনকি আশপাশের এলাকার লোকজনও আসত আমাদের পাড়ার ঈদগাহে নামাজ পড়ার জন্য। বছরের পর বছর এটাই চালু ছিল। কিন্তু আধুনিক সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের মনমানসিকতাও পাল্টে গেল। তাদের মনে হলো আরেক পাড়ার ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়ব কেন? আমাদের পাড়ায়ই তো খোলা মাঠ আছে, এটাই তো ঈদগাহ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কেউ কেউ আবার আয়ের ব্যাপারটাও দেখল। যেহেতু সদকা-ফিতরার টাকা ভালোই ওঠে। এভাবে পাড়ায় পাড়ায় ঈদগাহ হয়ে গেল। আমাদের পাড়ার ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহে নামাজ পড়ার মতো পাড়ার লোকজন ছাড়া আর কেউ থাকল না। আমার কথা শুনে বন্ধু বলে উঠল, ঠিক একই দশা নাকি তাদের ঈদগাহেরও। পরে জানলাম, প্রায় সব এলাকায়ই নাকি মানুষ এখন বিচ্ছিন্নভাবে ঈদের নামাজ পড়ে। একই ঈদগাহে পুরো এলাকার মানুষ জড়ো হওয়ার ঘটনা এখন বিরল। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এটা আমাদের ঈদসংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ। ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে যদি ঈদগাহের সংখ্যা বাড়তেই থাকে, তা হলে ঈদ যে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসে, সেই বার্তা আমরা কতটুকু সাদরে গ্রহণ করলাম? ঈদের নামাজের পর সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে যদি অন্যের সাথে কোলাকুলিই না করতে পারলাম, তাহলে কিসের ঈদের নামাজ? বছরে মাত্র দুবারই তো একত্রিত হওয়া। এই দুবার কি একই ঈদগাহে একত্রিত হওয়া যায় না? কেন পাড়ায় পাড়ায় ঈদগাহ থাকতে হবে? একটা সময় ছিল, যখন ঈদের মৌসুম এলেই জমজমাট হয়ে উঠত ঈদকার্ডের দোকানগুলো। আহা! কত রঙ আর বাহারের ঈদকার্ড! সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন কার্ডটি কিনে এনে প্রিয় কিছু কথা লিখে প্রিয়জনের হাতে ধরিয়ে দেয়া কিংবা তার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়াÑ আহা! ঈদকার্ডের সেই দিনগুলোর কথা মনে করতে গিয়ে যতই আমাদের বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ^াস বের হোক, তবু মানতেই হবে এই ডিজিটাল সময়ে ঈদকার্ড বড়ই বেমানান। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় তো থেমে নেই। মোবাইল আছে, ই-মেইল আছে, ফেসবুক আছে, ইমো আছে, ভাইভার আছে, স্কাইপ আছে। যখন তখন যে কাউকে শুভেচ্ছা জানানো যেতে পারে। শুধু মনে শুভ ইচ্ছে থাকলেই হলো।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী