Naya Diganta

গুগলে পাওয়া গাইড জাভেদ

লাহোর দুর্গের শীষ মহল, ইনসেটে গাইড জাভেদের সাথে লেখক

লাহোর দুর্গ। পাকিস্তান সফররত সাংবাদিক প্রতিনিধিদলকে দুর্গটি দেখানোর জন্য নিয়োগ করা হয়েছে তাকে। পরিচয়ের শুরুতেই তিনি জানালেন, তার নাম জাভেদ। গাইড জাভেদ লিখে গুগলে সার্চ করলে তাকে পাওয়া যাবে। ইংরেজি, উর্দু জানেন। আরো জানেন ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়ান ভাষা। বাংলা জানেন কিনা জিজ্ঞেস করতে বললেন, বাংলাদেশ থেকে তেমন পর্যটক আসেন না।

শুরুতেই বললেন, সময় কম, তবে যতটা সম্ভব তিনি দুর্গ আর বাদশাহি মসজিদ ঘুরিয়ে দেখাবেন। শুরু করলেন। আঙিনা আর শীষ মহল দেখানোর পর আমার মনে হলো, জোরে পা চালালে আরো কিছু দেখা যাবে।
কিন্তু তিনি বললেন, বয়স ৪৯ বছর। এখন কি অত দ্রুত চলা যায় ভায়া?

‘আমার বয়স তো ৫১, আমি এখনই দৌড়ে আপনাদের সবাইকে হারিয়ে দিতে পারব।’
‘সত্যি?’
‘সত্যি।’
‘এখনই?’
‘এখনই।’
ফিক করে হেসে দিলেন। আসল কথাটি তখনই বললেন। এত লোকের মধ্যে দু-তিনজনকে নিয়ে আগে বাড়লে যে হইচই হবে, তা থামাবে কে? তখন আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে।
অভিজ্ঞতার জয় হলো। তিনি প্রতিদিনই নানা দলকে সঙ্গ দেন। কিভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়, জানেন। ফলে অন্যদের সেলফি তোলার হিড়িকে থমকে থমকেই চলতে হলো। এতে অনেক কিছুই দেখা হলো না। হয়তো যেভাবে দেখা হয়েছে, সেটিই যথার্থ। তাছাড়া ঘণ্টা দুয়েক লাহোর দুর্গের মতো বিশাল আর নানা স্থাপনায় ভরপুর একটি স্থান দেখা সম্ভবও নয়।

দুর্গ আর বাদশাহী মসজিদ সম্পর্কে অনেক তথ্যই জানালেন তিনি। অবাক লেগেছিল দেয়ালেরও যে কান তা দেখানোতে। দুর্গের একটি বিশেষ কক্ষে যেকোনো এক কোণে ফিসফিস করলেও অপর প্রান্তের দেয়ালে কান পেতে রাখা লোকটি স্পষ্ট শুনতে পায়। দুর্গ তো কেবল সৈন্য সামন্তদের আশ্রয় স্থান ছিল না। এখানে বাদশাহ, রানি এবং তার পুরো পরিষদই অবস্থান করতেন। লাহোর ছিল মোগলদের অন্যতম রাজধানী। আর লাহোর দুর্গ তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে। মোগলদের আগেও এখানে দুর্গ ছিল। সেগুলোও তাদের নির্মাণ কাঠামোতে স্থান পেয়েছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে ওঠেছে তাদের নির্মাণশৈলী।

মতি মসজিদ, দিওয়ানি খাস, দিওয়ানি আম, খোয়াবঘর, শীষ মহল, হাম্মাম খানা অসংখ্য স্থাপত্য নিদর্শনে ভরপুর লাহোর দুর্গ। এর একটি স্থাপনাই যেকোনো একটি স্থানকে বিখ্যাত করার জন্য যথেষ্ট।
আর গাইড জাভেদ বেশ দক্ষতার সাথেই মোগলদের শ্রেষ্ঠত্বের দিকগুলো দেখিয়ে দিয়েছেন।

গ্রীস্মের প্রচ- তাপদাহেও প্রাসাদে বরফশীতল পরিবেশ কিভাবে রাখত, তীব্র শীতের দিনে কোন কোন নালা দিয়ে গরম পানি প্রবাহিত হয়ে প্রাসাদকে উষ্ণ রাখত, সম্ররাজ্ঞীরা কোথায় গা এলিয়ে দিতেন, শীষ মহলে কিভাবে প্রতিটি ফাঁকে ফাঁকে সৌন্দর্য বহুগুণে নিজেকে মেলে ধরত, বেশ ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
দুর্গ দেখাতে দেখাতেই বললেন, আশ্চর্য একটি জিনিস দেখাবেন, তারপর থাকছে একটি ট্রাজেডি। মনে হলো, মোগল হেরেমের ভয়াবহ কোনো ঘটনা শোনাবেন তিনি। আগ্রহ আরো বেড়ে গেল।

এই পর্যায়ে তিনি দুর্গের দিল্লি গেট দিয়ে ঢুকে পুরনো লাহোরের কিছু অংশ দেখালেন। পুরান লাহোর দেখানোর সময় মাথা গোণার জন্য তাকে বারবার থামতে হয়েছে। একবার দেখা গেল, ১০ জনের একজন নেই। হাঁটতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠা তিনজন গাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আর গাইড জাভেদের আশপাশে আছে ছয়জন। আরেকজন কোথায়? না, খুব বেশি দূর যাননি তিনি। সেলফি তুলতে গিয়ে একটু পিছিয়ে পড়েছিলেন।
এবার জাভেদ থামলেন দুর্গের বিশ্রামাগারে। এখন অবশ্য না বললে বোঝার উপায় নেই, এটিই ছিল বিরামস্থান। বসে-শুয়ে গায়ে পানি দিয়ে মুসাফিররা পথের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতেন। এই ফাঁকেই তারা জেনে নিতেন দরবারের সর্বশেষ পরিস্থিতি। নিজেদের খবরও জানাতেন।

দুর্গের কোনো কোনো অংশের সংস্কার কাজ চলছে, কোথাও কোথাও নতুন করে গড়া হয়েছে। দেখাতে দেখাতে সবাইকে এক প্রান্তে নিয়ে এলেন। তারপর জানালেন, এখন তিনি উর্দুতে একটি গানের চারটি লাইন শোনাবেন। বিরহ সঙ্গীত। একসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল। তিনি চোখ বুজে গাইলেন। উর্দু বুঝি না, তবে অন্তত সুরটি অনুধাবনের চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রচ- রোদে দীর্ঘ সময় কথা বলা এক মধ্য বয়সী লোক গান গাইতে গিয়ে কিছু বেসুরো শব্দই করলেন। তবে হৃদয় থেকে যে মমতা নিংড়াল, সেটিই বুঝিয়ে দিলো, পুরনো লাহোরের প্রতি তার দরদ কতটা। তারপর বললেন, এখানেই শেষ দুর্গ অভিযান। আমি জানতে চেয়েছিলাম, এটিই কি সেই ট্রাজেডি?... কিন্তু তিনি ততক্ষণে কিছুটা দূরে চলে গেছেন।

অনেক কিছু না-দেখতে পাওয়ার আফসোস যেমন রয়ে গেছে, আবার অনেক কিছু দেখার তৃপ্তিও মনে গেঁথে আছে। ধন্যবাদ গাইড জাভেদকে।