Naya Diganta

মানে পিছিয়ে পড়ছে ব্যাংকিং খাত

মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিছিয়ে পড়ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের জোগান, খেলাপি ঋণের হার, তারল্য পরিস্থিতি, মুদ্রার বিনিময় হার ও সুদহারের জোগান সূচকে আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে দেশীয় ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকগুলোর এ দুর্বল অবস্থানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষ্পত্তি ব্যয় বেড়ে চলেছে। বেড়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ের ফি। ব্যাহত হচ্ছে লেনদেনের স্বাভাবিক গতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের নিচে হলে আন্তর্জাতিকভাবে তা ঝুঁকির আওতামুক্ত ধরা হয়; কিন্তু সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের হার ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ব্যাংকভেদে এ হার ৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে।

দেশের তফসিলি ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ১২টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের নিচে রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি বেসরকারি ও পাঁচটি বিদেশী ব্যাংক রয়েছে। তবে কোনো সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের নিচে নেই। ৩ শতাংশের নিচে খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন দেশী ব্যাংকগুলোর মধ্যে আছে, ইস্টার্ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক।

বিদেশী ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে উরি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এন এ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, ব্যাংক আল ফালাহ এবং এইচএসবিসি। খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় নিলে দেশের ব্যাংকিং খাত অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

দ্বিতীয়ত. ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের চেয়ে মূলধন সংরক্ষণের হার। মূলধন সংরক্ষেণের ক্ষেত্রে চার বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি রোডম্যাপ দিয়েছিল ব্যাংকগুলোকে। ওই রোডম্যাপ অনুযায়ী চলতি বছর শেষে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে সাড়ে ১২ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণের কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাত মূলধন সংরক্ষণ করতে পেরেছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ হারে।

চলতি বছর শেষে মূলধন সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন মোটেও সম্ভব হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রোডম্যাপ অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণ করতে না পারার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে ঊর্ধ্বমুখী খেলাপি ঋণ। এ খেলাপি ঋণের আধিক্য বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চেয়ে সরকারি ব্যাংকগুলোর বেশি। এ কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। ফলে মূলধন ঘাটতির মুখে পড়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এর প্রভাব পড়েছে গোটা ব্যাংকিং খাতে।

এ দিকে আন্তর্জাতিকভাবে সুদের হার কমানো বা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিকতা রাখতে হয়। খুব সামান্য হারে কমাতে বা বাড়াতে হয়। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টমস, ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’ এ হার সাম্প্রতিক সময়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির অন্যতম উপকরণ ট্রেজারি বিল কেনার চুক্তির (রেপো) সুদহার গত এপ্রিলে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ কমিয়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট বেশি হলে ঋণের সুদহার এক ধাক্কায় বাড়িয়ে দেয় ৩ থেকে ৪ শতাংশ। আমানতের সুদহার বাড়ায় ২ থেকে ৪ শতাংশ। পরে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর কথা বলে আমানতের সুদহার এক ধাক্কায় ক্ষেত্রবিশেষ সাড়ে ১০ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনে। যদিও কয়েক দফা আগাম ঘোষণা দিয়েও ঋণের সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনেননি বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তারা। এতে সুদের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, যা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

এ দিকে আন্তর্জাতিকভাবে ঋণ ও আমানত ব্যবস্থাপনা এমনভাবে করতে হয়; যাতে তারল্য পরিস্থিতি সব সময় স্বাভাবিক থাকে; কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বেশির ভাগ সময়ই এটি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকছে না। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় ব্যাংকিং খাত অতিরিক্ত তারল্যের ভারে আক্রান্ত ছিল। তখন ঋণের সুদের হারের চেয়ে আমানতের সুদের হার বেশি কমেছিল। এতে ব্যাংকে আমানতকারীরা আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত হয়। এ দিকে সুদের হার কম থাকায় ঋণপ্রবাহও বেড়েছিল।

ফলে এক দিকে ব্যাংকের অলস অর্থ ফুরিয়ে যায়, অন্য দিকে আমানত আসছিল কম। এ দুইয়ে মিলে তারল্য সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করে। ঋণ ও আমানতের সুদের হার আবার বেড়ে যায়। এতে ব্যবসায়ীরা ফের সঙ্কটে পড়েন। ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনার এ প্রবণতাকে বড় ধরনের ঝুঁকি বলে মনে করা হয়। কোনো কারণে তারল্য সঙ্কটের মুখে একটি ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা দিতে না পারলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো ব্যাংকিং খাতে। যেমনটি হয়েছে ফারমার্স ব্যাংকের ক্ষেত্রে।

ঋণ কেলেঙ্কারির পরে ব্যাংকটির তহবিল শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। প্রতিদিন আমানতের বিপরীতে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার সংরক্ষণ করতে পারছে না ফারমার্স ব্যাংক। ফেরত দিতে পারছে না গ্রাহকের গচ্ছিত অর্থ। এর প্রভাব সাম্প্রতিক সময়ে পুরো ব্যাংকিং খাতে পড়েছে। একই সাথে মুদ্রার বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রফতানি আয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা, রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে। গত কয়েক বছর ধরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার বেশ মাত্রায় ওঠানামা করছে। এর প্রভাবে ডলারের দাম কখনো বেশি বেড়ে যাচ্ছে। আবার কমে যাচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অর্থনৈতিক সূচকগুলো সংরক্ষণ করতে না পারলে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেবে। এর মধ্যে অন্যতম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষ্পত্তিতে ব্যয় বেড়ে যাবে। কারণ, মূলধন ঘাটতি থাকলে ব্যাংকিং খাতের রেটিং খারাপ হবে। ফলে পণ্য আমদানিতে দেশীয় ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে। ফলে থার্ডপার্টিকে গ্যারান্টির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে হবে। এতে ব্যয় স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাবে। পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে ব্যাংকগুলোকে আরো সতর্কতার সাথে ঋণ বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।