Naya Diganta

‘ফেসবুক না চালিয়ে সেই সময়টুকু ইবাদত করি’

আইভরি কোস্টের কয়েকজন মুসলিম

পবিত্র রমজান মাসে ইবাদতে বেশি সময় দেয়ার উদ্দেশ্যে দারুণ এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টের কিছু মুসলিম। পুরো রমজান মাসে তারা ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সময়টা তারা ব্যয় করতে চান কোরআন তিলাওয়া, নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতে।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাটসহ বেশ কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুবই জনপ্রিয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৭ সালে দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক কোটি সত্তুর লাখে দাড়িয়েছে, আগের বছর যা ছিলো এক কোটি। দেশটির সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, দ্রুতই দেশটির তরুণদের মাঝে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।

তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের নাগরিকদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার না করে রমজানে সময়টুকু ইবাদতে ব্যয় করার সিন্ধান্ত নিয়েছেন। ফাতু দায়ালো নামে ত্রিশ বছরের এক মহিলা জানান, তিনি সারাক্ষণই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত থাকেন। কিন্তু রমজানে এসব কাজ থেকে দূরে রাখতে চান নিজেকে। তিনি বলেন, ‘এতে অনেক সময় অপচয় হয়। তাই ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছি। আমার ফেসবুক সহ অন্যান্য আইডিগুলো বন্ধ করে দিয়েছি। এমনকি স্মার্ট ফোন থেকেও এসব অ্যাপ আনইনস্টল করেছি।’

ফাতু এখন দিনের এই সময়গুলো ইবাদতে ব্যয় করেন। বলেন, ‘যতক্ষণ সময় ফেসবুকে কাটাতাম, সেটাতে একণ কোরআন পরি। এ মাসে কোরআন খতম করতে চাই। আর যোগাযোগের জরুরী প্রয়োজনের জন্য মোবাইল ফোন তো রয়েছেই’।
একটি সুপার শপে বিক্রয়কর্মীর কাজ করেন আবু সিল্লা মনে করেন, একমাস ফেসবুক না চালিয়ে সেই সময়টুকু ধর্মীয় কাজে লাগালে অনেক বেশি উপকারে আসবে।

হামেদ কিসোকো নামের একজন জানান, চাকুরির কারণে তাকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়। তবে চেষ্ট করেন রমজানে সেটি কমিয়ে দিতে। আর যতক্ষণ ইন্টারনেটে থাকেন সে সময়টুকুতে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেন, ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে নির্মিত সিনেমা দেখেন। 

আইভরি কোস্টের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মুসলিম। দেশটির মোট জনসংখ্যা দুই কোটি চল্লিশ লাখের মতো।

আরো পড়ুন : লন্ডনে খোলা আকাশের নিচে ইফতার
লন্ডনের সাংস্কৃতিক ও অ্যাকাডেমিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রশস্ত রাস্তাটির নাম ‘ম্যালেট স্ট্রিট গার্ডেনস’। সুদূর অতীত থেকেই এই রাস্তাটি বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত হলেও গত প্রায় চার বছরেরও বেশি সময় ধরে অন্য আরেকটি কারণে ম্যালেট স্ট্রিট আরো খ্যাতি অর্জন করেছে। এই জায়গাটি বর্তমানে ‘রমাদান টেন্ট প্রজেক্টের (আরটিপি) প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। 

প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাসে আরটিপি এখানে সবার জন্য উন্মুক্ত ইফতারের আয়োজন করে। সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে আয়োজিত এই ইফতার মাহফিলে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ জন রোজাদার ইফতারে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিদিন ইফতারের প্রায় এক ঘণ্টা আগে অর্থাৎ ৮টায় সানকেন উদ্যানের বাইরের লোহার গেট খুলে দেয়া হয় এবং রোজাদারদের ইফতার মাহফিলে স্বাগত জানানো হয়। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার স্থানীয় সময় অনুযায়ী লন্ডনে ইফতারের সময় ছিল সন্ধ্যা ৯:১৫ পিএম।

স্বেচ্ছাসেবকেরা ইফতার মাহফিলে রোজাদারদের স্বাগত জানান এবং মসজিদের মতই জুতা খুলে মাহফিলের ভেতর প্রবেশ করার সুবিধার্থে আগত সব অতিথিকেই তারা নীল রঙয়ের প্লাস্টিক ব্যাগ সরবরাহ করেন। স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (এসওএএস) ছাত্র থাকা অবস্থায়ই ২০১১ সালে ওমর সালাহ রমাদান টেন্ট প্রজেক্ট (আরটিপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে পড়তে আসা ছাত্ররা যেন তাদের পারিবারিক ও সাম্প্রদায়িক রীতিনীতির অভাব বোধ না করেন, সেই উদ্দেশ্যেই একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে তিনি উন্মুক্ত ইফতার মাহফিলের আয়োজন শুরু করেন।

সালাহ বলেন, ‘নিজের বাড়ি ও পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষদের বাড়ির এবং পারিবারিক অনুভূতি এনে দিতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এসওএএস ক্যাম্পাসের ভেতর আয়োজিত প্রথম উন্মুক্ত ইফতারে মাটিতে ঘাসের ওপর বসে আমরা প্রায় ১৫ জন ইফতার করেছিলাম।’ তারপর থেকে এই আয়োজন দিনে দিনে আরো সমৃদ্ধ হয়েছে এবং সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। 

সালাহ আরো বলেন, ‘এরপর ধীরে ধীরে আমাদের এই আয়োজন গৃহহীন, পথচারী, পেশাজীবী, অন্য ধর্ম ও বর্ণের মানুষসহ সব শ্রেণীর মানুষকে একই তাঁবুর নিচে একত্রিত করেছে।’ পবিত্র রমজান মাসে তুরস্কের শহর ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন জায়গায় তাঁবু বানিয়ে ইফতার আয়োজনের ঐতিহ্য তাকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করেছে বলে জানান সালাহ।

তিনি বলেন, ‘মাটিতে পাশাপাশি বসে একসাথে ইফতার করা আমাদেরকে বিনয়ী ও নিরহঙ্কারী হতে শিক্ষা দেয়। হতে পারেন আপনি অনেক বড় বিনিয়োগকারী ব্যাংকার বা হতে পারেন দারোয়ান, এখানে আমরা সবাই পাশাপাশি বসি এবং সবার সাথে সমান আচরণ করা হয়।’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাম্বিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত চারটি দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত উন্মুক্ত ইফতারে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। এ বছর যুক্তরাজ্যের ব্রাডফোর্ড, বার্মিংহাম এবং ম্যানচেস্টার শহরে প্রথমবারের মত উন্মুক্ত ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

সবার জন্য উন্মুক্ত ইফতার মাহফিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্রিটিশ মুসলিমদের একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত করা ও ব্রিটেনে ক্রমবর্ধমান মুসলিম বিদ্বেষী পরিবেশ সৃষ্টির সাথে জড়িত মানুষদেরকে সুন্দর ইসলামি রীতিনীতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। সালাহ বলেন, ‘মুসলমানদের ব্যাপারে প্রায়ই এমনসব কথা বলা হয় যা কখনো বলা উচিত নয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে মুসলমানদেরকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয় তার বিরুদ্ধে ইসলামের প্রকৃত তথ্য প্রতিষ্ঠা করার একটা বড় সুযোগ এই উন্মুক্ত ইফতার মাহফিল। এর মাধ্যমে আমাদের মধ্যকার বন্ধনও সুদৃঢ় হয়। এটি আসলে একটি কূটনৈতিক পন্থা।’