Naya Diganta

গোশতের ঘ্রাণ


সেই ছোটবেলা থেকেই দেখছি আমার নানা প্রতি বছরই কোরবানি দিয়ে আসছেন। নানার গোয়ালভরা গরু ছিল। নানা নিজের পালের পোষা গরুই কোরবানি করতেন। ঈদের আগের দিন বিকেলবেলা কোরবানির নিয়তে রাখা গরুটা নানাদের বাড়ির খলাটে আলাদা বেঁধে রাখা হতো। চালের কুঁড়া, ভাত, ভূষি দেয়া থাকত সামনে। পাড়ার মানুষ দলবেঁধে দেখতে আসত। বাইরে থাকা চাকরিজীবীরাও দেখতে আসত। আর তাদের গরু দেখতে যাওয়ার দাওয়াত দিত। ওদিকে বাড়ির ভেতরে চলত নানা ব্যস্ততার আয়োজন। মা, খালা, নানী আর মামীরা ঈদের দিনের রান্নাবান্নার আইটেম নিয়ে নানা প্রস্তুতি সারতেন। মামাদের রাস্তা দিয়ে পাড়ার ছেলে-বুড়ো সবাই হৈ-হল্লা আর চেঁচামেচি করে বেড়াত। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখতাম। এই করতে করতে সন্ধ্যায় ঢেকে আসত চার পাশ। চুপ করে গিয়ে বসতাম নানার পাশে। নানার মুখে নানার জীবনের বাস্তব সব গল্প শুনতাম। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের মেম্বর ছিলেন নানা। রাজনীতি করেছেন বহু বছর। আর ওদিকে বহু দিন পর নানী তিনার মেয়েদের কাছে পেয়ে সংসারজীবনের তাবৎ গল্প জুড়ে দিতেন। এসব গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম নিজের অজান্তেই। সকালে নানার ডাকে ঘুম ভাঙত। ফজরের নামাজ পড়তে ডাকতেন। আমি উঠে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম কিছু না বুঝেই। সেজো মামা আর ছোট মামার সাথে কোরবানির গরুকে পুকুরে গোসল করাতে নেমে যেতাম। নামাজ পড়তে যেতাম। ঈদগাহ থেকে ছোট মামার সাথে এটাসেটা কিনে বাড়ি ফিরতাম। সেজো মামা বাড়ি ফিরতেই বাড়ির সবাই গিয়ে ভিড় করত খলাটে। গরু নিয়ে যাওয়া হবে কোরবানি করতে। মামাদের গ্রামের এই নিয়মটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগত। গ্রামের সব কোরবানির পশু একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাওয়া হতো প্রথমে। জায়গাটার নাম ছিল কাজীদের নারকেলবাগান। বাড়ির সবাই গা, পিঠ ডলে বিদায় জানাত। সেজো মামা গরুর শিংয়ে সরিষার তেল মালিশ করে দড়ি ধরে রওনা দিতেন নারকেলবাগানের উদ্দেশে। ওখানে যাদের গরু আগে যাবে তাদেরটা আগে জবাই ও বণ্টন করা হবে। সিরিয়াল পড়ে যেত। নানাদের বড় গ্রাম। বড় বড় গৃহস্থালির বসবাসও গ্রামে। প্রবাসী বড়লোকের সংখ্যাও অনেক। তাই তো কোরাবনির পরিমাণও বেশি। ঘনবসতি অনেকটা। ওখানে যেয়ে দেখতাম আমাদের যাওয়ার আগেই তিন-চারটা কোরবানির পশু জবাই হয়ে বণ্টন চলছে। প্রতি বারই সেজো মামা বলতেন, এইবার ভুল করেছি করেছি, ফিরেবার আরো আগে আসব। কিন্তু প্রতিবারই পেছনে পড়তে হতো। সব গরু কোরবানি ও বণ্টন করতে করতে আসরের ওয়াক্ত ধরত। আমি বসে দেখতাম গোশত কাটাকাটি। দলবেঁধে বসত গোশত কাটাকাটির মানুষগুলো। এগুলো করতে কাটাকাটির জন্য প্রত্যেক গৃহস্থ নিজের ভাগের থেকে গোশত দিতেন। ছোট মামা আমার জন্য গরুর ফুন্না চেয়ে আনত। ওটা কলসের মুখে দিয়ে শুকিয়ে ঢোল বানাতে হয়। ছোট মামা, সেজো মামা বেতে বোনা ধামা ও বড় ডিশের পাত্রে নিজেদের ভাগের গোশত দিয়ে বাড়ি ফিরত। আমি পেছন পেছন হাঁটতাম। ছোট মামা বাড়ি ফিরে খেজুরের রসের কলস দিয়ে ঢোল বানিয়ে দিতেন। সেজো মামা, বড় মামা ব্যস্ত থাকতেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গোশত পৌঁছানোর কাজে। বাড়িতে বড় ড্যাগে করে নানী গোশত রান্না করতেন। নানা কোরবানির গোশত দিয়ে ইফতার করতেন। আর পাড়া থেকে বিভিন্ন মানুষ আসত, গোশত খেতে দিতেন সবাইকে। এভাবে খাওয়া ও খাওয়ানোর কাজের ব্যস্ততায় রাত গভীর হয়ে যেত। মামাদের বাড়ির টিভিঘরে সিনেমাপাগল মানুষে গিজগিজ করত ঈদের সিনেমা দেখার জন্য। চার দিক থেকে গরুর গোশত আর ছাগলের গোশতের ঘ্রাণ নাকে এসে লাগত। নানা এখনো কোরবানি দেন; কিন্তু পালে গরু নেই। দেখাশুনার লোকের অভাবে গরু নেই। মামারা সব বিদেশ। গরু কিনে কোরবানি করেন। কিন্তু গ্রামের পরিস্থিতি এখনো আর সেই রকম নেই। মানুষে মানুষে মিল-মহব্বতও কমে গেছে। এখন যার যার বাড়ি যার যার পশু কোরবানি করা হয়। সে রকম আনন্দ আর ভালো লাগার বড্ড অভাব অনুভূত হয় আজ।
মনোখালী, হরিতলা, মাগুরা